তিরিশ বছর ধরে পুরুষ সেজে কাটালেন এই মহিলা! কারণ জানলে মাথা হেঁট হয়ে যায় লজ্জায়

ওই অঞ্চলে পুরুষদের 'আনাচি' নামে সম্বোধন করা হয়। মুঠু জানান, যেখানেই কাজ করেছেন, সহকর্মীরা তাঁকে আনাচি বলেই ডেকেছে

Sindhu Som
৪ মিনিট
তিরিশ বছর ধরে পুরুষ সেজে কাটালেন এই মহিলা! কারণ জানলে মাথা হেঁট হয়ে যায় লজ্জায়

তিনটে দশক খুব কম সময় নয়। একজন মানুষের গড় আয়ুর প্রায় এক অর্ধেক সময়কাল। আর জীবনের তিরিশটি বছর যদি ছদ্মবেশে কাটাতে হয়? শুনেই দমবন্ধ লাগে না? অথচ এমনই এক মহিলার নাম সম্প্রতি খবরে উঠে এসেছে। আমরা জানি, আমাদের সমাজ চরম পিতৃতান্ত্রিক। মেয়েদের বিন্দুমাত্র শ্বাস ফেলার অবকাশ দিয়ে সে নিজেকে মহান মনে করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটুকুও জোটে না মেয়েদের কপালে। তারই নজির এই ঘটনা। ৫৭ বছর বয়সি এই মহিলা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের দাদাগিরিতে সন্তান মানুষ করার উপায়ান্তর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পুরুষের ছদ্মবেশ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিরিশ বছর কেটে গিয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার, এ-পর্যন্ত তাঁর আশপাশের লোকজন কেউই সে ছদ্মবেশ ধরতে পারেননি। তামিলনাড়ুর এই মহিলার তাতে অবশ্য সুবিধাই হয়েছিল। সত্যিটা সামনে আসার পরে নেটমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন তিনি। এমন ঘটনা বাস্তবেও ঘটে, বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না অনেকেই। এ যেন রূপকথাকেও হার মানাবে।

এস পিচিয়াম্মলের বয়স যখন মাত্র ২০, তাঁর স্বামী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বিয়ের তখন মাত্র দুই পক্ষকাল গিয়েছে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছিল কাট্টুনয়াকানপট্টি গ্রামে। সেখানে সমাজ অত্যন্ত অবদমনকারী। সেই অত্যাচার সহ্য করে একা টিকে থাকা মুখের কথা ছিল না। তার মধ্যেই একটি বাচ্চা মেয়ের জন্ম দেন তিনি। কন্যাসন্তানের জননী হিসেবে তাঁকে আরও দূরে সরিয়ে দেয় সমাজ। ইতিমধ্যে অভাবের সংসার চালানোর জন্য কাজও শুরু করতে হয়। সেই কাজ করা নিয়েও সমাজে নানা কথা শুরু হয়। ঘরের বউ কাজ করবে- এ আবার কী অলুক্ষুণে কথা! তার থেকে না খেতে পেয়ে মা-মেয়ের মরে যাওয়াটা অনেক পবিত্র, এমনটাই মনে করেছিল তাঁর পরিপার্শ্বের মানুষ। তাতে মেয়েদের 'ইজ্জত' বজায় থাকে! কাট্টুনয়াকানপট্টির 'সমাজ' এইসব যুক্তি দাঁড় করিয়ে ধীরে ধীরে গলা টিপে ধরছিল পিচিয়াম্মলের। একের পর এক ঝামেলা সহ্য করতে হচ্ছিল। গাঁয়ের লোকে তাঁর ওপর চড়াও হচ্ছিল যখনতখন। একটা সময়ের পর সীমা ছাড়িয়ে যায় অত্যাচার। সেই জ্বালা থেকে বাঁচতে একরকম বাধ্য হয়েই পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই বিদেশিনীর হাতের ছোঁয়ায় ভোল বদলাচ্ছে ভারতীয় স্কুল, রইল অসাধ্যসাধনের গল্প

সরকারের পক্ষ থেকেও মারিয়ার কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সরকারও মারিয়ার সংস্থার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন অঙ্গনওয়াড়ি স্কুলের পরিকাঠামো উন্নতির লক্ষ্যে।

জীবনে কম স্ট্রাগল তাঁকে করতে হয়নি। কনস্ট্রাকশন সাইটে কাজ করেছেন, কাজ করেছেন হোটেলে এবং চায়ের দোকানেও। এই কাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাচ্চা মানুষ করা যে কী শক্ত, তা ভদ্রসমাজের অনেকেই ধারণা করতে পারবেন না। তার ওপর রয়েছে কাজের জায়গায় নিগ্রহ, টোনটিটকিরি, পুরুষদের নানা রকম সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা। সমস্তই সহ্য করতে হতো তাঁকে। এই সমস্ত জ্বালাযন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচতেই পুরুষ সাজার অভিনব পথটি বেছে নেন মহিলা। একদিন সোজা তিরুচেন্দর মুরুগানের মন্দিরে গিয়ে সমস্ত চুল কাটিয়ে ফেললেন। পরলেন জামা ও ধুতি। পেচিয়াম্মল হলেন মুঠু। কাট্টুনয়াকানপট্টি থেকে চলে এলেন কাট্টুনয়াক্কানপট্টিতে। "এখানে এসেছি, তাও প্রায় বছর কুড়ি হতে চলল। আমার খুব কাছের কয়েকজন আত্মীয় আর মেয়ে ছাড়া কেউই জানত না যে, আমি মহিলা।" 'দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান। পুরুষের ছদ্মবেশেই জীবনের তিরিশটি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন মুঠু। ওই অঞ্চলে পুরুষদের 'আনাচি' নামে সম্বোধন করা হয়। মুঠু জানান, যেখানেই কাজ করেছেন, সহকর্মীরা তাঁকে আনাচি বলেই ডেকেছে।

"সব রকমের কাজই করেছি। রং মিস্ত্রির কাজ করেছি, চা বেচেছি, পরোটা বানানোর কাজ করেছি, একশো দিনের কাজও করেছি। মেয়েকে একটা সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। কাজেই সমস্ত জমিয়ে রাখতাম। ধীরে ধীরে পাড়ায়, কাজের জায়গায় সর্বত্র 'মুঠু' হিসেবেই লোকে আমায় চিনতে লাগল। এমনকী, আমার কাগজপত্রেও, মানে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, এমনকী, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও 'মুঠু' লেখা রয়েছে", জানালেন মহিলা। পেচিয়াম্মলের মেয়ের নাম শানমুগসুন্দরি। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে এখন। সেই হিসেবে দায়িত্ব শেষ পেচিয়াম্মলের। কিন্তু না। ৫৭ বছর বয়সে এসে আবার নতুন করে পরিচয় পাল্টাতে রাজি নন মহিলা। কেনই বা পাল্টাবেন? এই পরিচয় তাঁকে নিরাপত্তা দিয়েছে, মেয়ের জীবন সুনিশ্চিত করেছে। এই কারণে পেচিয়াম্মল 'মুঠু'-ই থেকে যেতে চান আজীবন। নিজের বলতে তাঁর বাড়িঘরদোর কিচ্ছু নেই। পুরুষের বেশে পরিচয়পত্র থাকায় বিধবা সার্টিফিকেটের জন্যও আবেদন করতে পারবেন না কোনওদিন। তবে একটি এমজিএন আর ইজিএস কার্ড জোগাড় করতে পেরেছেন তিনি। এই কার্ড গ্রামের মানুষদের চাকরি পেতে সাহায্য করে থাকে।

ভাওয়াল সন্ন্যাসীর ফিরে আসা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায় এই 'পরিচিতি' নিয়ে আলোচনায় ব্যয় করেছিলেন একটি সম্পূর্ণ চ্যাপ্টার। সেখানে মূল বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্রের এই চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া কতখানি সফল? শুধুমাত্র রাষ্ট্র যেভাবে আইনি স্বীকৃতি দেয় মানুষের, মানুষ কি শুধুমাত্র সেটুকুই? না কি মানুষের পরিচিতি একটি সচেতন যৌথ নির্মাণ? যাতে সে এবং তার আশেপাশের মানুষজন সক্রিয় ভূমিকা পালন করে? মানুষে দেখে চিনতে পারছে একজনকে, তাকে আমি গ্রহণ করব না, শুধুমাত্র রাষ্ট্র তাঁকে চিনতে পারছে না বলে? যতই 'বৈজ্ঞানিক' বলে চালাতে চাক রাষ্ট্র, তার শনাক্তকরণ পদ্ধতির ধাপগুলির মধ্যে তো হাজার হাজার ফাঁক। সেই ফাঁকের প্রত্যেকটিকে ম্যানিপুলেট করা যেতে পারে। রাষ্ট্রের ব্যর্থতারই অন্যতম নজির পেচিয়াম্মল। রাষ্ট্র তাঁকে তাঁর প্রাপ্য নিরাপত্তা দিতে পারেনি, মানুষকে পিতৃতন্ত্র কাটিয়ে ওঠার শিক্ষা দিতে পারেনি, সুনিশ্চিত রোজগার দিতে ব্যর্থ হয়েছে, বাধ্য হয়ে যখন সেই পিতৃতন্ত্রকে ঢাল করে মেয়েকে বড় করে তুলেছেন একা একজন মা, তাঁর পুরুষ পরিচয়কে রাষ্ট্র এমনভাবে বিশ্বাস করেছে যে, 'বিধবা ভাতা' পাওয়ার পথটিও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ক্রমাগত একটি পরিচিতি বহন করতে করতে আজ তাতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন পেচিয়াম্মল। পিতৃতন্ত্রকে কলা দেখিয়ে, রাষ্ট্রের চোখরাঙানিকে কলা দেখিয়ে নিজের পরিচিতি সচেতনভাবে তিনি যেভাবে নির্মাণ করলেন, এও এক ক্ষমতাহীনের প্রতিরোধ হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পাবে কালের খাতায়। বিশেষত সাধারণের ইতিহাস যখন প্রতিরোধের রক্তেই লেখা হয় এই দুনিয়ায়!

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।