কেন আক্রমণ সলমন রুশদির ওপর? আসল কারণ লুকিয়ে সেই 'ধর্মীয় ভাবাবেগে'

৭৫ বছর বয়সি বুকারজয়ী লেখক সলমন রুশদির জীবনে বিতর্ক এই প্রথম নয়। লেখকজীবনের শুরু থেকেই তাঁর দুঃসাহসী লেখনীর জন্য বারবার বিতর্ক ও আক্রমণের স্বীকার হতে হয়েছে তাঁকে।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
কেন আক্রমণ সলমন রুশদির ওপর? আসল কারণ লুকিয়ে সেই 'ধর্মীয় ভাবাবেগে'

নিজের দীর্ঘ লেখকজীবনে একাধিকবার বিতর্কে জড়িয়েছেন তিনি। নিউ ইয়র্কের শতকা ইনস্টিটিউটে বক্তৃতা দিতে যাওয়ার সময় ছুরিকাহত হয়ে ফের আরও একবার শিরোনামে বুকারজয়ী ব্রিটিশ-ভারতীয় লেখক সলমন রুশদি।

অ্যাসোসিয়েট প্রেসের সংবাদ অনুযায়ী, রুশদি মঞ্চে বক্তৃতা দিতে শুরু করার পরেই এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি মঞ্চে উঠে ছুরি নিয়ে আক্রমণ করেন সলমন রুশদিকে। সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়েই ১০-১৫ বার রুশদির ঘাড়ে ছুরি দিয়ে কোপানো হয়। ঘটনার অভিঘাতে আহত হয়ে মাটিতে পরে যান তিনি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত নিউ ইয়র্ক পুলিশ আততায়ীকে গ্রেফতার করে এবং জরুরি ভিত্তিতে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে গিয়ে রুশদিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৭৫ বছর বয়সি বুকারজয়ী লেখক সলমন রুশদির জীবনে বিতর্ক এই প্রথম নয়। লেখকজীবনের শুরু থেকেই তাঁর দুঃসাহসী লেখনীর জন্য বারবার বিতর্ক ও আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে।

সলমন রুশদি: জীবন ও সাহিত্য

সলমন রুশদির জন্ম স্বাধীনতার ঠিক প্রাক মুহূর্তে। ১৯৪৭-এর ১৯ জুন ব্রিটিশ ভারতের বোম্বাই প্রেসিডেন্সি তে জন্মগ্রহণ করেন সলমন রুশদি। '১৯৭৫ সালে গ্রিমাস' লেখার মধ্যে দিয়ে রুশদির সাহিত্যজীবনে হাতেখড়ি। ১৯৮১-তে লিখছেন তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা উপন্যাস, ভারতের পটভূমিকায় লেখা 'মিডনাইটস চিলড্রেন'। 'মিডনাইট'স চিলড্রেন' ভারতের স্বাধীনতা, দেশভাগ এর পটভূমিকায় লেখা একটি ম্যাজিক রিয়েল গদ্য। এই বইটির জন্যই বুকার পুরস্কার লাভ করেন রুশদি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জেসন রেকুলাকের 'হিডেন পিকচার্স': অসহ্য সাসপেন্স, সত্যসন্ধানী হরর-থ্রিলার

ক্লাসিক বেবি-সিটিং হরর ফিকশনকে একদম নতুন মোড়কে পরিবেশন করার এই প্রচেষ্টায় বলাই যায় জেসন রেকুলাক সফল হয়েছেন।

১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনের অন্যতম বিতর্কিত উপন্যাস 'দি স্যাটানিক ভার্সেস'। লেখক হিসেবে নিজের সব লেখায় রুশদি মৌলবাদের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর ওপর মৌলবাদীদের আক্রমণ কোনও নতুন ঘটনা নয়। হাজার বিরোধিতা, প্রাণনাশের হুমকি ও রুশদির কলমকে স্তিমিত করতে পারেনি। নিজের লেখনীর সঙ্গে কখনোই আপোষ করেননি রুশদি। মৌলবাদীদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে থেকেছেন তিনি। তবুও থামেনি তাঁর কলম। সেই সময়ও ছদ্মনামে লিখেছেন 'ইমাজিনারি হোমল্যান্ড', 'হারুন এন্ড দি সি অফ স্টোরিজ', 'দি মুরস লাস্ট সাই'-এর মতো বিখ্যাত সব লেখা। আত্মগোপনের পর প্রকাশ্যে এসে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ' দি গ্রাউন্ড বিনিথ হার ফিট '। ২০০৭ সালে সাহিত্যে রুশদির অবদানের জন্য ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ তাঁকে নাইট উপাধিতে সম্মানিত করেন।

রুশদি ও বিতর্ক

১৯৮৮ সালে প্রকাশিত 'দি স্যাটানিক ভার্সেস' নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় ইসলামিক দেশগুলির মধ্যে। এই বই লেখার অপরাধে ১৯৮৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা রুহোল্লা খোমেইনি রুশদির নামে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন। রুশদির মাথার দাম ধার্য হয় প্রায় ৩০ লক্ষ ডলার। ইসলামিক দেশগুলির উসকানিতে প্রায় সব দেশেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের আক্রমণের স্বীকার হন রুশদি।

রুশদির 'দি স্যাটানিক ভার্সেস' ইসলাম ধর্মগুরু মহম্মদের জীবন থেকে নেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির মতে কোরানের বিভিন্ন পংক্তি এবং নবী মহম্মদের জীবনের কাহিনিকে বিকৃত করেছেন রুশদি। উপন্যাসে মহম্মদ কে কোনো কোনও জায়গায় মাহউনদ বলা হয়েছে যা ক্রুসেডের সময় মহম্মদ সম্পর্কে বলা হতো। ইসলাম মৌলবাদীরা এমনই বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে রুশদি কে আক্রমণ করেন। এই আক্রমণ প্রসঙ্গে একবার রুশদি বলেছিলেন, "আমি যে সময়ে এই বইটা লিখি সেই সময়ে ইসলাম নিয়ে এইরকম মাতামাতি ছিল না। এখন মানুষ আগের থেকে ও অনেক বেশি বিভিন্ন বিষয়ে ওয়াকিবহাল হয়েছে।"

'দি স্যাটানিক ভার্সেস'-এর জন্য রুশদি প্রায় ১৩ বছর ছদ্মনামে কাটিয়েছেন। এর আগে নয়ের দশকেও এই বইয়ের জন্য ইতালির মিলান শহরে আক্রান্ত হয়েছেন রুশদি। এমনকী, জাপানি ভাষায় 'দি স্যাটানিক ভার্সেস' অনুবাদের জন্য টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুরি মেরে খুন করা হয় অনুবাদক হিতোসি ইগারাসিকে।

১৯৯৮ সালে ইরানে সরকার বদলের পর রুশদির ওপর থেকে মৃত্যুর 'ফতোয়া' প্রত্যাহার করা হয়। রুশদির ওপর আক্রমণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই সময় পাশ্চাত্যে এক নতুন তর্কের উদ্ভব হয়। একদিকে পশ্চিমের দেশগুলো যখন ব্যক্তির স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার তুলে ধরছে বিশ্বের দরবারে ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি ধর্মীয় সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু এতসব বিতর্কের মাঝেও থামেনি রুশদির 'সাহসী কলম'। বারবারই যে কোনো মৌলবাদের বিরুদ্ধে নিজের লেখার মধ্যে দিয়ে যুদ্ধ জারি রেখেছেন তিনি।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।