উপাস্য দেবতা 'কালী', সাহেবদের চোখে চোর হয়েও যেভাবে বাঁচে জিপসিরা

জিপসিদের আদি খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে যে, কোনও এক সময় দক্ষিণ এশিয়া থেকে এই যাযাবর সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভ্রাম্যমান হয়।

Ladly Mukhopadhaya
৩ মিনিট
উপাস্য দেবতা 'কালী', সাহেবদের চোখে চোর হয়েও যেভাবে বাঁচে জিপসিরা

আমার তখন বিশ কি বাইশ বছর বয়স। তখন কলকাতায় নিয়মিত বিদেশি ছবি দেখা যেত সাহেবপাড়ার ছবিঘরগুলোতে। সম্ভবত কোনও এক দাদার পরামর্শে দেখে ফেলি অসাধারণ একটা প্যানরামিক ছবি। ছবিটার নাম ছিল, 'জিপসি ক্যাম্প ভ্যানিশেস ইনটু দ্য ব্লু'। তার আগে জিপসিদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানা ছিল না। টুকরোটাকরা কিছু হয়তো শুনেছিলাম, তা তেমন বিশেষ কিছু নয়। এই ছবিটিই প্রথম আমাকে উৎসাহিত করে জিপসিদের প্রতি। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা! গানে মোড়া সিনেমা।

জিপসিদের বিস্রস্ত জীবনের দিনলিপি। সেই ছবিতে একজন গিটারবাদকের বাজাতে বাজাতে খুন হয়ে যাওয়া আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই বয়সে সিনেমায় প্রথম আমি ডাবল ফ্রেডবোর্ডের গিটার দেখেছিলাম। অনেক পরে আমি ম্যাক্সিম গোর্কির এই লেখাটি পড়ি। মূল লেখাটি আমাকে আরও উসকে দেয়।

এরও অনেকানেক পরে আমার আলাপ হয় পাসকাল ট্রেভিনির সঙ্গে। ক্রমে বন্ধুত্ব গাঢ় হলে জানতে পারি যে, এই ফরাসি কবি একজন জিপসি-বিশেষজ্ঞ। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ব্যান্ড 'জিপসি কিং'-এর একজন সংকলক, সংগ্রাহক ও সম্পাদক। তো এইখান থেকে শুরু হলো যাত্রা। পাসকালের সূত্রে বহু জিপসিদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। বেশ কিছু জিপসি ডেরায় যাওয়ার সুযোগ ঘটেছে বছরের পর বছর। তবে জিপসিদের সঙ্গ করা বা তাদের ডেরায় যাওয়া খুব সহজ ছিল না। এরা সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে অসম্ভব আগ্রাসী। এমনকী, খুনোখুনির ঘটনাও আছে।

আসলে জিপসিরা যে-দেশেই থাকুক না কেন, তারা সমাজের মূল জীবন ধারা থাকে বিচ্ছিন্ন। মূলত, শহরের বাইরে তারা ডেরা বাঁধে। এক জায়গায় সাধারণত থাকে না। তাদের ভ্রাম্যমান জীবনে প্রতিনিয়তই থাকে বিরোধ-বিবাদে অস্থির এক পথ চলা। কখনও পশুর মতো এদের তাড়া করে শিকার করেছে ডিউক কিংবা রাজা-জমিদাররা। এদের হাত থেকে জিপসি মহিলারাও পার পাইনি। আবার কখনও নিও-ফ্যাসিস্ট ও কনজার্ভেটিভদের অত্যাচারে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছে এক একটা জিপসি ক্যাম্প। এদের জন্য কোনও আইন নেই, আদালত নেই। জিপসি মানেই ধরো-মারো। একটা সময়ে এর বিরুদ্ধে নানা আন্দোলনের চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু অবস্থার খুব একটা হেরফের হয়নি।

ইউরোপে জিপসি ক্যাম্প জনজীবনে ব্রাত্য। মনে করা হয়, জিপসি মানেই চোরছ্যাঁচড়, ধাপ্পাবাজ, খুনি আর মাদক বিক্রেতা। তার খানিকটা সত্য হলেও সবটা নয়। স্পেনের সীমান্তে থাকা একটি জিপসি ক্যাম্পে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বছরপাঁচেক আগে। সেখানে একটি জিপসি ক্যাম্প পুলিশের ঘেরাটোপে আছে। যতদিন তারা থাকবে, ততদিন পুলিশ থাকবে। নইলেই বিপত্তি।সেই ক্যাম্প এতটাই ব্রাত্য যে, সাধারণ মানুষ তার ধারে-কাছের রাস্তা দিয়েও হাঁটে না। এরা জিপসিদের ঘৃণা করে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা যে, সুন্দর দেখতে জিপসি মেয়েরা যখন পথের ধারে দেহোপসারিনীর কাজে দাঁড়িয়ে থাকে তখন সাদা চামড়ার বাবুগণের তাদের শরীরের দামদস্তুর করতে অসুবিধে হয় না। জিপসিরা কাজ করে না, এটা যেমন ঠিক, তেমনই কাজ পায় না, এটাও ঠিক।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যাযাবর, অচ্ছুৎ, 'আধা-বেশ্যা'! যেভাবে বাঁচে রাজস্থানের কালবেলিয়ারা

একদিন হয়তো প্রকৃত সমাদর পাবে এই ভেবে নিজেদের প্রস্তুত রাখছে কালবেলিয়ারা।

ফলে ক্রমান্বয়ে জিপসি-বিরোধিতা আজও চলে আসছে। প্রকৃতপক্ষে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপে নিগৃহীত হয়ে আসছে এরা। নাৎসিবাহিনীর হাতে এক মিলিয়নের বেশি জিপসি খুন হয়েছে। শোনা গেছে, মধ্যযুগে চেকোস্লোভাকিয়ায় জিপসিদের ধরে তাদের কান কেটে নেওয়া হতো অকারণেই, বিদ্বেষ থেকে। হয়তো এইসব কারণেই জিপসি জনগোষ্ঠী নিজেরাই তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখে বা রাখতে বাধ্য হয়। অথচ এই জিপসি জনগোষ্ঠীর নব্বই শতাংশই গানবাজনা কিংবা নাচ করতে পারে। শুধু 'পারে' বললে কম বলা হবে। তারা অসম্ভব পারদর্শী। আজকে সারা পৃথিবীতে জিপসি মিউজিক এক অনন্যসাধারণ জায়গা করে নিয়েছে। ওদেরই রচিত মিউজিক কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে। যারা ব্যবসা করছে, তারা কিন্তু কেউই জিপসি নয়।

'দ্য জিপসি ক্যাম্প ভ্যানিশেস ইন টু দ্য ব্লু' ছবির পোস্টার

জিপসিদের আদি খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে যে, কোনও এক সময় দক্ষিণ এশিয়া থেকে এই যাযাবর সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভ্রাম্যমান হয়। এদের ভাষাকে রোমানি ভাষা বলা হয়। এই ভাষায় অসংখ্য হিন্দি শব্দের ব্যবহার থেকে মনে করা হয় যে এরা রাজস্থান থেকে এসেছিল। জিপসিরা খুব সম্ভবত ছিল দলিত সম্প্রদায়।

হয়তো বর্ণপ্রথার থেকে নিষ্কৃতি পেতেই কিংবা মাহমুদ গজনির অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতেই এই জীবন বেছে নেয়। যেমন, 'রোমানি' শব্দের অর্থ হলো সিন্ধি। অর্থাৎ সিন্ধু উপত্যকার সঙ্গে এদের যোগ থাকতে পারে। হাজার বছর আগে জিপসিরা ভারত ছেড়ে যায়। এদের উপাস্য দেবতা হলো 'কালী সারা', এখানেও একটা ভারতীয় যোগসূত্র থেকে গেছে। দেখেছি, এদের জীবনযাত্রায় আজও ভারতীয় গন্ধ লেগে আছে।

কিন্তু কোনও মানবিক অধিকার নেই আজও।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ধর্মে মুসলমান, কণ্ঠে শিবের গীত, রাজস্থানের আশ্চর্য জাতি মাঙ্গানিয়ার

পশ্চিম রাজস্থানের মরুপ্রান্তরে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বারমের ও জয়সলমিরের নানা স্থানে মাঙ্গানিয়ার লোকশিল্পীদের এক একটা গ্রাম। সেখানে তাদের গান ও জীবনযাপন ছিল আমাদের কাজের উপজীব্য বিষয়।

বইমেলা থেকে নিষিদ্ধপল্লি- সব একাকার ছিল কলেজস্ট্রিটের এই আড্ডায়

আমার দেখা অপরাজেয় আড্ডাধারী ছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু ওপরে যত লেখক-শিল্পীদের নাম লিখেছি, তার অধিকাংশই সন্দীপনদাকে অপছন্দ করতেন। তিনি ছিলেন স্বভাব-রসিক। একবার অরূপরতন সম্পর্কে আমায় বলেছিলেন যে, 'আচ্ছা বলো তো, অরূপ তারকোভস্কির মতো গল্প লেখে কিন্তু সুখেন দাশের মতো ছবি করে কি করে?'

পৃথিবীর প্রাচীনতম ফ্লাইওভার এই শহরে, ভবঘুরের ঠিকানা ফ্লোরেন্স

ভাসারির দু'পাশ সারারাত মাতিয়ে রাখে নাম না-জানা মিউজিসিয়ান, কোনও অন্ধ বাদ্যযন্ত্রী আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গানবাজনার দল। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার এই শহরে কিন্তু অসংখ্য ভবঘুরের যাতায়াত।

নেশা আর খিস্তির আড়ালে ঢাকা পড়ে গেলেন যে বাউল

ভাবের আড়ম্বর নেই। এ নেহাতই সাধারণ অর্থে সহজ-সাধারণ। গৌরকে জানতে হলেও ওই সহজিয়া পথ ধরতে হবে। ওর কথা শুনলেই বোঝা যায়, এই বিশ্বসংসারের তাবৎ কৌশল আর লেনাদেনার সে ঊর্ধ্বে, তথাপি দৈনন্দিন সমাজের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য আছে।

'সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরাম্যান' হয়ে রয়ে গেলেন, যে সুব্রত মিত্রকে চিনল না বাঙালি

আমাদের বিস্মিত হওয়া ও ওঁর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মূল কারণ ছিল যে, সুব্রতদা 'অপরাজিত' ছবিতে প্রথম বাউন্স লাইট করে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সাদা কাপড়ের বিপরীতে লাইট রেখে সিনেমায়ার অভ্যুত্থান ঘটালেন।

রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা আঁকা হয়, শাসকের চোখে এখনও এই শিল্প 'সন্ত্রাসবাদ'

নর্মানের মতো এইসব গ্রাফিত্তির আর্টিস্টরা মূলত রাতের অন্ধকারে তাদের কাজটি সম্পন্ন করে। এমনভাবে পরিকল্পনা করে, যাতে রাতারাতি কাজ শেষ করে চম্পট দেওয়া যায়।

বামপন্থী আন্দোলন ক‍রতে গিয়েই জেল খাটা, তবু বামেরা বলেছিল সিআইএ-র দালাল

তথাকথিত আমোদগেঁড়ে বাজার সংস্কৃতির সঙ্গে দিললাগি করতে পারেননি। বিরুদ্ধতায়, ঝগড়ায়, ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তামাম ভালো থাকার সোহাগি আকাঙ্ক্ষা।

সে ছিল এক অন্য 'দুয়ারে সংস্কৃতি'! উত্তরবঙ্গের সেই মেলায় তৈরি হয়েছিল ইতিহাস

আমরা মনে করতাম, শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমের যে আন্তঃসম্পর্ক, তাকে একই মঞ্চে উপস্থাপিত করতে হবে। সেই মঞ্চ হবে খোলা আকাশের নিচে, রাস্তায়, মাঠে-ঘাটে, হাটেবাজারে, খোলামেলায়।