তাঁরা নোবেল হারাননি, নোবেলই হারিয়েছে তাঁদের! উল্টোস্রোতের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা

Nobel Prize 2022: জঁ পল সার্ত্রে বলেছিলেন, মূলত পশ্চিমের ও পূর্বের সমাজতন্ত্রবিরোধী লেখকদের জন্য এই পুরস্কার নির্ধারিত।

Ladly Mukhopadhaya
৩ মিনিট
তাঁরা নোবেল হারাননি, নোবেলই হারিয়েছে তাঁদের! উল্টোস্রোতের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা

পুরস্কার এক বিষম বস্তু; বিশেষত যদি তা সাহিত্য বা শিল্পের কোনও মাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। প্রথম কথাই হলো, একজন শিল্পী বা সাহিত্যিক পুরস্কার পাওয়ার জন্য সৃষ্টি করেন না। দ্বিতীয়ত, শিল্পের কোনও প্রতিযোগিতাও সম্ভবপর নয়। তথাপি প্রতিষ্ঠান পুরস্কার দেয় (তা সরকারি বা বেসরকারি, যা-ই হোক না কেন)।পুরস্কার দেয় তার আধিপত্য বজায় রাখতে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আবিশ্ব প্রাতিষ্ঠানিকতার ভারসাম্য-রক্ষার্থেই সম্ভবত 'পুরস্কার'-এর সূচনা।শেক্সপিয়র না কালিদাস, দস্তয়েভস্কি না টলস্টয়, হেমিংওয়ে না কামু- লেখক হিসেবে কে বড় কে ছোট, কে প্রথম কে দ্বিতীয়- তা কে ঠিক করবে? আদৌ কি তা বলা যায়! আসলে ভিন্ন প্রকরণ, আলাদা আলাদা শৈলি ও আঙ্গিকে কেউ শিক্ষক, কেউ দার্শনিক, তাও আবার ব্যক্তিবিশেষে তা পাল্টে যায়। এখানে কোনও প্রতিযোগিতা নেই।

লুইস ফর্দিনান্দ সেলিন থেকে ফ্রানৎস কাফকার মতো লেখকরা আজীবন লিখে গেলেও তাঁদের বই প্রকাশ করতে সম্মত হননি নির্ভার রুচি-উজ্জ্বল এক ব্রত শুদ্ধতায়। এই কারণেই তা উল্লেখ করছি যে, শিল্প (সাহিত্য রচনা) সৃষ্টিকে তাঁরা ব্যক্তিক পরিসরে মনোসংগঠনের চর্চা হিসেবেই দেখেছেন, যেখানে নাম, যশ, খ্যাতির বালাই ছিল না। তবে হ্যাঁ, এঁরা সব সময়েই শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী লেখক। কিন্তু স্মৃতিস্পন্দিত নিরাভরণ আত্ম-দার্শনিক। পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসে খ্যাতি ও প্রচার-বিদ্বেষী বিস্ময়কর গৌরবও বটে।

আসলে এতটা গৌরচন্দ্রিকার অবতারণার কারণ হলো, অধুনা আলোচ্য (প্রচারমাধ্যমে) নোবেল পুরস্কার নিয়ে দুটো-চারটে কথা লেখালিখি। যা নিয়ে স্বল্প পরিসরে আমার এই নিবন্ধের আয়োজন। প্রতি বছর অক্টোবর মাসে পৃথিবীজুড়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা ঘুরেফিরে আসে। সম্ভাব্য প্রাপকের নাম, কে এগিয়ে আর কে পিছিয়ে। একশো কুড়ি বছরের বেশি অতিক্রান্ত। এমন একটা ভাব, যেন বছর-প্রতি এই একজন নোবেল প্রাপকই বিশ্বসেরা, সাহিত্যের শেষ কথা। অথচ এমন অনেকানেক লেখক আছেন, যাঁদের কথা মনেই পড়েনি সুইডিশ অ্যাকাডেমির। তাতে অবশ্য ইতরবিশেষ কিছু ঘটেনি। যাঁরা পাননি, তাঁরা বহাল রয়েছেন- পাঠকের মনে, রাজ করছেন বিশ্বসাহিত্য।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরাম্যান' হয়ে রয়ে গেলেন, যে সুব্রত মিত্রকে চিনল না বাঙালি

আমাদের বিস্মিত হওয়া ও ওঁর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মূল কারণ ছিল যে, সুব্রতদা 'অপরাজিত' ছবিতে প্রথম বাউন্স লাইট করে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সাদা কাপড়ের বিপরীতে লাইট রেখে সিনেমায়ার অভ্যুত্থান ঘটালেন।

প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই এই পুরস্কারের নিয়ন্তা বড় ভাইয়ের রাজনীতি। ঠান্ডা লড়াইয়ে নোবেল কে পাবে আর কেন পাবে, তা সূচিত হয়েছে ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নজর দিয়ে। লেখা বাহুল্য, মার্কিনিরা এখানে সব সময়ই অগ্রগণ্য। যাঁরা সমাজতান্ত্রিক সমাজের বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের যেমন পুরস্কৃত করা হয়েছে, তেমনই প্রতিবাদী লেখকের যাবতীয় আক্রমণকে প্রতিহত করতে, খর্ব করতে তাঁদেরও শামিল করা হয়েছে। এরা সলঝেনিৎসিনের মতো দ্বিতীয় সারির লেখককে খুঁজে পেয়েছে কিন্তু মায়াকোভস্কির নামোচ্চারণ করেনি। আবার পাস্তেরনাকের মতো প্রথম সারির চিন্তককে নির্বাচিত করেছে রুশ বিরোধিতার জন্য। যদিও পাস্তেরনাক প্রত্যাখ‍্যান করেন। সেও এক রুশি ঢালাওতন্ত্রের অন্য গল্প। পড়েছি যে, ওঁকে রুশ প্রশাসন বাধ্য করে এরকম সাম্রাজ্যবাদী পুরস্কার না নেওয়ার জন্য।

হ্যাঁ, নেরুদা থেকে মার্কেজকে পুরস্কৃত করা হয়েছে স্পেন থেকে লাতিন আমেরিকার লাগাতার সর্বব্যাপী গৃহযুদ্ধ, আন্দোলনকে নিষ্প্রভ করার জন্য, লঘু করার জন্য। কাজেই এই অভিযোগ বারে বারেই উঠেছে, বিশেষত বিংশ শতকে, যে নোবেল কমিটি বেছে নিয়েছে মধ্যমেধার সাহিত্যিকদের। তারপরে বলতে হবে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজনের কথা। তৃতীয় বিশ্বের, বিশেষ করে আফ্রিকার, ভারতীয় উপমহাদেশের লেখকেরা এখনও কোনও কল্কে পান না, তাঁদের পিছনে ঠেলা হয়। সেখানে অকারণ যুক্তি দেওয়া হয় যে, তাঁদের সৃষ্টিকর্ম ইংরেজিতে যথেষ্ট অনূদিত নয়। যা প্রকৃতই আংশিক সত্য। অনুবাদের সমস্যার মূল অনেক গভীরে, অনুবাদ সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত সবাই সেকথা স্বীকার করবেন। এই বিষয়ে লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে প্রথিতযশা আফ্রিকান সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবে-র কথা। নাইজেরিয়ান এই কবি, সমালোচক ও কথাসাহিত্যিক আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের এক অনন্য মাইলফলক। তাঁকে এই নোবেল কমিটি সম্পূর্ণতই অগ্রাহ্য করেছে। এখানে কিন্তু অনুবাদের দোহাই ধোপে টেকে না।

এই ধারা কিন্তু এই শতকেও জারি আছে। এই কিছুদিন আগেই ২০১৮ সালে নোবেল কমিটির এক সদস্য ও তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ, আর্থিক লেনদেন-সংক্রান্ত অপরাধ ও গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগ উঠেছিল। তার অভিঘাতে গোটা কমিটির টালমাটাল অবস্থা হয়েছিল। সেই সময়ের কমিটির সভাপতি অ্যান্ডারস ওলসন পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপকেন্দ্রিকতা ও পিতৃতান্ত্রিকতার অভিযোগ স্বীকার করে নেন।

তো যাই হোক, এই নিবন্ধ শেষ করব অস্তিত্ববাদী দার্শনিক ও লেখক জাঁ পল সার্ত্রেকে দিয়ে। আমরণ বামপন্থী সার্ত্রেকে নোবেল কমিটি ১৯৬৪ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করে। সার্ত্রে সপাট সেই পুরস্কার প্রত্যাখ‍্যান করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, যে লেখক, তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক তথা সামাজিক এবং সুনির্দিষ্ট সাহিত্যিক অবস্থান রয়েছে, তাঁর উচিত নিজের সামর্থ ও অর্থে লিখিত শব্দের শক্তি দিয়ে লিখে যাওয়া। পুরস্কৃত হওয়ার ফলে লেখকের ওপর এক প্রাতিষ্ঠানিক চাপ সৃষ্টি হয়। যা কখনওই কোনও লেখকের ক্ষেত্রে কাম্য নয়।

তিনি আরও বলেন, মূলত পশ্চিমের ও পূর্বের সমাজতন্ত্রবিরোধী লেখকদের জন্য এই পুরস্কার নির্ধারিত। 'এ রাইটার শুড নট অ্যালাও হিমসেলফ টু বি টার্নড ইনটু অ্যান ইনস্টিটিউশন।'

এই হলো গিয়ে মোদ্দা কথা।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।