সাগরদিঘি উপনির্বাচনের ফলাফলের বার্তা: সংখ্যালঘুরা শুধু ভোটব্যাঙ্ক নন

Sagardighi By Election West Bengal Politics : শুধু তৃণমূল বিরোধী ভোট নয়, বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সমর্থকদের ভোটও কংগ্রেস প্রার্থীর বাক্সে এসেছে।

Sambit Pal
৩ মিনিট
সাগরদিঘি উপনির্বাচনের ফলাফলের বার্তা: সংখ্যালঘুরা শুধু ভোটব্যাঙ্ক নন

সাগরদিঘি উপনির্বাচনে শাসক তৃণমূলের পরাজয় ও কংগ্রেস-বামফ্রন্টের জয়কে অনেকেই অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন। তৃণমূলের দিক থেকে সংখ্যালঘুরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন - এমনই বার্তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে।

সংখ্যালঘু অধ্যুষিত একটি বিধানসভা কেন্দ্রে তিনবার জেতার পরেও ২০২৩-এর উপনির্বাচনে শাসক দলের এই পরাজয়ে সংকেত অবশ্যই রয়েছে। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে যে তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল সাগরদিঘি কেন্দ্রে, সেই দলই দুই বছরের মাথায় পাচ্ছে ৩৫ শতাংশ ভোট। আর কংগ্রেস-বামেরা ১৯ শতাংশ থেকে ভোট বাড়িয়ে পেয়েছে ৪৭ শতাংশ। বিজেপির ভোটও কমেছে ১০ শতাংশের মতো। শুধু তৃণমূল বিরোধী ভোট নয়, বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সমর্থকদের ভোটও কংগ্রেস প্রার্থীর বাক্সে এসেছে।

একটি উপনির্বাচনের ফল দেখেই রাজ্যের রাজনীতির সার্বিক চালচিত্র এঁকে ফেলাও বোধহয় অতি সরলীকরণ হবে। কিন্তু সংকেতগুলি একেবারেই উপেক্ষা করা কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সম্ভব হবে না। বিজেপির ভয়ে যে সংখ্যালঘুরা ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে নিজেদের সমর্থন তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে সঁপে দিয়েছিলেন, সেই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত একটি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটাররা তৃণমূলে আস্থা রাখতে পারলেন না কেন? কেন তাঁরা বাম-কংগ্রেসদের জোট প্রার্থী বায়রন বিশ্বাসের উপর ভরসা রাখলেন?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মোদির সংকটে 'পাশে আছি'! দেশকে ভালোবাসার নতুন পাঠ শেখাচ্ছেন রাহুল গান্ধী

Rahul Gandhi and Narendra Modi: মঙ্গলবার রাতে স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মা হীরাবেন মোদি।

২০২১-এ ভয় তো শুধু সংখ্যালঘুরা পাননি, ভয় রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসও পেয়েছিল। তাই ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের পরে বা তার আগে থেকেই রামনবমী দিয়ে মেরুকরণের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের ঘাড়ে চেপে বসে। তারপরে বিজেপিকে নিয়ে বেজায় ভয়ে ছিল শাসকদল তৃণমূল। ধীরে ধীরে 'হিজাব-হোর্ডিং' সরে গিয়ে ফেসবুক ও টুইটারের পাতা 'মন্দির-দেবতা-দর্শনের' ছবিতে ভরে গেছে। হালে বারাণসীর আদলে গঙ্গারতিও শুরু হয়ে গেছে রাজ্যে।

মেরুকরণের রাজনীতিতে ভয় পেয়ে শাসকদলের নেতৃত্ব যখন ইমেজ-বদলের খেলায় নেমেছে, তখন ধরেই নেওয়া হয়েছে সংখ্যালঘুরা 'দুধেল গাই' হিসেবেই আছে এবং থাকবে। দক্ষিণ কলকাতার 'ধর্মনিরপেক্ষ' নেতা-ই এই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করবেন। দাপটে থাকবেন শীর্ষ স্তরে। দরকার হলে দলের মুখ হয়ে যাবেন। বাকি সংখ্যালঘু নেতারা নিজেদের জেলায় জেলায় বা এলাকায় প্রতিপত্তিটুকু বজায় রাখতে পারলেই হবে। শীর্ষ নেতৃত্বে তাঁদের আর দরকার নেই। শুধু ভোটবাক্সে ভোটটি এনে ফেলার কাজটি করলেই হবে।

কিন্তু সেই রাজনীতির অঙ্ক যখন গুলিয়ে যায়, তখনই সাগরদিঘি হয়। পিছিয়ে পড়া সমস্ত সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংখ্যালঘুদের নিয়ে উন্নয়নের রাজনীতি করতে গিয়েই নওশাদ সিদ্দিকি শাসক দলের অঙ্ক গুলিয়ে দেন। সদ্য বিজেপি ত্যাগী নেতা বাবুল সুপ্রিয়কে বালিগঞ্জ উপনির্বাচনে প্রার্থী করতে গেলেও সেই অঙ্ক গুলিয়ে যায় (দক্ষিণ কলকাতা হওয়ায় নেহাত সেখানে শাসক দলের সংগঠন মৌলিকভাবেই শক্তপোক্ত ছিল, তাই ব্যবধান কমলেও জিতে যান বাবুল)।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১০ বছরের ঘাসফুল দুর্গে ভাঙন! সাগরদিঘিতে কোন মন্ত্রে তৃণমূলকে হারাল বাম-কংগ্রেস জোট?

Sagardighi Bypoll Election 2023 : পরিবর্তনের হাওয়া ঘুরে গেল একেবারে? বিজেপি নয়, বাম-কংগ্রেসকেই কি বেছে নিচ্ছে মানুষ?

সাগরদিঘির ফলাফল বলছে, শাসকের প্রতি আস্থা না রেখে ভোটাররা কংগ্রেস ও বামেদের প্রতি আস্থা রেখেছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োগ-দুর্নীতি থেকে শুরু করে সংখ্যালঘুদের উপর নিজেদের একচেটিয়া অধিকার রয়েছে বলে যে আত্মসন্তুষ্টি শাসকদলকে গ্রাস করেছে - তার সবটার ফল হাতেনাতে মিলেছে। কিন্তু এতে কংগ্রেস ও বামেদের এখনই উল্লসিত হওয়ার কারণ নেই। এটি যেমন শাসকদলের জন্য অশনি সংকেত, তেমনই বিরোধী দলগুলির জন্য দায়িত্ববান হওয়ার সংকেতও বটে।

সময়ের বদল হচ্ছে। শুধুই ভয়ের কারণে, নিরাপত্তার খাতিরে একটি দলকেই সংখ্যালঘুরা একাধারে ভোট দিয়ে যাবে, সেটা ভাবার দিন চলে যাচ্ছে। সংখ্যালঘুদের শুধুমাত্র ভোটবাক্স ভাবার দিনও শেষ হবে। উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে একজনও সংখ্যালঘু বিধায়ক ছাড়া বিজেপি রাজত্ব করে চলেছে। সে রাজ্যেরই রামপুরের মতো সমাজবাদী পার্টির নেতা আজম খানের গড়ে বিজেপি প্রার্থী উপনির্বাচনে জয়ী হচ্ছেন।

ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির সঙ্গে কাদের কী অশুভ আঁতাত তা নিয়ে তদন্ত চলছে। চলুক। সত্যি-মিথ্যে তদন্ত সাপেক্ষ। কিন্তু নওশাদের রাজনীতির পথে সব রাজনৈতিক দল সামিল হোক। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক উন্নয়নে সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগুরুর সঙ্গে এক সারিতে নিয়ে আসার রাজনীতি হোক।

মনে রাখতে হবে, সেই ২০০১ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছিলেন, রাজ্যের মাদ্রাসাগুলি মুসলমান মৌলবাদীদের আখড়া হয়ে যাচ্ছে। তখন তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানির সঙ্গে বুদ্ধবাবুর খুব ঘনিষ্ঠতা। সেটা অবশ্য প্রশাসনিক কারণে। কিন্তু তখন থেকেই বামেদের প্রতি অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হতে শুরু করেছিল সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে। তারপর এক দশকে সাচার কমিটির রিপোর্ট এসেছে। রিজওয়ানুর রহমানের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যে সংখ্যালঘু ও তফসিলি জাতির মানুষেরা কৃষিকাজে যুক্ত ছিলেন। শিল্পের জন্য তাদের জমিতে হাত পড়েছে। এই ঘটনা পরম্পরা বর্তমান শাসকদলকে সরকার পরিবর্তনে সাহায্য করেছে। এটি ঘটতে লেগেছে প্রায় ১০টি বছর।

কাজেই সাগরদিঘি অশনি সংকেত দিয়ে গেলেও, সেই সংকেতকে শাসক ও বিরোধী দলগুলি কে কেমন করে কাজে লাগায় তা দেখতে হবে। এই সংকেতকে বিরোধী দলগুলির অশুভ আঁতাত বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না। আবার পুরনো রাজনীতির পথে গিয়ে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক দখল করে রাখার ভাবনা নিয়ে রাজনীতি করলেও চলবে না। পশ্চিমবঙ্গে আরও দায়িত্বশীল রাজনীতি হোক, শাসক-বিরোধী দু'পক্ষের তরফেই।

লিখেছেন
Sambit Pal
Sambit Pal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।