রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা আঁকা হয়, শাসকের চোখে এখনও এই শিল্প 'সন্ত্রাসবাদ'

নর্মানের মতো এইসব গ্রাফিত্তির আর্টিস্টরা মূলত রাতের অন্ধকারে তাদের কাজটি সম্পন্ন করে। এমনভাবে পরিকল্পনা করে, যাতে রাতারাতি কাজ শেষ করে চম্পট দেওয়া যায়।

Ladly Mukhopadhaya
৩ মিনিট
রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা আঁকা হয়, শাসকের চোখে এখনও এই শিল্প 'সন্ত্রাসবাদ'

প্রতিটি রাস্তার নিজস্ব ভাষা আছে। পথ গন্তব্যে পৌঁছয় আবার কখনও নিরুদ্দিষ্ট, নির্জন, অজানা, সর্পিল। বাঁকে বাঁকে ভিন্ন ভিন্ন আবহ।

কখনও সে দ্রুততার প্রতীক, কখনও মন্থর, নিমগ্ন, আত্মভোলা। আমরা পথ খুঁজি, হারাই, পথভ্রষ্ট হই। তারপরেও পথে থাকি, পথ ধরি।

যে পথের শুরু আছে, শেষ আছে মনে করি। ঠিক ভাবি না ভুল ভাবি, তাও জানি না। কিন্তু পথ একটা ধরতেই হয়। কখনও উন্মুক্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখা হয়ে যায় অবরোধের ছেঁড়াকানি, পরিত্যক্ত ঝান্ডা। যা আমার চোখে আজ একটা স্থিরচিত্র ছাড়া কিছু নয়। অথচ সেই ছবির কথা আছে। যে কথা জব্দ হয়ে আছে।

সে ভাষা পড়ে ওঠা যায় না। প্রকৃত প্রস্তাবে এইসব কাব্যময় অসাড় ভাষার আলপনা কাটতে এই লেখা নয়। একটা ভাব বোঝাতে, একটা দৃশ্যসুন্দর অবস্থান কীভাবে রাজনৈতিক কারণে নির্মিত হচ্ছে, তা শনাক্ত করতে এই গৌরচন্দ্রিকা।

বরং সরাসরি বিষয়ে আসা যাক। রাস্তাও প্রতিবাদের ভাষাকে ধারণ করে। প্রথম এই বিষয়ে অবগত হই প্রাচ্যর বিভিন্ন শহরে গিয়ে। নানা বাড়ি, দোকানের বন্ধ দরজা, গ্যারাজের শাটার, ইতিউতি দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচিল, এমনকী, বাস বা পুরনো ট্রামের চারপাশ, সবই যেন ক্যানভাস।

কোথাও বর্ণময়, কোথাও বর্ণচোরা, কোথাও মূর্ত আবার কোথাও বিমূর্ত রংরেখায় আর অক্ষরবাক্যে সেজে ওঠা রাস্তার দুই পাশ। কী এর নির্মাণ রহস্য, কারা এই শিল্পী, এর উদ্দেশ্যই বা কী? এই ছিল আমার প্রাথমিক অন্বেষণ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরাম্যান' হয়ে রয়ে গেলেন, যে সুব্রত মিত্রকে চিনল না বাঙালি

আমাদের বিস্মিত হওয়া ও ওঁর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মূল কারণ ছিল যে, সুব্রতদা 'অপরাজিত' ছবিতে প্রথম বাউন্স লাইট করে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সাদা কাপড়ের বিপরীতে লাইট রেখে সিনেমায়ার অভ্যুত্থান ঘটালেন।

ছবি সৌজন্য: লেখক

এই যে পথে-ঘাটে, নানা জায়গাতে চিত্রিত ছবি- একে বলা হয় গ্রাফিত্তি। যার ভাষায় আছে আবেগ, সামাজিক ন্যায়-অন্যায় নিয়ে প্রতিবাদ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমালোচনা। গ্রাফিত্তি সার্বিকভাবেই একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। সে-বিষয়ে পরে আসছি।

শুরু করা যাক এর ইতিহাস থেকে। প্রাচীন ইজিপ্ট, গ্রিস ও রোমান সাম্রাজ্যে এই প্রতিবাদমূলক শিল্পিত প্রকাশ দেখা যায়। রোম ও পম্পেই নগরীর সমাধিস্থলের দেয়াল ও ধ্বংসাবশেষেও নানা গ্রাফিত্তির প্রমাণ মিলেছে। এদিকে দক্ষিণ সিরিয়া, পূর্ব জর্ডান এবং উত্তর সৌদি আরবে পাথরের ওপরে কিছু লেখা ও চিহ্ন-সংকেত পাওয়া গিয়েছে স্যাফাইটিক ভাষায়। কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ মনে করেছেন যে, এই গ্রাফিত্তির উৎপত্তি হলো স্যাফাইটিক ভাষার থেকে। আধুনিক বিশ্ব এই গ্রাফিত্তিকে বিস্তৃত যেমন করেছে, তেমনই নতুন নতুন আঙ্গিকে আরও উন্নত প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, পরিণত করেছে।

ছয়ের দশকে শুরু হয়েছিল এই শিল্পের কর্মকাণ্ড। যা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাতের দশকে আরও তীক্ষ্ণতা পায়। মনে হয়, সেই সময়ের সারা পৃথিবীজুড়ে শান্তি আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এর প্রসার-প্রচার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আরবান আভাঁ গার্দ স্ট্রিট আর্টের ও গ্রাফিত্তির ক্ষেত্রে ইতালিকে মানা হয় পথিকৃৎ হিসেবে। সাতের দশকের শুরুতে আমেরিকা থেকে প্রথম গ্রাফিত্তি নিয়ে যে বই প্রকাশিত হয়, তা একজন ইতালিয়ানের লেখা। ইতালীয় কিউরেটর ফ্রান্সেসকা এলিনভি প্রথম গ্রাফিত্তির একজিবিশনের আয়োজন করেন ইউরোপে সাতের দশকের শেষ দিকে। কিন্তু এই কাজ করতে এত সময় কেন লাগল? তার কারণ এই শিল্পের কোনও রাষ্ট্রীয় গ্রহণযোগ্যতা ছিল না, আজও নেই। তার কারণ, রাষ্ট্র মনে করেছে এটা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ। এই ধরনের কাজ রাষ্ট্রের নির্ধারিত নিয়ম-মোতাবেক বেআইনি। ফলে এই কাজে দুষ্ট ব্যাক্তির জন্য জেলখানার ঠিকানা লেখা আছে। দেশ অনুযায়ী সাজার তারতম্য আছে বটে। তবে জেল খাটতেই হবে। তার কারণ, এই প্রকাশ্য শিল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে এরা সরকারি কোনও আনুমোদন তো নেয়ই না। এমনকী, যার বাড়ির দেওয়ালে এই ক্রিয়াকর্ম ঘটবে, তারও অনুমতি নেয় না। গোপনে, রাতবিরেতে, গেরিলা কায়দায় এই শিল্পের জন্মকথা শুরু হয়। একটা রাত মানে একটা প্রতিবাদ।

এটা কোনও ন্যাকাভোলা আর্টিস্টদের কর্ম নয়।

নর্মান ছিল এমন এক শিল্পী। যার বাবা স্প্যনিশ আর মা ফরাসি। আমার সঙ্গে ওর প্রথম পরিচয় এই দেশে। পরবর্তীকালে বিদেশেও দেখা হয়েছে। কিন্তু সেবার অদ্ভুত যোগাযোগ।

বহুদিন পর দেখা হবে বলে ফোন দিয়েছি। ওর বান্ধবী জানাল, নর্মান ব্যস্ত, তাই সে ফোন ধরতে পারছে না। তার সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে আমাকে ওদের বাড়িতে যেতে বলে। সেদিন আসলে নর্মান তিন বছরের জেল খেটে বাড়ি ফিরেছে, তা আমি জানতাম না। নর্মান এক স্বাধীনচেতা চিত্রকর। ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেনজুড়ে সে কাজ করে। একা নয়, দল পাকিয়ে গ্রাফিত্তি ছড়িয়ে দেয় রাজপথে, শহর ও শহরতলির পথেঘাটে।

নর্মানের মতো এইসব গ্রাফিত্তির আর্টিস্টরা মূলত রাতের অন্ধকারে তাদের কাজটি সম্পন্ন করে। এমনভাবে পরিকল্পনা করে, যাতে রাতারাতি কাজ শেষ করে চম্পট দেওয়া যায়। নর্মানরা সেবার সারারাত কাজ করে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে একটি গ্যারেজে ঘুমিয়ে পড়ে। তাতেই পুলিশ। তাতেই বিপত্তি। কিন্তু তাতে তাদের কোনও অনুতাপ নেই। নর্মানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে হচ্ছিল, সে বোধহয় আবার নতুন পরিকল্পনা তৈরি করবে। গ্রাফিত্তি আসলে লাগাতার আন্দোলনের ফলশ্রুতি।

শাসককে উত্যক্ত করা, চোরাগোপ্তা নিজেদের কাজটা হাসিল করাই এখানে মূল উপজীব্য।

গেরিলা তৎপরতায় এ যেন নাশকতার লুকোচুরি। ভিন্ন রাস্তার শিল্প। এই গ্রাফিত্তি এখন প্যাশন। ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন। তার মানেই নানা কথা, নানা রং, নানা রেখা। একঘেঁয়ে এক ছাঁচে ঢালা নয়।

সব মেনে নেওয়া নয়।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বামপন্থী আন্দোলন ক‍রতে গিয়েই জেল খাটা, তবু বামেরা বলেছিল সিআইএ-র দালাল

তথাকথিত আমোদগেঁড়ে বাজার সংস্কৃতির সঙ্গে দিললাগি করতে পারেননি। বিরুদ্ধতায়, ঝগড়ায়, ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তামাম ভালো থাকার সোহাগি আকাঙ্ক্ষা।

সে ছিল এক অন্য 'দুয়ারে সংস্কৃতি'! উত্তরবঙ্গের সেই মেলায় তৈরি হয়েছিল ইতিহাস

আমরা মনে করতাম, শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমের যে আন্তঃসম্পর্ক, তাকে একই মঞ্চে উপস্থাপিত করতে হবে। সেই মঞ্চ হবে খোলা আকাশের নিচে, রাস্তায়, মাঠে-ঘাটে, হাটেবাজারে, খোলামেলায়।

নিজের হাতে তৈরি দলই কোণঠাসা করে দিয়েছিল শম্ভু মিত্রকে

শোনা যায়, তাঁর নিজের দলেই তিনি একঘরে হয়ে পড়েছিলেন। এও শোনা যায় যে, তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেয়নি তাঁর নিজের হাতে তৈরি করা দল।

মঞ্চ নয়, রাস্তা দখল করে নাচ-গান-নাটক চলে ইউরোপের এই উৎসবে

নাটক, গানবাজনা বা ভেলকি যাই হোক, তা দেখানোর জন্য, শোনানোর জন্য দর্শক চাই, যে দর্শক রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়।

'যন্ত্রের কী দরকার, অন্তরে সব বাজতাসে!' প্রকৃত 'গুরু' ছিলেন সুবল দাস বাউল

তিনি নিজেকে কখনও 'গুরু' বলেননি। তিনি সব সময় বলতেন, "গুরুগিরি আমার কাম নয়। আসল গুরু হলো সময়।"

সিনেমার নিন্দে করে জুটেছে প্রযোজকের মারও, বাঙালি মনে রাখেনি মৃগাঙ্কশেখর রায়কে

Pagoler Songe Jabi: শুনেছি তাঁর সমালোচনা পড়ে নাকি আধিকাংশ দর্শক ঠিক করত, কোন ছবি দেখবে।

ধর্মীয় বিভেদের রাজনীতির বাড়বাড়ন্তে আতঙ্কিত বাংলার ফকিররা

Fakir Culture: প্রকৃতপক্ষে এই ফকিররাই কিন্তু হতে পারেন বিভেদকামী রাজনীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।