চামুন্ডার মূর্তি যেন জীবন্ত, শিহরণ আর ভক্তি মিলেমিশে থাকে এই সতীপীঠে

দন্তুরা চামুন্ডার মূর্তিটি অদ্ভুত ধরনের দেখতে। কঙ্কালসার চেহারায় ফুটে উঠেছে বুকের পাঁজর। কান দু'টি শরীরের তুলনায় অনেক বড়। বিস্ফারিত গোলাকার দু'টি চোখ, আঁচড়ানো চুল পিঠের ওপর পড়েছে।

Rupa Mitra
৩ মিনিট
চামুন্ডার মূর্তি যেন জীবন্ত, শিহরণ আর ভক্তি মিলেমিশে থাকে এই সতীপীঠে

পূর্ব বর্ধমানের নিরোল গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে দক্ষিণ ডিহি গ্রামে অবস্থিত 'অট্টহাস শক্তিপীঠ'‌। এর উত্তরে বয়ে চলেছে ঈশানী নদী, তার কিছুটা দূরেই শ্মশান। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পিঠস্থান। কোনও এক অজানা কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা রাতের বেলায় এড়িয়ে চলেন অট্টহাস মন্দির। নানা অলৌকিক ঘটনা জড়িয়ে আছে এই অট্টহাস মন্দিরকে ঘিরে। দন্তুরা চামুন্ডার মূর্তি,দর্শনে খুবই ভয়াবহ। যদিও বর্তমানে দন্তুরা চামুন্ডার মূর্তিটি 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ'-এর সংগ্রহশালায় রয়েছে, তবু রাতের বেলা অট্টহাস মন্দিরে আসতে গা-ছমছম করে। এখানে দেবী 'ফুল্লরা' ও ভৈরব 'বিশ্বেস'। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে সতীর অধর, অর্থাৎ ঠোঁটের নিম্নাংশ এই স্থানে পড়েছিল। তাই দেবী এখানে 'অধরেশ্বরী' নামে পূজিতা হন। এখানে রয়েছে দেবীর একটি প্রাচীন শিলামূর্তি, মন্দিরের অষ্টধাতুর মূর্তিটি খোয়া গেছে।

একটি গহন অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত এই অট্টহাস মন্দির, হয়তো সেই কারণেই অন্যান্য সতীপীঠের মতো অট্টহাসের পরিচিতি নেই বললেই চলে। প্রাচীন এই অট্টহাস মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু কাহিনি এবং ইতিহাস। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল সঠিকভাবে বলা যায় না, কিন্তু ১৭৪২ সালে এই মন্দিরটি সংস্কার করা হয়। মায়ের প্রধান শিলাটি ভূগর্ভের কয়েক হাত নিচে চলে গেছে। পুরনো কিছু নথি এবং কিছু আঁকা থেকে এই বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায়। অট্টহাস মন্দিরের সংলগ্ন মা 'রটন্তি' কালীর মন্দির। কথিত আছে, এই রটন্তি কালীর মন্দিরে ডাকাতরা পুজো করে নরবলি দিয়ে, সেই মুণ্ডটি মন্দিরের সামনে ঝুলিয়ে রেখে ডাকাতি করতে বের হতো। এখনও পুরনো প্রথা মেনে এখনও মায়ের পূজোয় 'ছাগবলি' দেওয়া হয়। এখানে আছে 'পঞ্চমুন্ডি'-র আসন। মন্দিরে সারা বছরই ভক্তের আনাগোনা লেগে থাকে, প্রতি অমাবস্যায় প্রচুর লোকসমাগম হয়। এছাড়া দীপান্বিতা কালীপুজোয় এখানে ভক্তের ঢল নামে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেবীর কণ্ঠনালী থেকে বিষ্ণুর চরণ-চিহ্ন, বাংলার এই সতীপীঠে যেতেই হবে পুন্যার্থীকে

৫১টি শক্তিপীঠের মধ্যে ৫টি শক্তিপীঠ অবস্থান করছে বীরভূম জেলায়। শক্তিপীঠের বিচারে বীরভূমকে পূণ্যভূমি বলা হয়।

এটি শক্তিপীঠ হলেও এখানকার প্রধান উৎসব দুর্গাপুজো। দোলযাত্রা উৎসবের সূচনা হয় চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই সতীপীঠে মেলে দেবীর আধ্যাত্মিক পরশ। যুগ যুগ ধরে সাধক-রা এখানে এসেছেন এবং পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে দশমহাবিদ্যা তন্ত্রসাধনা করেছেন। জনশ্রুতি আছে, মহামায়ার লীলা প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁরা, যদিও সাধকরা কখনওই কিছু ব্যক্ত করেননি কারও কাছে। তাই অট্টহাস মন্দির এখনও রহস্যঘেরা। রটনা, ভক্তিভরে পুজো দিলে এবং একমনে মাকে ডাকলে সতীমায়ের উপস্থিতি অনুভব করা যায়।

সতীর দেহ ৫১টি খণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল। পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রামের নিরোলে একটি জঙ্গলের মধ্যে‌ সতীর অধর অর্থাৎ ঠোঁটের নিম্নাংশ পতিত হলো। অট্টহাস মন্দিরে একটি প্রাচীন শিলামূর্তি আছে, যার পাথরের ওপর খোদাই করা আছে সাপের চিহ্ন। অষ্টধাতুর মহিষমর্দিনী মূর্তিটি চুরি যাওয়ার আগে থেকেই এই প্রস্তরমূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এই মূর্তিটির পাশে 'দন্তুরা চামুন্ডা'-র একটি ছবি রেখে পুজো করা হয়। এই ছবিটিই হলো অট্টহাসের আদিমূর্তি। মা দন্তুরা চামুণ্ডার মূর্তি। আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ'-এর সংগ্রহশালায় সেই মূর্তিটি রেখে আসা হয়। ইতিহাসবিদ তথা লেখক ড‌. কালীচরণ দাস এবং প্রবীর আচার্য এর কারণ অনুসন্ধান করে বলেছিলেন, অট্টহাসে দেবীর মূল মূর্তিটি দেবীর অষ্টচামুন্ডার অন্যতম 'দন্তুরা চামুন্ডা'। এই মূর্তি ভারতে সচরাচর দেখা যায় না। এই মূর্তিটির বয়স প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরেরও বেশি। ১৯১৫-'১৬ সাল নাগাদ প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় বর্ধমান জেলার অট্টহাসে এসেছিলেন। তিনি মূর্তিটিকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সংগ্রহশালায় রাখার প্রস্তাব করেন। ঐতিহাসিক কালীচরণ দাস ও প্রবীর আচার্য উদ্যোগী হয়ে এই তথ্যটি সামনে আনেন। নিশুতি রাতে এই মূর্তিটি দেখলে রীতিমতো ভয় লাগে।

দন্তুরা চামুন্ডার মূর্তিটি অদ্ভুত ধরনের দেখতে। কঙ্কালসার চেহারায় ফুটে উঠেছে বুকের পাঁজর। কান দু'টি শরীরের তুলনায় অনেক বড়। বিস্ফারিত গোলাকার দু'টি চোখ, আঁচড়ানো চুল পিঠের ওপর পড়েছে। মুখগহ্বর থেকে বেরিয়ে এসেছে কুকুরের মতো দু'টি সুতীক্ষ্ণ দাঁত। চোখে-মুখে হিংস্রতার ছাপ পরিস্ফুট। বাঁহাতটি মাটিতে ভর দিয়ে, ডানহাত হাঁটুতে রেখে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় বসে আছেন দেবী মা। বেশিক্ষণ এই মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। যেন মনে হয়, মূর্তিটি জীবন্ত। ভয়ে রক্ত হিম হয়ে আসে। হয়তো এই কারণেই কেতুগ্রামের অট্টহাসে আজও প্রকাশ্যে আনা হয় না দেবীর আসল রূপ। প্রচারের অন্তরালে থেকে গেলেন অট্টহাসের প্রকৃত দেবী মায়ের মূর্তি, 'দন্তুরা চামুন্ডা'।

লিখেছেন
Rupa Mitra
Rupa Mitra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।