আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন! পথ দেখাচ্ছেন ভারতের প্রথম রূপান্তরকামী ড্রোন পাইলট

উড়তে জানলে অর্ধেক আকাশ বরাবর কম নির্বাচন। ঠিকঠাক কলম পেলে এক পৃথিবী লেখাও বাড়ন্ত। অথচ অল্পে খুশি থাকতে চাওয়ার অভ্যাস কাগজের পাখি সেজে কাটিয়ে দেয় দিন। এবার সেই কাগজের পাখি পোশাক পালটে যদি বলে, উড়ব? তার জন্য মুখ থুবড়ে পড়ার মেঝে প্রস্তুত। তার জন্য নিজস্ব আকাশ নির্বাচনের সব সুযোগ কেড়ে নেওয়ার অস্ত্র প্রস্তুত। তার জন্য গতানুগতিক খাঁচা চিরকালই প্রস্তুত। পাখির জায়গায় ‘প্রান্তিক’ যে কোনও নাম বসালেও গল্পটা একই থাকে। নতুন পরিচয় নিয়ে প্রকাশ্যে আসতে চাইলে গতানুগতিকের সঙ্গে যে ধাক্কা লাগে, তাতে আখেরে জগদ্দল তো নড়ে না, পাখিই মরে। তবে কিছু পাখি ওড়েও, মাটিতে পা রেখেই। যেমন উড়েছেন, উড়িয়েছেন মায়াশ্রী। ভারতের প্রথম রূপান্তরকামী ড্রোন পাইলট, বছর চব্বিশের মায়াশ্রী সম্প্রতি দিল্লিতে ভারত ড্রোন মহোৎসবের অন্যতম প্যানেলিস্টও ছিলেন। আন্না ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর অ্যারোস্পেস রিসার্চে (CASR) রিমোট পাইলট ট্রেনিং অর্গানাইজেশন (RPTO) ড্রোন পাইলট হিসেবে যে চারজন রূপান্তরকামীকে প্রশিক্ষিত এবং কাজে নিযুক্ত করেছে, তাঁদের মধ্যে মায়াশ্রী একজন।

শুরুটা আর পাঁচজন ‘অন্যরকম’-দের যেমন হয়, মায়াশ্রীরও একই। নিজের লিঙ্গপরিচয়ের কারণে কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও চাকরি পাননি। নিজের রূপান্তরকামী সত্তা প্রকাশ্যে সাহস করে আনার পরে মায়াশ্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে পরিবারও। ২০১৮ সালে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন মায়াশ্রী। ইন্ডিয়ান অয়েলের CSR-কর্মসূচির অংশ হিসেবে একটি এনজিও প্রথম মায়াশ্রী এবং অন্য তিনজন রূপান্তরকামীকে বিশেষভাবে নজর করে। তারপর RPTO-তে ড্রোন পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয় এই চারজনকে। বর্তমানে, মায়াশ্রী নিজে RPTO-তে একজন প্রশিক্ষক, অন্যান্য ড্রোন পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেন তিনি।

ভারত ড্রোন মহোৎসবে প্যানেলিস্ট হিসেবে একজন রূপান্তরকামী মহিলার আত্মপ্রকাশ পরিচিত খাঁচার বাইরে নিঃসন্দেহে এক নতুন পথের গল্প বলে। বরাবরই যে কোনও শ্রমের ক্ষেত্রে রূপান্তরকামীদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অযৌক্তিক বিচার। ড্রোন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এই আখ্যান মায়াশ্রীরও স্বপ্নের বাইরে ছিল। ছয় মাস আগেও চেন্নাইয়ের রাস্তায় ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়েছেন মায়াশ্রী, স্রেফ তাঁর লিঙ্গপরিচয়ের কারণে। পেটে খাবার জোগাতে অদ্ভুত সব কাজ করতে হয়েছে, শুধুমাত্র তিনি ‘অন্যরকম’ বলে। 'দিল্লিতে ড্রোন শিল্পের সুপরিচিত সব মানুষদের সঙ্গে একই মঞ্চে নিজের বক্তব্য পেশ করা আমার কাছে গর্বের! পুরুষ এবং মহিলাদের মতো আমরাও প্রতিভাবান এবং আমরাও পাইলট বা সিইও হতে পারি। আমাদের প্রতিভা দিয়ে আমাদেরকে বিচার করুন, আমাদের লিঙ্গ পরিচয় দিয়ে নয়', বলেন তিরুচির বাসিন্দা মায়াশ্রী।

আরও পড়ুন: তিরিশ বছর ধরে পুরুষ সেজে কাটালেন এই মহিলা! কারণ জানলে মাথা হেঁট হয়ে যায় লজ্জায়

নিজের যাত্রাপথের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে মায়াশ্রী জানিয়েছেন, 'অন্যান্য রূপান্তরকামীদের মতো নরক গুলজার হয়েছে আমারও। সাধারণত আমার সম্প্রদায়ের মানুষ যা যা অদ্ভুত কাজ করতে বাধ্য হয়, সেসব করেই দিন কাটিয়েছি৷ ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে আমি আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ে ড্রোন পাইলট হিসাবে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করি। বাকি পথটা একেবারে অন্য। এখন আমি পুলিশ অফিসার, কৃষি আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ দিই৷ এই কাজ আমাকে কেবল আর্থিকভাবেই স্বনির্ভর করেনি, আমাকে মানুষের মর্যাদা দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে।'

শুধু মায়াশ্রীই নন, RPTO ড্রোন পাইলট হিসেবে অন্তত ১৪ জন ট্রান্সপার্সনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আন্না ইউনিভার্সিটির অধীনে Daksha ফার্ম বেশ কয়েকজন প্রতিভাশালী রূপান্তরকামী মানুষকে চিহ্নিত করে। Daksha মূলত নজরদারি, কৃষি এবং প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে ড্রোন পরিচালনা করে। CASR-এর পরিচালক কে সেন্থিল কুমারের কথায়, মায়াশ্রীর অংশগ্রহণ এই প্রতিষ্ঠানের জন্য ভীষণ গর্বের মুহূর্ত।

রূপান্তরকামী মায়াশ্রী নিজেও সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ভারত ড্রোন মহোৎসবে নিজের অংশগ্রহণকে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের জন্য একটি বিশাল স্বীকৃতি এবং গর্বের মুহূর্ত হিসেবে মনে করেন। তামিলনাড়ুর কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট মায়াশ্রী ভারতের প্রথম ট্রান্সমহিলা ড্রোন পাইলট হিসেবে ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে আসলে শ্রম ও মর্যাদার নতুন পথের আগলটি খুলে দিয়েছেন তাঁর সম্প্রদায়ের জন্য। মায়াশ্রী বর্তমানে শুধুই বিভিন্ন ধরনের মাল্টি-রোটর ড্রোন (ম্যাপিং, নজরদারি, অ্যাগ্রো-স্প্রেয়িং, বীজ ছড়ানো ইত্যাদির জন্য ব্যবহৃত) ওড়ান না, তিনি নিজে অন্যদের প্রশিক্ষণও দেন। তাঁর পড়ুয়াদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশ কর্মীরা, কৃষি শিল্পের সদস্যরা এবং আরও বিভিন্ন স্তরের মানুষ।

'দিল্লিতে ন্যাশনাল ড্রোন ফেস্টিভ্যাল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। ডক্টরেট, সিইও এবং গবেষকদের সঙ্গে একই প্যানেলে থাকতে পেরে আমি আবেগাপ্লুত! যখন আমার বাবা-মা প্রথম জানতে পেরেছিলেন যে আমি আন্না ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে কাজ করছি, প্রথম আমাকে ফোন করেন তাঁরা। আমার সঙ্গে কথা বলেন, আমাকে নিয়ে তাঁরা যে কত গর্বিত আমাকে বলেন। আসলে, এটা আমার জন্য শুধু চাকরি নয়, নতুন জীবন,' জানান মায়াশ্রী।

ড্রোনের প্রতি এই বিশেষ প্রেমের কারণ? মায়াশ্রী জানিয়েছেন, 'ছোটবেলা থেকে আকাশে প্লেন দেখলেই আমরা সবাই আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখতাম। আমি প্রায়ই ভাবতাম, আমি যদি পাখি হতাম! আজ আমি রূপান্তরকামী হিসেবে গর্বিত; মর্যাদাপূর্ণ পরিচয়-সহ আন্না বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কাজ করছি, আমাদের মতো আরও বেশি মানুষ যাতে এখানে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে সেই চেষ্টা করছি।' স্নাতক হওয়ার পর সদ্য সদ্য চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলেই মায়াশ্রী জানতেন, তাঁকে নিয়োগ না করার জন্য সমস্ত সম্ভাব্য অজুহাতই সংস্থার হাতে আগাম গোছানো রয়েছে। 'যখনই আমরা কোনও জায়গায় কাজ করতে যাই, আমরা যে আলাদা তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কেউ আমাদের করুণা করে, কেউ সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু আমাদের তো সেটার দরকার নেই। আমরা চাই সমাজের পরিবর্তন; আমাদের আরও ভাল শিক্ষার সুযোগ আসুক,' বলেন মায়াশ্রী।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ২০১৮ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রায় ৯২ শতাংশ রূপান্তরকামী মানুষ দেশের যে-কোনও ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত। এমনকী, যোগ্য ব্যক্তিদেরও চাকরি দেওয়া হয়নি। প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ রূপান্তরকামী মানুষ কখনও স্কুলে যাননি এবং বৈষম্যের সম্মুখীন হয়েছেন।

সরকার এবং কর্পোরেট সংস্থারা অবশ্য এখন ব্যাপকভাবেই রূপান্তরকামী বা সামাজিকভাবে ‘প্রান্তিক’ ধরে নেওয়া সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে। কর্নাটক সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদের জন্য ট্রান্সজেন্ডার প্রার্থীদের নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে, টাটা স্টিল ঘোষণা করেছে যে, পশ্চিম বোকারো বিভাগে ভারী আর্থ মুভিং মেশিনারি অপারেটরদের কাজের জন্য শুধুমাত্র ট্রান্সজেন্ডারদেরই নিয়োগ করা হবে। অর্থাৎ শ্রমের পথ খুলছে, খুলছে যোগ্যতা অনুযায়ী মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের বিবিধ দরজা। আকাশ বড় হচ্ছে। ভাবনা ও যুক্তি নিজস্ব প্রসারে আকাশ ছুঁতে পারছে কি না, লিঙ্গপরিচয়ের পাঁক থেকে বেরিয়ে শ্রমের সুযোগ ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারছে কী না, মূল প্রশ্ন এখানেই। হয়তো মূল উত্তরও এখানেই।

More Articles

;