উপাস্য দেবতা 'কালী', সাহেবদের চোখে চোর হয়েও যেভাবে বাঁচে জিপসিরা


আমার তখন বিশ কি বাইশ বছর বয়স। তখন কলকাতায় নিয়মিত বিদেশি ছবি দেখা যেত সাহেবপাড়ার ছবিঘরগুলোতে। সম্ভবত কোনও এক দাদার পরামর্শে দেখে ফেলি অসাধারণ একটা প্যানরামিক ছবি। ছবিটার নাম ছিল, 'জিপসি ক্যাম্প ভ্যানিশেস ইনটু দ্য ব্লু'। তার আগে জিপসিদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানা ছিল না। টুকরোটাকরা কিছু হয়তো শুনেছিলাম, তা তেমন বিশেষ কিছু নয়। এই ছবিটিই প্রথম আমাকে উৎসাহিত করে জিপসিদের প্রতি। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা! গানে মোড়া সিনেমা।

জিপসিদের বিস্রস্ত জীবনের দিনলিপি। সেই ছবিতে একজন গিটারবাদকের বাজাতে বাজাতে খুন হয়ে যাওয়া আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই বয়সে সিনেমায় প্রথম আমি ডাবল ফ্রেডবোর্ডের গিটার দেখেছিলাম। অনেক পরে আমি ম্যাক্সিম গোর্কির এই লেখাটি পড়ি। মূল লেখাটি আমাকে আরও উসকে দেয়।

এরও অনেকানেক পরে আমার আলাপ হয় পাসকাল ট্রেভিনির সঙ্গে। ক্রমে বন্ধুত্ব গাঢ় হলে জানতে পারি যে, এই ফরাসি কবি একজন জিপসি-বিশেষজ্ঞ। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ব্যান্ড 'জিপসি কিং'-এর একজন সংকলক, সংগ্রাহক ও সম্পাদক। তো এইখান থেকে শুরু হলো যাত্রা। পাসকালের সূত্রে বহু জিপসিদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। বেশ কিছু জিপসি ডেরায় যাওয়ার সুযোগ ঘটেছে বছরের পর বছর। তবে জিপসিদের সঙ্গ করা বা তাদের ডেরায় যাওয়া খুব সহজ ছিল না। এরা সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে অসম্ভব আগ্রাসী। এমনকী, খুনোখুনির ঘটনাও আছে।

আরও পড়ুন: যাযাবর, অচ্ছুৎ, ‘আধা-বেশ্যা’! যেভাবে বাঁচে রাজস্থানের কালবেলিয়ারা

আসলে জিপসিরা যে-দেশেই থাকুক না কেন, তারা সমাজের মূল জীবন ধারা থাকে বিচ্ছিন্ন। মূলত, শহরের বাইরে তারা ডেরা বাঁধে। এক জায়গায় সাধারণত থাকে না। তাদের ভ্রাম্যমান জীবনে প্রতিনিয়তই থাকে বিরোধ-বিবাদে অস্থির এক পথ চলা। কখনও পশুর মতো এদের তাড়া করে শিকার করেছে ডিউক কিংবা রাজা-জমিদাররা। এদের হাত থেকে জিপসি মহিলারাও পার পাইনি। আবার কখনও নিও-ফ্যাসিস্ট ও কনজার্ভেটিভদের অত্যাচারে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছে এক একটা জিপসি ক্যাম্প। এদের জন্য কোনও আইন নেই, আদালত নেই। জিপসি মানেই ধরো-মারো। একটা সময়ে এর বিরুদ্ধে নানা আন্দোলনের চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু অবস্থার খুব একটা হেরফের হয়নি।

ইউরোপে জিপসি ক্যাম্প জনজীবনে ব্রাত্য। মনে করা হয়, জিপসি মানেই চোরছ্যাঁচড়, ধাপ্পাবাজ, খুনি আর মাদক বিক্রেতা। তার খানিকটা সত্য হলেও সবটা নয়। স্পেনের সীমান্তে থাকা একটি জিপসি ক্যাম্পে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বছরপাঁচেক আগে। সেখানে একটি জিপসি ক্যাম্প পুলিশের ঘেরাটোপে আছে। যতদিন তারা থাকবে, ততদিন পুলিশ থাকবে। নইলেই বিপত্তি।সেই ক্যাম্প এতটাই ব্রাত্য যে, সাধারণ মানুষ তার ধারে-কাছের রাস্তা দিয়েও হাঁটে না। এরা জিপসিদের ঘৃণা করে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা যে, সুন্দর দেখতে জিপসি মেয়েরা যখন পথের ধারে দেহোপসারিনীর কাজে দাঁড়িয়ে থাকে তখন সাদা চামড়ার বাবুগণের তাদের শরীরের দামদস্তুর করতে অসুবিধে হয় না। জিপসিরা কাজ করে না, এটা যেমন ঠিক, তেমনই কাজ পায় না, এটাও ঠিক।

ফলে ক্রমান্বয়ে জিপসি-বিরোধিতা আজও চলে আসছে। প্রকৃতপক্ষে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপে নিগৃহীত হয়ে আসছে এরা। নাৎসিবাহিনীর হাতে এক মিলিয়নের বেশি জিপসি খুন হয়েছে। শোনা গেছে, মধ্যযুগে চেকোস্লোভাকিয়ায় জিপসিদের ধরে তাদের কান কেটে নেওয়া হতো অকারণেই, বিদ্বেষ থেকে। হয়তো এইসব কারণেই জিপসি জনগোষ্ঠী নিজেরাই তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখে বা রাখতে বাধ্য হয়। অথচ এই জিপসি জনগোষ্ঠীর নব্বই শতাংশই গানবাজনা কিংবা নাচ করতে পারে। শুধু 'পারে' বললে কম বলা হবে। তারা অসম্ভব পারদর্শী। আজকে সারা পৃথিবীতে জিপসি মিউজিক এক অনন্যসাধারণ জায়গা করে নিয়েছে। ওদেরই রচিত মিউজিক কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে। যারা ব্যবসা করছে, তারা কিন্তু কেউই জিপসি নয়।

The Gypsy Camp Vanishes into the Blue

'দ্য জিপসি ক্যাম্প ভ্যানিশেস ইন টু দ্য ব্লু' ছবির পোস্টার

জিপসিদের আদি খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে যে, কোনও এক সময় দক্ষিণ এশিয়া থেকে এই যাযাবর সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভ্রাম্যমান হয়। এদের ভাষাকে রোমানি ভাষা বলা হয়। এই ভাষায় অসংখ্য হিন্দি শব্দের ব্যবহার থেকে মনে করা হয় যে এরা রাজস্থান থেকে এসেছিল। জিপসিরা খুব সম্ভবত ছিল দলিত সম্প্রদায়।

হয়তো বর্ণপ্রথার থেকে নিষ্কৃতি পেতেই কিংবা মাহমুদ গজনির অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতেই এই জীবন বেছে নেয়। যেমন, 'রোমানি' শব্দের অর্থ হলো সিন্ধি। অর্থাৎ সিন্ধু উপত্যকার সঙ্গে এদের যোগ থাকতে পারে। হাজার বছর আগে জিপসিরা ভারত ছেড়ে যায়। এদের উপাস্য দেবতা হলো 'কালী সারা', এখানেও একটা ভারতীয় যোগসূত্র থেকে গেছে। দেখেছি, এদের জীবনযাত্রায় আজও ভারতীয় গন্ধ লেগে আছে।

কিন্তু কোনও মানবিক অধিকার নেই আজও।

 

 

 

 

 

More Articles

;