জঙ্গলে গেলেই বাঙালি শিকারি! অরণ্যে রোদনই সার

'গেম ওয়াচি‌ং' কথাটা এখনও ভারতজুড়ে ব্যবহার হয় জঙ্গল সাফারির ক্ষেত্রে। একটু অভিজাত কথা, আম-ভারতীয় সচরাচর এমন শব্দবন্ধ ব্যবহার করে না। অর্থ, জঙ্গলে গিয়ে জন্তুজানোয়ার দেখতে পাওয়া। 'গেম' লব্জটার মধ্যে সরাসরি যে ঔপনিবেশিক ইন্ধন রয়েছে, তা খুব চোখ এড়িয়ে যাওয়ার মতোও নয়। গেম, অর্থাৎ শিকার। সাহেব-মেম তো বটেই, এমনকী, নেটিভ স্টেটের রাজাদের কাছেও বন্যপ্রাণী মানেই ছিল গেম। এখানে 'মেম' শব্দটা ব্যবহার করা হল, কাজেই দায় পড়ে একটু ইতিহাস আওড়ানোর। হ্যাঁ, উপনিবেশের কর্তাদের শিকার খেলা কেবলই পুরুষের একচেটিয়া ছিল না, তাতে অংশগ্রহণ করেছেন মহিলারাও। উইলিয়াম ডবলু বেইলি (মিসেস) নামে একজনের শিকারকাহিনি লিখিত আকারেও পাওয়া যায়, চণ্ডিকাপ্রসাদ ঘোষাল, বাঙালির শিকার নিয়ে যাঁর কাজ রীতিমতো উল্লেখ্য, তাঁর বাংলা অনুবাদে সেই শিকারকাহিনি মেলে।

এখন বিষয়টা হলো, বাঙালি কি এই শিকার-সংস্কৃতিতে কোনও অংশে পিছিয়ে ছিল? না। বাঙালির শিকারজীবন দীর্ঘ, সেই উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের শেষার্ধে শিকার নিষিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত তার যাত্রাপথ। সাহিত্যে এর নিদর্শন ভুরি ভুরি, তবে বাস্তবেও বাঙালি শিকারির সংখ্যা নেহাত কম ছিল না। কোচবিহারের মহারাজ নৃপেন্দ্রনারায়ণ থেকে প্রবোধকুমার সান্যাল, হীরালাল দাশগুপ্ত, কুমুদনাথ চৌধুরী-সহ আরও বহু নাম বলা যায়। তালিকা ছোট নয় মোটেই। আর এঁরা কমবেশি সকলেই নিজেদের শিকারের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট সাহিত্যিক সুষমায় লিখে গেছেন। বাঙালির শিকারকাহিনির সমৃদ্ধ সাহিত্যধারা তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে।

বাংলা সাহিত্যে শিকারের উল্লেখ এবং প্রসঙ্গের কথা বলতে গেলে শেষ হওয়ার নয়। সত্যজিৎ রায়ের কাহিনির শিকারিরা এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। কারণ শিকার নিষিদ্ধ হওয়ার পর সত্যজিতের চরিত্রদের শিকার-স্মৃতি রোমন্থন অনেকটা রেমন্ড উইলিয়ামস কথিত 'রেসিডুয়াল'-এর মতো। কারণ শিকার নিষিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা শ্রেণির বিলোপ ঘটেছিল। ডা. মুনশী শিকারকাহিনি লেখেন যখন, ততদিনে শিকার করা পুরোপুরি বন্ধ। 'সেপ্টোপাসের খিদে'-র পরিমল বহুদিন আগে শিকার ছেড়েছে, সে বন্দুক তুলে নেয় মাংসাশী বিপজ্জনক গাছকে মারবে বলে। সত্যজিৎ অবশ্যই প্রায়শ্চিত্তর দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন। যেমন, 'মি. শাসমলের শেষ রাত্রি' বা 'খগম'-এ প্রাণীহত্যার শাস্তি হাতেনাতে মেলে। 'দার্জিলিং জমজমাট'-এও বিরূপাক্ষ মজুমদার বাঘ মারতে গিয়ে ভুল করে মানুষ মেরে ফেলার অপরাধবোধে ভোগেন, শাস্তিও পান। 'রয়েল বেঙ্গল রহস্য'-র মহীতোষবাবু তো শিকারি-বংশের মান রাখতে বন্ধুর শিকার রীতিমতো প্ল্যাজিয়ারাইজ করেন। আবার শরদিন্দুর ব্যোমকেশের 'চোরাবালি'-তে ব্যোমকেশ-অজিত বেশ আনন্দ-সহকারে শিকার করতে যায়। আর বুদ্ধদেব গুহর ঋজুদা তো শিকারের ওপরেই তার ফ্র‍্যাঞ্চাইজি দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, বুদ্ধদেববাবু নিজেও ছিলেন মার্কামারা শিকারি। আর মজার বিষয়, তাঁর সৃষ্ট শিকারি চরিত্র চোরাশিকারিদের বিরুদ্ধে লড়ত। মানে, আমার খেলার মাঠে তুমি খেলবে কেন ভাই! শিকারটা খেলাই তো বটে! তাই বাঘের বদলে বনমোরগ মেরে ফিরলে বেজার হতো বাঙালির মুখ, সেই খেলাকে একেবারে বেআব্রু করে ছেড়েছিলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, তাঁর 'টোপ'-এ‌। শিকারির শ্রেণি কী, তা তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, যখন গরিব শিশু টোপ হয় বাঘশিকারের খেলা দেখানোর জন্য কেবল।

আরও পড়ুন: কেন বারবার ব্যোমকেশই জিতে যায়? ফেলুদা-কিরীটির থেকে কোথায় এগিয়ে সে!

উনিশ শতকে বাঙালির পৌরুষ এবং বৌদ্ধিক অহং, দুটোতেই কষে ঘা দিয়েছিল উপনিবেশ। সেই বিপন্ন পৌরুষ কখনও রামকৃষ্ণর পায়ে শরণ নিয়েছে, যেমনটা সুমিত সরকার দেখিয়েছেন, আবার কখনও বন্দুক কাঁধে রওনা দিয়েছে জঙ্গলে, সাহেবের দেখাদেখি। যখন পৌরুষ বাড়ানোর, পেশি বানানোর বিজ্ঞাপন সেসময়কার সাময়িকপত্র‍র পাতায় পাতায়, তখন এই প্রতিক্রিয়া তো অবশ্যম্ভাবী ছিলই। কিন্তু ওই একই সময় তো প্রমদারঞ্জন রায়রা শিকার করতে নয়, জরিপ করতে গিয়ে ঘুরেছেন অধুনা মায়ানমার, সেসময়ের 'শান স্টেট' এবং ভারতের জঙ্গলে জঙ্গলে, জানোয়ারের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়া মানে আত্মরক্ষা বটে, কিন্তু ঘাপটি মেরে শিকারই কেবল নয়, তা তাঁর লেখার ছত্রে ছত্রে ধ‍রা। নেহাত জঙ্গলের নেশায় আফ্রিকা চলে গেছেন শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষ, যেমনটা গিয়েছিল শঙ্কর। এখন বাঙালির মানসপ্রদেশে কারা প্রভাব ফেললেন? এঁরা, না কি দোর্দণ্ডপ্রতাপ শিকারিরা?

বাঙালি শিকারিদের নাম ক'জন মনে রাখেন? কিন্তু বাঙালি যে 'শিকারি' মনটাকে সযত্নে লালন করেছে, সে নিয়ে সন্দেহ নেই। শিকার নেহাত বড়লোকের শখ হতে পারে, কিন্তু তা আম-মধ্যবিত্তর আকাঙ্ক্ষাকে উসকেছিল তো বটেই‌। তাই 'কীসের ভয় শিকারি মন' বলেই সি‌ংহভাগ বাঙালির জঙ্গলযাত্রা ঘটেছে। এখন প্রশ্ন উঠবে, শিকার মানেই কি বন্দুকবাজি? না, তা নয়। তবে কী? একটু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলি। ডুয়ার্সের গরুমারা অভয়ারণ্যর একটি ওয়াচটাওয়ারে দাঁড়িয়ে। কিছুটা দূরেই একটি গণ্ডার। দিব্য ঠাহর করা যাচ্ছে তাকে। এখন সেই মুহূর্তে ওই ওয়াচটাওয়ারে টাইগার হিলের মিনি ভিড়। তাদের 'কল কল কলকাকলি, খুশির পাখায় উড়ে চলি' পুরোমাত্রায় চলছে। কে বলবে, ওটা গরুমারার গহিন, না কি চৈত্র সেলের বাজার? যাই হোক, আমার পাশে এক পাঞ্জাবি-পাজামা দিয়ে মাঞ্জামারা ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। সাজপোশাক বলছে, ভদ্রলোকের কাছে বিয়েবাড়ি আর জঙ্গল যাওয়া মোটামুটি এক‌। ভদ্রলোক বাইনোকুলারে কুলিয়ে উঠতে না পেরে এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটালেন। একটি মাঝারি পাথরের চাঁই, যা হাতে ধরা যায়, তা কুড়িয়ে নিয়ে গণ্ডারকে টার্গেট করে সোজা থ্রো! গণ্ডারের থেকে বহুদূরে পড়ল, শিকারিদের মতো হাতের টিপ কি আর সকলের থাকে! এরপর ভদ্রলোক যা শুরু করলেন, তা অকল্পনীয়! দু'হাত মুখের কাছে এনে শুরু করলেন হাঁক পাড়া। 'এই শালা গণ্ডার, এদিকে আয়...'

গণ্ডারের কর্ণকুহরে কী ঢুকল, জানি না। সে নিঃসন্দেহে এই বেয়াদপি এড়িয়ে গেল। অবশেষে ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "এর চেয়ে রণথম্ভোর ফার বেটার, শুনুন কী কী দেখেছি!" এরপর একটা লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে বসলেন।

হায় রে বাঙালি, আর হায় রে বাংলার বাঘ! সে যদি জানত, যে তার পর্যটনের নিরিখে দাম কত, এবং অন্য প্রদেশের জঙ্গলে বাবুদের তার দর্শন দেওয়ার জন্য কতরকম কায়দাকানুন আছে, তার ঠাটবাট জলে যেত।

এ যদি শিকারি মন না হয়, তবে শিকারি মন কী?

শেষ করি বাঙালি জঙ্গলযাত্রীদের একাংশ ঠিক কী কী মূলগত বিষয় মানেন না, এবং মানলে ভালো হয়, তার একটা ছোট্ট লিস্টি দিয়ে।

ক) জঙ্গলে চিৎকার তো নয়ই, স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরেও কথা বলা যায় না।

খ) লাল এবং উগ্র রঙের জামা অনেক জীবজন্তুই সহ্য করতে পারে না। যেমন, ইন্ডিয়ান গাউর। এই ধরনের রংয়ের জামা পরে জঙ্গলে ঢুকতে নেই। আর চড়া পারফিউম চাপাতে নেই গায়ে, কারণ গন্ধের বিষয়েও বন্যপ্রাণীরা বেশ সংবেদনশীল‌‌।

গ) জঙ্গল রেস্তোরাঁ নয়, যে আপনার জন্য স্পেশাল ডিশ সাজিয়ে দেবে। কাজেই কোনও জঙ্গলে যে বন্যপ্রাণী বিশেষ আকর্ষণ, আপনি তার দর্শন নাও পেতে পারেন।

ঘ) জঙ্গল দু'ভাগে তৈরি। ফ্লোরা এবং ফনা। ফ্লোরা অর্থাৎ, জঙ্গলের গাছপালা, ফনা হলো জঙ্গলের বাসিন্দাদের চিহ্নক শব্দ। জঙ্গলটাই আসলে দেখার। এমন হতেই পারে, আপনি কেবল ফ্লোরাই দেখলেন, কোনও প্রাণী দেখতে পেলেন না। জঙ্গল তার নিয়মে চলবে। জঙ্গলকে 'সাইটিং'-এর বাইরে গিয়ে আস্বাদন করতে শিখুন।

ঙ) ভাগ্যক্রমে কোনও প্রাণীর মুখোমুখি হলে দয়া করে কুলুপ এঁটে রাখুন মুখে। আপনাকে খেলা বা সার্কাস বা ডেমো দেখানো জন্তুজানোয়ারদের কাজ নয়।

সবশেষে বলি, এক বাঙালি আছেন, অভিষেক রায়। মুম্বইয়ের নামকরা সংগীতকার, 'হাসিল' থেকে 'পান সিং তোমর', নানা ছবিতে সুর দিয়েছেন। সিতাবনী নামে করবেটের পাশে একটি প্রাইভেট অভয়ারণ্য করেছেন তিনি। কোনও কৃত্রিম গাছ না লাগিয়ে বাড়তে দিয়েছেন স্বাভাবিক উদ্ভিদকে। জলাশয় তৈরি করে নিজেই আসতে দিয়েছেন প্রাণীদের। আমাকে একবার বলেছিলেন, একটি বাঘিনী নিজেই হাজির হয়েছিল সিতাবনীতে, এবং প্রসব করেছিল। সেই বাঘিনী তাঁর ওপর যে আস্থা রেখেছিল, তাতেই তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই সম্পর্ক, এই আস্থা ও নির্ভরতার মন আম-বাঙালির হবে কোনওদিন?

More Articles

;