বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মন্দির এটিই! অবাক করবে এর ইতিহাস

মন্দিরটি ২.২৫ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এবং প্রস্থ ২ মিটার। মন্দিরের দেওয়ালগুলি মাত্র ১.৩ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট।

Arunima Mukherjee
৩ মিনিট
বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মন্দির এটিই! অবাক করবে এর ইতিহাস

এই পৃথিবীর বুকে যখন কোনও ধর্ম মানুষকে শোষণ করেছে, ধর্মের জাঁতাকলে মানুষের শ্বাসরোধ হয়েছে তখন‌ই মানুষ বিকল্প কোনও আশ্রয় খুঁজেছে, এভাবেই যুগে যুগে ধর্মপ্রচারকরা মানুষের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেমন বলা যায়, ভারতের নিম্নবর্গীয় মানুষদের উপর যখন উচ্চবর্গীয় হিন্দু স্বৈরাচারীদের অত‍্যাচার নেমে এসেছিল তাঁরা ইসলাম ধর্মকে বিকল্প পথ হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। তেমনভাবেই ইসলাম ধর্মের বহু আগে খ্রিস্টপূর্বাব্দ পঞ্চম শতাব্দীতে গৌতম বুদ্ধের হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল বৌদ্ধধর্ম। হিংসা বিরোধী, অনাড়ম্বর জীবনযাপন সেদিনকার মানুষকে বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। পৃথিবীতে যুগে যুগে যে নতুন ধর্মের‌ই কেবল আবির্ভাব ঘটেছে, তা নয় । ধর্মের হাত ধরেই সৃষ্টি হয়েছে বিবিধ শিল্প, সংস্কৃতি এবং স্থাপত‍্য। যা আজ‌ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর গল্প বলে চলেছে সেইসব যুগের। সাম্প্রতিককালে এমন‌ই এক স্থাপত‍্যের নিদর্শন মিলেছে চিনে। তবে তা রাজ-রাজাদের নির্মিত বিশাল কোনও স্থাপত‍্যের থেকে একেবারেই আলাদা। চিনের প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই স্থাপত‍্যকে পৃথিবীর বুকে অবস্থিত ক্ষুদ্রতম মন্দির হিসাবে দাবি করেছেন।

চিনের উত্তর-পশ্চিমের জিনজিয়াংয়ের (Xinjiang) উইগুর নামক স্বশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত তাকলামাকান (Taklamakan) মরুভূমির দক্ষিণ তীরবর্তী অঞ্চলে এই বৌদ্ধ মন্দিরটি আবিষ্কৃত হয়। এই মন্দিরটি আসলে মহাযান লিপির কারুকার্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। এই তাকলামাকান মধ‍্য এশিয়ার সর্ববৃহৎ মরুভূমি এবং সমগ্ৰ পৃথিবীর বৃহৎ মরুভূমিগুলোর মধ‍্যে অন‍্যতম । অনুমান করা হয়েছে, এই বৌদ্ধ মন্দিরটি ১৫০০ বছরের পুরনো এক স্থাপত‍্য ।

প্রায় ২০০০ বছ‍র আগে হান রাজবংশের রাজত্বকালে বৌদ্ধধর্ম ভারত থেকে চিনে পৌঁছেছিল। চিন থেকে অসংখ‍্য ব‍্যবসায়ী তখন ভারতে আসতেন বাণিজ‍্যের কাজে । মূলত সেখান থেকেই এই বণিক গোষ্ঠীর মাধ‍্যমেই বৌদ্ধধর্ম পাড়ি দেয় চিনে। তৎকালীন সময়ে চিনের রাজারাই সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রক ছিলেন। রাজার ধর্ম‌ই ছিল প্রজাদের ধর্ম। হান রাজবংশের রাজারা ছিলেন কনফুসিয়াস ধর্মের অনুসারী। একদিকে কনফুসিয়াস ধর্ম যেখানে নীতিশাস্ত্র, সমাজের সামঞ্জস‍্য এবং সামাজিক শৃঙ্খলার কথা বলতো সেখানে বৌদ্ধধর্ম বলতো জ্ঞান, উদারতা এবং বাস্তবের বাইরে গিয়ে অন‍্য এক জগতের খোঁজের কথা। তাই এই দুই ধর্ম ছিল পরস্পরবিরোধী। তবুও ধীরে ধীরে চিনে বৌদ্ধধর্ম বিস্তার লাভ করছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জীবনকে বাজি রেখে চিনের বৌদ্ধধর্মের প্রচার! বুদ্ধের আলোকে তবু ছায়াতেই বোধিধর্ম

Buddhism: বোধিধর্মনের মৃত্যু কবে হয়েছিল সে বিষয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, তিনি তাঁর চার শিষ্যকে ডেকে নিজের শেষ জ্ঞানটুকু দান করে চলে যান।

২২০ সালে হান সাম্রাজ‍্যের পতন ঘটলে সমগ্ৰ চিন জুড়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় । পরবর্তীতে ৪৪৬ সালে ওয়েই শাসক সম্রাট তাইওয় রাজ‍্য শাসনে আসার পরে বৌদ্ধধর্মর উপর দমনপীড়ন শুরু করেন। প্রচুর বৌদ্ধমন্দির, গ্ৰন্থ, স্থাপত‍্য, শিল্প ধ্বংস করেন তিনি। এমনকী, বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের মৃত‍্যুদণ্ড আরোপ করা হয়। অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষুক পালিয়ে বাঁচেন। ৪৫২ সালে সম্রাট তাইওয়ুর উত্তরাধিকারী সম্রাট জিয়াওউন শাসনকালে বৌদ্ধ ধর্মের উপর দমন-পীড়ন নীতির অবসান ঘটে। তিনি বৌদ্ধধর্ম প্রচারের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং অনেক স্থাপত‍্য নতুন করে নির্মাণ করেন। সম্ভবত, আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হ‌ওয়ার কারণেই এই মন্দিরটি ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

সেলে কাউন্টির ( Cele County) দামাগৌ শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ক্ষুদ্রতম মন্দিরটি নাম তুয়োপুলুকেদুন (Tuopulukedun Temple)। মন্দিরটি ২.২৫ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এবং প্রস্থ ২ মিটার। মন্দিরের দেওয়ালগুলি মাত্র ১.৩ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট। মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে মূলত কাঠ আর মাটির মিশ্রণে। স্থাপত‍্যটির চারদিকের দেওয়ালে ফ্রেসকো (একধরনের বিশেষ কলাকৌশলে আঁকা দেওয়াল চিত্র) পদ্ধতিতে মহাযানী লিপির কারুকার্য রয়েছে । মন্দিরের ঠিক মধ‍্যভাগে অবস্থান করছে একটি ০.৬৫ মিটার উচ্চতার বৌদ্ধ মূর্তি। মন্দিরটির উত্তরভাগের মধ‍্যভাগে আরও কিছু বৌদ্ধ মূর্তি রয়েছে। তুয়োপুলুকেদুন মন্দিরটি এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত মন্দিরগুলির মধ‍্যে ক্ষুদ্রতম মন্দির হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই বৌদ্ধ মন্দিরটি সেই যুগের স্থাপত‍্যের এবং মানুষের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। মন্দিরটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে একজন পূজারির কোনও জায়গার অভাব না ঘটে। স্বল্পস্থানের মধ্যে নির্মিত এই মন্দিরটিকে তাই শ্রেষ্ঠ সংরক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চাইনিজ আকাডেমি অব সোশ‍্যাল সায়েন্সের প্রত্নতাত্ত্বিক য়ু জিনহুয়া (Wu Xinhua) বলেছেন, এই বৌদ্ধ মন্দিরটি একমাত্র অক্ষত মন্দির যার ফ্রেসকোগুলি সুন্দরভাবে সংরক্ষিত হয়ে আছে। এই মন্দিরটির আবিষ্কার খানিক আকস্মিকভাবেই ঘটেছে। কিছু বাচ্চা ওই অঞ্চলে জ্বালানির কাঠ সংগ্ৰহে গেলে, তারা ঢিবির মতো এক জায়গা দেখতে পায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল, এই জায়গাটাতে তারা এমন এক দেওয়াল দেখতে পায় যা জায়গাটিকে দুটো ঘরের মতো করে বিভক্ত করেছিল। প্রথমে প্রত্নতাত্ত্বিকরা মন্দিরটি উদ্ধার করেন এবং তারপরে মন্দিরের গায়ে কারুকার্য দেখে বুঝতে পারেন মন্দিরটি আসলে এক বৌদ্ধ স্থাপত‍্য। তাঁরা আশঙ্কা করেছেন, সম্ভবত হোটান (Hotan) অঞ্চলে মন্দিরটি একসময় স্থাপিত ছিল। যদিও, পরবর্তীকালে তাঁরা মন্দিরের ভিতরে খোঁজ চালালে কোনও মজবুত প্রমাণ মেলেনি। এই মন্দিরটির যে স্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে তার থেকে ৫০মিটার দূরে আরও দুটি বৌদ্ধ মন্দির আবিষ্কার করা গিয়েছে। মনে করা হয় যে, এই তিনটি মন্দির‌ই ১৫০০ বছর আগে নির্মিত।

শি ইয়ান ( Shi Yan) কিরা জেলার রেলিক কালচার ইন্সিটিউটের ডিরেক্টর বলেছেন, এই মন্দিরটি কোনও এক অভিজাত পরিবারের স্থাপত‍্য ছিল। এই মন্দির থেকে আমরা সেকালের বৌদ্ধ সংস্কৃতি সম্পর্কেও জানতে পারি।

তথ‍্য সূত্র :

  • https://timesofindia.indiatimes.com/world/rest-of-world/worlds-smallest-temple-discovered-in-china/articleshow/1282270.cms

  • https://ie.wolfgangpetersen.net/1864-worlds-smallest-temple-discovered-in-china.html

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?