হাতে পেরেকবিদ্ধ 'গীতাঞ্জলি', রবীন্দ্রনাথের 'বিতর্কিত' মূর্তিই প্রতিবাদের চিহ্ন হয়ে উঠল বাংলায়

Rabindranath Tagore Sculpture Dhaka : হাতের বইটি হল ‘গীতাঞ্জলি’। একটি মোটা, ঘাতক পেরেক সেই বইটি ফুঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। সেখানে লেগে আছে লাল রং; রক্ত…

Aritra Som
৩ মিনিট
হাতে পেরেকবিদ্ধ 'গীতাঞ্জলি', রবীন্দ্রনাথের 'বিতর্কিত' মূর্তিই প্রতিবাদের চিহ্ন হয়ে উঠল বাংলায়

হলদেটে সাদা একটি মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ঠিক পাশেই। বাচ্চা থেকে বুড়ো – প্রত্যেকে এক ঝলক দেখলেই চিনে যাবে সেই মূর্তিটি আসলে কার। লম্বা জোব্বা, হাতে বই, দীর্ঘ চুল আর দাড়ি – ঋষিপ্রতিম চেহারাটির সঙ্গে বাংলা তথা গোটা পৃথিবীর আলাপ অনেক যুগ ধরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু সাধারণত তাঁর যে মূর্তি দেখা যায়, তার থেকে খানিক যেন আলাদা। এখানে রবীন্দ্রনাথের মাথাটা সামান্য নিচের দিকে ঝোঁকানো। চেহারায় বিষণ্ণ একটি ভাব ফুটে উঠেছে। মুখে নীল স্কচ টেপ পরানো। আর হাতের বইটি হল ‘গীতাঞ্জলি’। একটি মোটা, ঘাতক পেরেক সেই বইটি ফুঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। সেখানে লেগে আছে লাল রং; রক্ত…

এই একটি মূর্তি ঘিরেই বিতর্ক ঘন হল বাংলায়। পশ্চিমবঙ্গ নয়; ওপার বাংলায়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বুকে এমন একটি মূর্তি দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান অনেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজু ভাস্কর্যের পাশেই এই বিশেষ মূর্তিটি বসানো হয়েছে। পাথরের নয়, বরং ১৯ ফুট লম্বা মূর্তিটি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়েছে বাঁশ, থার্মোকল, কাগজ। জানা গিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্ররা এই বিশেষ মূর্তি তৈরি করেছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ঘনিয়ে আসছে 'কালো অধ্যায়'! ফের আচমকা কেন অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ?

Bangladeshi presidential election: ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, আদালতের রায়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে যথাক্রমে ৫ ও ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এরপরই ওই ভাস্কর্যটির ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। কেবল বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গেও এই বিশেষ মূর্তিটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথের মুখ বন্ধ, গীতাঞ্জলির বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছে রক্তাক্ত পেরেক। সেই গীতাঞ্জলি, যার ইংরেজি অনুবাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এনে দিয়েছিল নোবেল পুরস্কার। সেই গীতাঞ্জলিই আজ রক্তাক্ত! কেন এমন অদ্ভুত আর বিতর্কিত মূর্তি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা।

শিল্প মানে কেবল মনোরঞ্জন নয়। শিল্প হল প্রতিবাদের একটা রাস্তা, একটা ভাষা। যুগে যুগে, কালে কালে বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে এমন মনোভাবের কথাই বলে গিয়েছেন অনেকে। ঋত্বিক ঘটকের মতো করেই তাঁরা বলেছেন, “আমি সস্তার আনন্দ দিতে আসিনি।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে রবীন্দ্রনাথের এই মূর্তিটিও আসলে প্রতিবাদের ভাষা। প্রতিবাদের একটা কাঠামো। যারা এই মূর্তি তৈরি করেছেন, সেই চারুকলা অনুষদের ছাত্রদের বক্তব্য, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবাদেই এই মূর্তি তৈরি করা হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ক্রিকেটার কবিগুরু! যে রবীন্দ্রনাথকে আজও চেনেই না বাঙালি

Rabindranath Tagore: রবীন্দ্রনাথ কিঞ্চিৎ ক্রিকেট খেলেছিলেন বটে, তবে তিনি ঠিক কোন সময়ে ক্রিকেট খেলেছিলেন, তা নিয়ে পরিষ্কারভাবে কিছু বলা নেই কোথাও।

কী ঘটনা? এই মুহূর্তে বাংলাদেশে চলছে একুশে গ্রন্থমেলা। সেখানে এবছর আদর্শ প্রকাশনীর স্টল নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। বেশ কয়েকটি বইও নাকি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকদেরও হঠাৎ করে গ্রেফতার করা হচ্ছে। পরিচালক মোস্তফা ফারুকীর একটি সিনেমাকেও ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। যে কোনও সভ্য, গণতান্ত্রিক দেশে বাকস্বাধীনতার গুরুত্ব রয়েছে। মানুষ নিজের মতটি প্রকাশ করতেই পারেন। কিন্তু সেজন্য গ্রেফতার, বই নিষিদ্ধ করার মতো ঘটনা কেন ঘটবে?

এর জন্যই প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথের এই মূর্তিটি তৈরি করা হয়েছে। তবে এই একটি গণ্ডির মধ্যে মূর্তিটি হয়তো আর সীমাবদ্ধ নেই। কেবলমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও এটি আর নেই। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত সহ গোটা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এভাবে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। ভারতের ছবিটাই দেখুন! শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই জেলের ঘানি টানতে হচ্ছে প্রতিবাদীদের। তিনি পশ্চিমবঙ্গের অম্বিকেশ মহাপাত্রই হন, অথবা জেএনইউ-র উমর খালিদ – ট্র্যাডিশন অব্যাহত। কেন্দ্র হোক বা রাজ্য, শাসক কিংবা ক্ষমতামাত্রেই চায় বিরুদ্ধমতকে দমিয়ে রাখতে। আর এই ঝড়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠছে স্বাধীন চিন্তা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই স্বাধীন চিন্তারই প্রতীক। মুখ টেপ দিয়ে বন্ধ রাখা মানে, মতপ্রকাশকে জোর করে দমিয়ে রাখা। গীতাঞ্জলি মানে জ্ঞান, বইয়ের আলো, যুক্তি, স্বাধীন মতামত। তাকেই পেরেক দিয়ে বিঁধে রক্তাক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। এখানেই সর্বজনীন জায়গা নিয়ে নিল এই ভাস্কর্যটি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, বারবার রবীন্দ্রনাথ কেন? এপার বাংলায় রোদ্দূর রায়ের ঘটনা এখনও পুরনো হয়ে যায়নি। ওপার বাংলায়ও এই মূর্তি ঘিরে বিতর্কের ঝড়। রবীন্দ্রনাথই তো বঙ্গভঙ্গের সময় খালি পায়ে রাস্তায় নেমে গিয়েছিলেন। হিন্দু-মুসলিমকে এক করে রাখীবন্ধন করেছিলেন। স্বাধীন চিন্তাকে গুরুত্ব দিতেন। বাংলা ভাষায় তিনিই তো অন্যতম মনীষী। তাই ভাষা দিবসের আগে এমন প্রতিবাদের ‘ভাষা’ও দেখল আপামর বঙ্গদেশ।

অবশ্য এখানেও থামেনি ঘটনাটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে রবীন্দ্রমূর্তিটি বসার বেশকিছু সময় পর সেই মূর্তিটি হঠাৎ করেই সরিয়ে নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই ব্যাপারে কিছু বলছে না। কিন্তু এটা বারবার বলা হচ্ছে, এমন মূর্তি ‘অত্যন্ত অশোভনীয়’। সেই ফাঁকা জায়গায় অবশ্য ছাত্ররা একটি ব্যানার টাঙিয়ে দিয়েছেন। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘গুম হয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ!’ এটাও এক ধরনের প্রতিবাদ। রবীন্দ্রনাথ কি মূর্তি হয়েই গুম হয়ে গিয়েছেন, নাকি সার্বিকভাবেই হারিয়ে গিয়েছেন? সেই কথাটাই যেন প্রকারান্তরে বলতে চাইলেন পড়ুয়ারা। এ কেবল বাংলাদেশের প্রতিবাদ নয়; বর্তমান সভ্যতা ও শাসকদের দিকে তাকিয়ে মানুষের প্রতিবাদ।

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?