কালীর মূর্তি নেই, বীজমন্ত্রে পূজিত হন দেবী || বর্ধমানের এই শক্তিপীঠে পড়েছিল সতীর বাম বাহু

এই পীঠ সম্পর্কে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। যেমন গভীর রাত্রে এখানে নূপুরের রিনিরিনি ধ্বনি শোনা যায়।এলোচুলে কেউ ঘুরে বেড়ায়, এমনকী, হাসির ধ্বনিও অনেকে শুনেছে‌।

Rupa Mitra
৩ মিনিট
কালীর মূর্তি নেই, বীজমন্ত্রে পূজিত হন দেবী || বর্ধমানের এই শক্তিপীঠে পড়েছিল সতীর বাম বাহু

সতীর দেহত্যাগের কাহিনি এবং দক্ষরাজার যজ্ঞ পণ্ড হওয়ার ঘটনা সকলেরই জানা। পিতৃগৃহে পতিনিন্দা সহ্য করতে না পেরে সতীমাতা যজ্ঞগৃহেই দেহত্যাগ করেন।এরপর সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে ক্রুদ্ধ মহাদেবের তাণ্ডবনৃত্যর ফলে ত্রিভুবন ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়। বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীমায়ের দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত করে দেন। এই ৫১টি খণ্ড যে সকল স্থানে পড়েছিল, সেই সেই স্থানে গড়ে ওঠে এক একটি সতীপীঠ তথা শক্তিপীঠ, তা হয়ে ওঠে পবিত্র পূণ্যভুমি ও তীর্থক্ষেত্র।

বর্ধমান জেলায় ৪টি সতীপীঠ আছে। সেগুলি হলো, ক্ষীরগ্রাম, বহুলা, অট্টহাস এবং উজানি। বহুলা সতীপীঠ সম্পর্কে কিছু কথা আলোচনা করা যাক।

পীঠনির্ণয় তন্ত্রমতে দেবীর বাম বাহু পড়েছিল বহুলায়।পূর্বে কেতুগ্রামকে বেহুলা বা বাহুলা নামে ডাকা হতো।পরবর্তীকালে রাজা চন্দ্রকেতুর নামানুসারে গ্রামের নাম হয় কেতুগ্রাম। রাজা চন্দ্রকেতু কার্তিক ও গণেশ-সহ বহুলা মাতার পাথরের মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্ধমানের কেতুগ্রামে অজয় নদীর তীরে মাতাবহুলা বা বহুলা মন্দিরটি অবস্থিত। কেতুগ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন বহুলা মাতা। এখানে মাতা 'বহুলাক্ষী' দেবী ও ভৈরব 'ভীরুক'। পীঠনির্ণয় তন্ত্রে এই শক্তিপীঠকে দ্বাদশ শক্তিপীঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যগ্রন্থে এখানকার অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে 'বহুলা চণ্ডিকা' বলা হয়েছে।প্রাণতোষণী তন্ত্রে এই পীঠ ও এখানকার ভৈরব সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু জ্ঞানার্ণব তন্ত্র, কুব্জিকা তন্ত্রে এই পীঠ ও এখানকার ভৈরবের উল্লেখ নেই। অন্যান্য সতীপীঠের মতো এই মন্দিরের সঙ্গে ভৈরব অবস্থান করেন না। গ্রামের অন্যদিকে অজয় নদীর তীরে শ্মশানে 'মরাঘাট মহাপীঠ' নামে একটি মন্দিরে ভৈরব ভীরুক অবস্থান করেন।

পীঠনির্ণয় তন্ত্র মতে- 'বহুলায়ং বাম বাহুবর্হুলাখ্যা এ দেবতা ভীরুকো দেবতাস্ত্রত্র সর্বসিদ্ধি প্রদায়কঃ।'

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চামুন্ডার মূর্তি যেন জীবন্ত, শিহরণ আর ভক্তি মিলেমিশে থাকে এই সতীপীঠে

দন্তুরা চামুন্ডার মূর্তিটি অদ্ভুত ধরনের দেখতে। কঙ্কালসার চেহারায় ফুটে উঠেছে বুকের পাঁজর। কান দু'টি শরীরের তুলনায় অনেক বড়। বিস্ফারিত গোলাকার দু'টি চোখ, আঁচড়ানো চুল পিঠের ওপর পড়েছে।

ভারতচন্দ্র 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন- "বহুলায় বাম বাহু ফেলিল কেশব।বেহুলা চন্ডিকা তাহে ভীরুক ভৈরব।।" 'শিবচরিত' গ্রন্থে উল্লেখ আছে, এই কেতুগ্রামেরই 'রণখণ্ড' নামে একটি স্থানে সতীর 'ডান কনুই' পতিত হয়েছিল। এখানকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন 'বহুলাক্ষী' ও ভৈরব 'মহাকাল'। কিন্তু এই নিয়ে অনেক মতান্তর আছে। এখানে দেবী চতুর্ভুজা, পদ্মের ওপর বিরাজমানা, একহস্তে ধরে আছেন কঙ্ক (চিরুনি), অন্য হস্তে ধারণ করে আছেন দর্পণ, বাকি দুই হস্তে 'বর ও অভয় মুদ্রা'। কিন্তু দেবীর এই রূপ দর্শন করা যায় না, কারণ দেবীমূর্তি সম্পূর্ণভাবে সুন্দর করে কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়। শুধুমাত্র মুখ ছাড়া অন্য কোনও অঙ্গ দর্শন করা যায় না। গবেষকদের মতে, দেবীর নাম এখানে 'ললিতা'। দেবী মাতা এখানে যুগ্মভাবে দুর্গা ও কালী- এই দুই রূপেই পুজো পেয়ে থাকেন। দেবী মাতার দক্ষিণ দিকে অষ্টভূজ গণেশের মূর্তি বিরাজ করছে (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সারা ভারতে এই অষ্টভূজাকৃতি গণেশের মন্দির আছে মোট চারটি), দেবীর বামদিকে বিরাজ করছেন কার্তিক। বহুকাল আগে 'রাও' পদাধিকারীরা এই মন্দিরের সেবাইতের কাজে নিযুক্ত ছিলেন, সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এখনও 'রায়' (রাও থেকে রায়) বংশের বংশধররাই দেবী মাতার সেবাইতের কাজ করে আসছেন। এখানে একটি পবিত্র কুণ্ড বা পুকুর বর্তমান। এর জলে ডুব দিলে সর্বরোগ সেরে যায় বলে জনশ্রুতি আছে।

সারা বছর দেবীর নিত্যপুজো হয়। প্রত্যহ দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া হয়। অত্যন্ত শান্ত এবং নিরিবিলি পরিবেশ, মন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে এই মন্দিরে এলে। দুর্গাপুজো, কালীপুজো ছাড়াও শিবরাত্রি ও গাজনের সময় ধুমধাম হয় এবং মেলা বসে। গাজনের সময় বুড়ো 'শিব'-কে নাটমন্দিরে আনা হয়।

এই পীঠ সম্পর্কে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। যেমন গভীর রাত্রে এখানে নূপুরের রিনিরিনি ধ্বনি শোনা যায়।এলোচুলে কেউ ঘুরে বেড়ায়, এমনকী, হাসির ধ্বনিও অনেকে শুনেছে। যদিও এই সকল জনশ্রুতি শুনলে গা ছমছম করে, কিন্তু তবুও মাতৃমন্দিরে প্রবেশ করলে মন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। যুগ যুগ ধরে এই যুগ্মপীঠে বহু তন্ত্রসাধক মূর্তিবিহীন কালীকে 'কালিকাপুরাণ'-এ বর্ণিত বীজমন্ত্রের দ্বারা পুজো করেন। সহস্রাধিক বৎসর ধরে এই যুগ্মপীঠে মা কালী এবং মা দুর্গা এই দুই রূপেই পূজিতা হন জাগ্রত দেবী মা বাহুলা (বহুলাক্ষীমাতা)।

লিখেছেন
Rupa Mitra
Rupa Mitra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।