বাংলার বুকোস্কির নগ্ন আত্মজীবনী: 'জগতে কলঙ্ক রবে'

Surojit Sen
৩ মিনিট
বাংলার বুকোস্কির নগ্ন আত্মজীবনী: 'জগতে কলঙ্ক রবে'

অফিসার ও প্রফেসর-সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্যের হ্যালোজেন-ঝলমলে ঝিনচ্যাক বাজারের শেষে যে প্রায়ান্ধকার চোরাগলিটি আছে, তারই শেষ প্রান্তে নিঃসঙ্গ জেন সন্তর মতো বসে আছে সোমক দাস। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তার মাথার পিছনে একটি হেলো বা আলোকবৃত্তও আছে, বা হয়তো নেই, আমারই চোখের ভুল। সে চোরাগলিতে একবার ঢুকলে কোথায় গিয়ে পড়তে হবে, তা এক মারাত্মক উত্তেজনা; খুব কম পাঠকই এই ঝুঁকি নেবেন, আর হ্যালোজেন-ঝলমলে ঝিনচ্যাক বাজারের লেখকরা, বলা বাহুল্য, এই ঝুঁকি নেবেন না।

সোমক দাস কবি, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক, যাকে আমি মনে করি বাংলার চার্লস বুকোস্কি। নাম যখন ফেলা হল, তখন বুকোস্কি কে এবং কী, তা নিয়ে দু'কথা বলা উচিত। অনেকেই জানেন, তবু সাবধানের মার নেই।

চার্লস বুকোস্কি (১৯২০–১৯৯৪) জার্মান-আমেরিকান লেখক, যিনি কবি, গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক। 'লস এঞ্জেলস টাইমস' তাঁর সম্পর্কে লিখেছিল: বুকোস্কি আমেরিকার রাস্তার কবি, অমার্জিত, অশিক্ষিত মাতাল। নোংরা কথা লেখা আর নোংরা কথা বলাকেই নিজের কাজ বলে মনে করে। একই সঙ্গে বুকোস্কি আমেরিকায় আদৃত ও নিন্দিত হয়েছেন। জীবনে বহু নারীর সঙ্গে সম্পর্ক, বিভিন্ন ধরনের নেশা, জুয়া খেলা, অনৈতিক কাজকর্ম ও খিস্তিখেউড় করাই ছিল তাঁর জীবনযাপন, আর সেটাই তাঁর লেখার বিষয়। তাঁর লেখা ছিল বিতর্কিত, তাঁকে ‘যৌনতাবাদী’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ‘নোটস অফ এ ডার্টি ওল্ড ম্যান’ নামে একটি কলাম লিখতেন লস এঞ্জেলসের এক আন্ডারগ্রাউন্ড কাগজে, নাম: ওপেন সিটি। এসব দেখে এফবিআই তাঁর নামে আলাদা ফাইল খোলে। তাঁর নেশা সম্পর্কে, লেখকের নিজের কথায় বলতে গেলে, "রোজ নিজেকে মেরে ফেলা এবং প্রতিদিন নতুন করে জন্মগ্রহণ করা– এই ম্যাজিক একমাত্র নেশাতেই সম্ভব।" এই হল সংক্ষেপে বুকোস্কির পরিচয়।

১৯৮৬ সালের মাঝামাঝি সোমক দাসের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার দিনই সে আমার হাতে সদ্য-প্রকাশিত তার একটি মিনিবুক ধরিয়ে দেয়, নাম ‘ঘনশ্যামবাজার’। সেই গদ্যের বইটির প্রথম প্যারাগ্রাফটি পড়া যাক:

কলকাতায় যাবার আগে, পাগলাগারদে যেতে হল। খুপরি ঘরওলা সেই নার্সিং হোম অবশ্য কলকাতাতেই। সেখানে ইলেকট্রিক শক দেবার সময় সীমা বাড়িয়ে দিয়ে, মানুষ খুনের ব্যবস্থা ছিল। দুঃখের বিষয়– কেউ খুন করেনি আমাকে। জানলার কাঁচে ঘুষি চালিয়ে বাঁ হাতের ব্রেকিয়াল আর্টারি কেটে ফেলার পরও আমাকে বাঁচানো হয়েছে।

এই হল লেখকের পরিচয়। ওই মিনিবুকের ২২ পৃষ্ঠায় লেখা,

"বেশি নেশা হয়ে গেলে কলেজ স্কোয়ারের সুইমিং পুলের উপরের চাতালে উঠে শুয়ে পড়তাম। অত উঁচুতে, পুলিশ ওঠে না। রাতবিরেতে রাস্তায় শুয়ে থাকার নিয়ম হল, সঙ্গে কম্বল বা ন্যাকড়াজাতীয় কিছু থাকা চাই। নইলে পুলিশে ধরবে। অর্থাৎ, বৈধ ফুটপাথবাসী ছাড়া অন্য কেউ হঠাৎ ফুটপাতে রাত কাটাতে চাইলে আইনে ও সামাজিকতায় আটকায়। কলকাতা অভিমান করে।"

এহেন সোমক দাসের আত্মজীবনী ‘জগতে কলঙ্ক রবে’ প্রকাশিত হয়েছে গত বছর অক্টোবরে, যা এবছর ফেব্রুয়ারিতে আমি হাতে পেলাম। আত্মজীবনীতে লেখা যে, প্রচণ্ড অর্থাভাবে তাঁদের সপরিবারে সোনাগাছি পাড়ায় মাসে ৬০ টাকা ভাড়ায় একটি বাড়িতে উঠে যেতে হয়। সেসময় সোমক ও তাঁর বাবা একই সঙ্গে হরলালকার দোকানে কাজ করত। লিখছে, "সোনাগাছিতে দিন ভালোই কাটত। একদিন হরলালকার দোকানে ডিউটি সেরে বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরছি। একটা দালাল পিছু ধরল, ভালো মাল আছে বাবু, কলেজ গার্ল, নেপালি। বাবা আস্তে করে বলল, আমরা এখানেই থাকি। আমাকে বলল, এদের সঙ্গে এভাবেই কথা বলবি।" পরের লাইনেই সে লিখছে, "যাদের দিকে কোনদিন তাকাব না ভেবেছিলাম, তারাই বন্ধু হয় গেল।"

এরকম আরও মণিমাণিক্য বইটিতে ছড়িয়ে আছে।

শুধু এই আত্মজীবনী নয়, সোমক এ-যাবৎ যা লিখেছে, সবই তার জীবনে ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনাবলীর কথা। কল্পলোকের গল্পগাছা নয়। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তার গল্পগ্রন্থ ‘অক্ষরের জন্মসূত্র’, সেখানেও এই আত্মজীবনীর অনেক ঘটনার কথা আছে, থাকাটাই স্বাভাবিক, লেখক হল কসাই, তার দোকানে সে নিজেকেই ঝুলিয়ে রেখেছে এবং খানিকটা করে কেটে পাঠককে দিচ্ছে। অন্য খাসি আর পাবে কোথায়? প্রথম গল্পটি, যেখানে লেখক নির্দ্বিধায় বান্ধবীর যোনিকেশ নির্মূলের বর্ণনা দিয়েছে, তারপরই কানিলিঙ্গাসের যে তুমুল কার্নিভাল শুরু হয়, বাংলা সাহিত্যে তা আর কোথাও আছে বলে জানা নেই। ওই বইতেই ‘প্রতিশোধ সম্পর্কে ধারণা’ গল্পটিতেই যে এই আত্মজীবনী শুরু হয়েছিল, আজ তা আমার কাছে স্পষ্ট হয়। এরও আগে ১৯৮৬ সালে ‘সোমক দাসের গল্প’ নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়, তাতেও যে গল্পগুলো আছে, সেগুলো তার আত্মজীবনী নামক মহানিম গাছটিরই ডালপালা। সারা জীবন একটি সংকট থেকে আরেকটি সংকট, একটি প্রেম থেকে আরেকটি প্রেম, বিভিন্ন বেশ্যার ঘর, থানা ও রিহ্যাব ঘুরে সোমক যে প্রায়ান্ধকার চোরাগলিটির প্রান্তে নিঃসঙ্গ জেন সন্তর মতো বসে আছে, সেখানে তার ছায়া তাকে জড়িয়ে ধরে বলে,

‘তুমি কি সুন্দর নও? বেঁচে আছো কেন পৃথিবীতে?’

সব শেষে বলার, সোমক দাসকে পাঁচ বছর ঘনিষ্ঠভাবে যা জেনেছি, সে তুলনায় তার আত্মজীবনী পড়ে মনে হয়েছে, সে যা লিখেছে তা হিমশৈলের চূড়ামাত্র! ভবিষ্যতে হয়তো সে শৈল আরও প্রকট হবে, কেননা সোমকের অবস্থানটি রামপ্রসাদের গানেরই অন্তরার বাক্যটির মতো–

‘সাগরে যার বিছানা মা/ শিশিরে তার কী করিবে।'

লিখেছেন
Surojit Sen
Surojit Sen
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।