সুফি সাধকদের রাতের ওষুধ! কীভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে জন্মাল বিশ্ববিখ্যাত কফি 'মোকা'?

History of Mocha Coffee: ১৪৫০ সালে, ইয়েমেনের ইসলামিক সুফিরা গভীর রাতের প্রার্থনার সময় জেগে থাকার জন্য প্রথম মোকা কফি খেতে শুরু করেছিলেন।

Madhurima Dutta
৪ মিনিট
সুফি সাধকদের রাতের ওষুধ! কীভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে জন্মাল বিশ্ববিখ্যাত কফি 'মোকা'?

এমনিতে বাঙালি চা-খোর। তবে মাঝেসাঝে কফির কাপেও তুফান ওঠে। তুফান বলতেই মনে আসে, এখন সবচেয়ে বেশি চর্চা তো মোকা তুফান নিয়ে। অনেকে মোচা ডেকে তৃপ্তি পাচ্ছেন ঠিকই, তবে তথ্য ও ইতিহাস বলছে বাংলার কলার মোচার সঙ্গে আসন্ন ঘূর্ণিঝড় মোকার কোনও সম্পর্কই নেই, সে যতই ইংরেজি ফোনেটিক্স তাকে 'মোচা' বলে ডাকিয়ে বিভ্রান্ত করুক না কেন। কফিপ্রেমীরা জানেন, মোকা আসলে এক বিখ্যাত কফি। এবার ঘূর্ণিঝড়ের নাম দিয়েছে ইয়েমেন। আরব সাগরের প্রান্তে অবস্থিত এই ইয়েমেনের বন্দর শহরের নাম 'মোখা' বা ‘মুখা’, যদিও উচ্চারণ অনুযায়ী সে 'মোকা। ১৯ শতক পর্যন্ত মোখাই ছিল ইয়েমেনের রাজধানী সানার প্রধান বন্দর। এই মোখা শহরেই চাষ হয় বিখ্যাত কফি ‘মোকা’র। কফিটির নামও দেওয়া হয়েছে বন্দর শহরটির নামেই। কেন এত জনপ্রিয় হলো এই কফি? ইতিহাস খুঁড়তে গেলে দেখা যাবে, সুফি সাধকদের রাতজাগানিয়া ওষুধ ছিল এই মোকা!

মোকা আসলে মিষ্টি চকলেটের মতো এক কফি। চকলেট সিরাপ বা কফির সঙ্গে পাউডারের মিশ্রণ এই কফির ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। মোকা কফির আসল স্বাদ পেতে পয়সাও খসবে বেশ! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিছুকাল আগেও ইয়েমেনি কফির দাম ছিল প্রতি পাউন্ড ১৭৩ ডলার! যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের উপকূলীয় শহর মোখাতে লুকিয়ে রয়েছে এই বিশ্ববিখ্যাত কফির শিকড়।

ইয়েমেন কফির ইতিহাস

২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইয়েমেনের একচেটিয়া বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল মোখা। ইথিওপিয়ান যাযাবর পর্বতবাসীরাই প্রথম নাকি এই মোকা কফির উদ্দীপক প্রভাব টের পান। তারপর সেই মধ্যযুগ থেকে ইয়েমেনে মোকা কফির ব্যবহার শুরু। ওয়ার্ল্ড কফি রিসার্চের তথ্য বলছে, ইয়েমেনের জাবিদ শহরে মোকা কফি খাওয়ার প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে।

১৫ শতকে স্থানীয় চাহিদা মেটাতে ইয়েমেনে কফি চাষ শুরু হয়। ১৪৫০ সালে, ইয়েমেনের ইসলামিক সুফিরা গভীর রাতের প্রার্থনার সময় জেগে থাকার জন্য প্রথম মোকা কফি খেতে শুরু করেছিলেন। বলা হয়, ১৫ শতকে এই সুফি সন্ন্যাসীরাই নাকি ইয়েমেনে কফি আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁরা ইয়েমেন কফির বীজগুলিকে শুকিয়ে কালো করে সেগুলি পিষে এমন একটি পানীয় তৈরি করতেন যা তাদের রাতভর জাগিয়ে রাখত, রাত জেগে পড়াশোনা করতেন তাঁরা। এই প্রথা দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে যায় এবং ইস্তাম্বুল, কায়রো, দামেস্ক, মক্কায় ছড়িয়ে পড়ে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সেলিব্রিটিদের পছন্দ, মল থেকে তৈরি এই কফির নেপথ্য ইতিহাস জানলে শিউরে উঠবেন

প্রাণীর মল থেকে কফি! তা-ও আবার এত দাম? কী ভাবে তৈরি করা হয় এই কফি?

ধীরে ধীরে ইয়েমেনের পাহাড়ের ধাপে ধাপে কফি চাষ শুরু হয় ঢালাওভাবে। ইয়েমেনের মোখা বন্দর থেকেই টন টন জীবাণুমুক্ত কফি বিনস বিদেশে পাঠানো হতো। ১৬৫০ সালে প্রথম ইউরোপে কফি শপ খোলার সঙ্গে সঙ্গে মোকা কফির জনপ্রিয়তা হু হু করে বেড়ে যায়।

কীভাবে তৈরি হয় ইয়েমেনি মোকা কফি?

কফি গাছ থেকে চেরি বাছাই করার পরে, এগুলি রোদে শুকনোর জন্য রেখে দেওয়া হয়। একবার নরম রসালো সেই চেরি রোদ, হাওয়ার স্পর্শে শক্ত হয়ে গেলেই সেটি সঙ্কুচিত হয়ে গাঢ় বাদামী থেকে কালো হয়ে যায়। ফলটি ছাড়িয়ে নিয়ে ভেতরের বীজ বের করে নেওয়া হয়। অনেকেই বলেন, শুকনোর এই প্রক্রিয়াই কফিকে মিষ্টি এবং তীব্র করে তোলে। মোকা কফির স্বাদ বেশ জটিল, বেশ সোঁদা এবং স্বতন্ত্র।

ইয়েমেনে বিভিন্ন ধরনের কফি মেলে। এখানে কফির এমন বৈচিত্র রয়েছে যা বিশ্বের অন্য কোথাও নেই এবং সেই কারণেই ইয়েমেনি কফির স্বাদ বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর হয়। ওয়ার্ল্ড কফি রিসার্চ বলে, অ্যারাবিকা কফি বিনের উৎপত্তি ইথিওপিয়া থেকে, এই বোর্বন জেনেটিক কফি বিন মোখা শহরে পাওয়া কফি গাছ থেকে উদ্ভূত। বোর্বন কফি বিনস গাঢ়, মাখনের মতো চকোলেটের স্বাদে ভরপুর। এই কফির ফল মিষ্টি এবং খুব হালকা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মোচা নয়, আসন্ন ঘূর্ণিঝড়ের আসল নামের আড়ালে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত এক কফি!

Cyclone Mocha: ঘূর্ণিঝড়ের নামের নেপথ্যে রয়েছে এক কফি! যে সে কফি নয়, বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এক কফি এটি।

ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় পার্বত্য অঞ্চলে চারটি প্রধান কফি উৎপাদক অঞ্চল রয়েছে- হিরাজি, মাত্তারি, সানানি এবং ইসমালি। এই অঞ্চলে তিনটি জনপ্রিয় ইয়েমেন কফি বিনস জন্মায়- মোকা খুলানি ন্যাচারাল, মোকা হাজ্জাহ ন্যাচারাল, এবং রেড সি ব্লেন্ড - ইথিওপিয়ান এবং ইয়েমেনি কফি বিনের এক জটিল মিশ্রণ৷

জনপ্রিয়তার পথে মোকা

মোখা থেকে ধীরে ধীরে মোকা হলো কীভাবে? কফি বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ২০ শতকের শুরুতে একটি ভাষাগত পরিবর্তন হয়েছিল। কফি এবং চকলেট মেশানোর প্রথম নথিভুক্ত উল্লেখ মেলে ১৮৯২ সালে। মোকা কফি ব্যবহার করে 'মোকা কেক' তৈরির একটি রেসিপিতে প্রথম এর উল্লেখ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় উল্লেখ মেলে ১৯২০ সালে। ওয়াশিংটন পোস্ট 'চিল্ড মোকা'-র একটি রেসিপি প্রকাশ করে যাতে দুধ, কফি, কোকো, চিনি এবং ভ্যানিলা মেশানো ছিল।

১৯০০-এর দশক পর্যন্ত, চা এবং কফি ট্রেড জার্নালের মতো পুরনো কফি প্রকাশনাগুলি ইয়েমেন থেকে আসা মোকা কফির নামোল্লেখ করেছে এবং এই একই সময়ে, কফি ও চকলেটের রেসিপিগুলি একসঙ্গে মিশ্রিত হতেও শুরু করে। তবে, ইয়েমেনি কফি উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে এই কফির নিজস্ব উৎপাদন শুরু হওয়ায় কফি বাণিজ্যের উপর ইয়েমেনের একচেটিয়া আধিপত্য শেষ হয়ে যায়।

১৭ শতক নাগাদ ইয়েমেনি বন্দর শহর আল মোখা আন্তর্জাতিক কফি বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। সেই মোখা থেকেই কফির নামও হয়ে যায় মোকা। পরবর্তী শতাব্দী জুড়ে, ইয়েমেনই মোকা কফির একমাত্র সরবরাহকারী দেশ ছিল। কিন্তু ১৭২৬ সালে, জাভার ডাচ উপনিবেশ ইয়েমেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করে, তাদের নিজস্ব সরবরাহ বৃদ্ধি করে এবং কফি বাজারে ইয়েমেনের একচেটিয়া আধিপত্যকে টলিয়ে দেয়। পরবর্তী কয়েক বছরে ইয়েমেনের বাজারের দাপট খানিক কমলেও দেশটি বরাবরের মতোই কফি উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। কফির তৃতীয় ঢেউ যখন এল, ইয়েমেন তখন গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। কফি বিনের চাষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই সময়।

আসলে ইয়েমেনি কফি উৎপাদনের মূল চ্যালেঞ্জই দেশের নাগরিক অস্থিরতা। যুদ্ধ দেশটির কফি উৎপাদনকে মারাত্মক প্রভাবিত করেছে। গৃহযুদ্ধের পাশাপাশি, রোগ, বিশেষ করে, কলেরা, ইয়েমেনের কফি উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।