"বিশ্বাস করুন, আমি জিহাদি নই!" হিজাব ছুঁড়ে এখন বাঁচার রাস্তা খুঁজছেন আইসিস জঙ্গির বউ শামিমা

Shamima Begum BBB Podcast ISIS Terrorist wife : বন্দিদের জীবন্ত অবস্থায় মাথা কাটার সেই ভয়াবহ ভিডিও দেখে রাতে ঘুম হয়নি অনেকের। সেই আইসিসেরই সদস্যা ছিলেন এই মেয়েটি!

Aritra Som
৩ মিনিট
"বিশ্বাস করুন, আমি জিহাদি নই!" হিজাব ছুঁড়ে এখন বাঁচার রাস্তা খুঁজছেন আইসিস জঙ্গির বউ শামিমা

“হ্যাঁ, আমি চলে গিয়েছিলাম সিরিয়ায়। দুই বান্ধবীর সঙ্গেই চলে গিয়েছিলাম সেখানে। ভেবেছিলাম আর কখনও ইংল্যান্ডে ফিরব না। জঙ্গি গোষ্ঠী আইসিসে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর সেই জায়গায় নেই আমি। আমি আইসিস গোষ্ঠীর মতো নই। এখন সেখান থেকে সরে এসেছি। কোনওমতে বেঁচে আছি, বাঁচার চেষ্টা করছি। হ্যাঁ, আমি ভুল করেছিলাম। কিন্তু, বিশ্বাস করুন, আমি খারাপ মানুষ নই। জঙ্গি নই। আমি এখন বাঁচতে চাই…”

মাইকের সামনে রীতিমতো কাতর আবেদন করছিল মেয়েটি। নাকে নথ, তামাটে চামড়া, মাথায় একরাশ বাদামি খোলা চুল। এক ঝলক দেখলে মনে হবে, চোখমুখ থেকে এখনও শৈশব যায়নি এই মেয়ের। যেন ঠিক পাশের বাড়ির মধ্যবিত্ত বোনটি। কিন্তু অতীত? বারবার সেই ঢেউই ফিরে আসে মেয়েটির মনে। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ, তারপর জঙ্গি গোষ্ঠী আইসিসে যোগদান। সেই আইসিস, যাদের হত্যালীলার বর্ণনা শুনে এখনও শিউরে ওঠে মানুষ। বন্দিদের জীবন্ত অবস্থায় ছোট ছুরি দিয়ে মাথা কাটার সেই ভয়াবহ ভিডিও দেখে রাতে ঘুম হয়নি অনেকের। সেই আইসিসেরই সদস্যা ছিলেন এই মেয়েটি! এমন তকমা সারাজীবনের মতো জুড়ে গেল শামিমা বেগমের সঙ্গে।

সম্প্রতি বিবিসি-র একটি সাক্ষাৎকারের জন্য সামনে এসেছিলেন শামিমা বেগম। এখন তিনি ২৩ বছরের তরতাজা যুবতী। বর্তমানে সিরিয়া-ইরাক সীমান্তের একটি শরণার্থী শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন শামিমা। পরিবার নেই, পরিজন নেই; নিজের দেশ বলেও কিচ্ছু নেই। কিন্তু একটা সময় সবটাই ছিল। পূর্ব ইংল্যান্ডে নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে বেশ ভালোই দিন কাটাচ্ছিলেন শামিমা। বিলেতে থাকলেও জন্মসূত্রে তিনি বাংলাদেশের। কিন্তু ইংল্যান্ডেই চলছিল জীবন। পড়াশোনায় একেবারে খারাপ ছিলেন না শামিমা। মা-বাবার স্বপ্ন, মেয়ে বড় হয়ে অনেক নাম করবে। পূর্ব ইংল্যান্ডের বেথাল গ্রিন অ্যাকাডেমিতে চলছিল পড়াশোনা। বন্ধুবান্ধব, পরিবার, পড়াশোনা – সবই ছিল ঠিকঠাক। শামিমার নামও অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু যেভাবে হওয়ার স্বপ্ন ছিল, সেভাবে হল না। বদলে যা হল…

২০১৫ সাল। শামিমা বেগমের বয়স তখন ১৫। নিতান্তই এক কিশোরী। হঠাৎই নিজের দুই বান্ধবী কাদিজা সুলতানা এবং আমিরা আবাসের সঙ্গে তিনি চলে গেলেন লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরে। শামিমা নিজের ব্যাগে ভর্তি করে নিয়েছিলেন পছন্দের চকোলেট। কে জানে, আর খেতে পারবেন কিনা! সেখান থেকে বিমানে করে তিনজনেই সোজা উড়ে যান তুরস্কে। তারপর চুপিসাড়ে সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়েন সিরিয়ায়। এটা সেই সময়ের কথা, যখন গোটা বিশ্ব আইসিস জঙ্গিদের কার্যকলাপ দেখছে। শামিমা সহ তিন কিশোরী সোজা গিয়ে যোগ দিলেন সেই আইসিসেই!

বিবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনই সব কথা বলেছেন ‘জিহাদি বউ’ শামিমা বেগম। আইসিসে যোগ দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। বিয়ে দেওয়া হয় এক ডাচ আইসিস জঙ্গির সঙ্গে। ধর্মান্তরিত হয়ে জঙ্গি গোষ্ঠীতে যোগদান করেছিল সে। শামিমার পরনে উঠে আসে হিজাব, বোরখা। বিয়ের পরপরই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন শামিমা। একবার নয়, তিনবার সন্তানের জন্ম দেন তিনি। হ্যাঁ, কিশোরী বয়সেই মা হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সন্তানরা কেউই আর বেঁচে নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি, অপুষ্টি ইত্যাদি কারণে তিন সন্তানই মারা যায়। ২০১৯-এ আইসিসের পতনের পর শামিমা চলে আসেন সিরিয়ার শরণার্থী শিবিরে। তারপরই তাঁর গল্প গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

কেন আইসিসে গিয়েছিলেন শামিমা? এই প্রশ্নের আজও কোনও উত্তর নেই। আজও এই বিষয়ে চুপ তিনি। তবে শামিমা বারবার বলেছেন, নিজের ইচ্ছায় আইসিসে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সাহায্য করেছিল ওই দুই বান্ধবীও। তারা অবশ্য এখন আর বেঁচে নেই। পাশাপাশি জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্যরাও সাহায্য করেছিল। তাহলে কি ইংল্যান্ডে থাকতেই আইসিস জঙ্গিদের সংস্পর্শে এসেছিলেন শামিমা? বিমানের টিকিট, টাকা কোথায় পেলেন? তিনি তো তখন মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী ছিলেন! উত্তর আজও নেই…

তবে এই মুহূর্তে ইংল্যান্ডে ফিরতে চাইছেন শামিমা। ২৩ বছরের তরুণীর বক্তব্য, “আমি এখন নিজেকে ঘৃণা করি। গোটা বিশ্ব আমার ওপর রেগে আছে। রেগে থাকার কারণ আছেও। কিন্তু আমি এখন অন্য মানুষ। যারা ওইভাবে মানুষ মারতে পারে, তাদের সঙ্গে আমি থাকতে পারব না। তাই ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি। এখন সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে চাই। আইসিসের ঘৃণ্য কাজগুলো নিয়ে আরও জানাতে চাই।”

কিন্তু সত্যিই কি উপায় আছে? আইসিসে যোগদানের প্রসঙ্গ শুনে ব্রিটিশ প্রশাসন শামিমার নাগরিকত্ব খারিজ করে দিয়েছে। এখন বারংবার আবেদন করলেও তারা ফেরাতে চাইছে না। আইনি লড়াই চলছে। শামিমার মায়ের দেশ বাংলাদেশও তাঁকে নিতে চায় না। দুটি ক্ষেত্রে কারণ একটাই – আইসিস। শামিমা সত্যিই ফিরতে চাইছেন, নাকি এর পেছনে জঙ্গি গোষ্ঠীর কোনও পরিকল্পনা আছে? তাঁর জঙ্গি স্বামী কি এখনও বেঁচে? যোগাযোগ আছে কোনও? এখনও এনিয়ে অন্ধকারে ব্রিটিশ প্রশাসন। শামিমা কেন আইসিসে যোগ দিয়েছিলেন, তারও কোনও উত্তর মেলেনি।

কিন্তু শামিমা এখনও স্বপ্ন দেখছেন। হাল ছাড়েননি তিনি। হিজাব ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। জিন্স, জামা পরেই স্বচ্ছন্দ তিনি। বারবার একটাই উক্রি, বিশ্বাস করুন আমায়। সত্যি কথা বলছি। আমি আর জিহাদি বউ নই। আমি জঙ্গি নই। কিন্তু দোলাচল? সেটা তো কেউ থামাতে পারছে না। বিশ্বাস অবিশ্বাসের ভিত্তি তো তৈরি করে দিয়েছে ওই নামটাই – আইসিস জঙ্গির বউ!

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।