আজও ক্লাসে খুঁজি উদয়ন পণ্ডিতকে

Teachers' Day 2023: কিন্তু আজকে আমি যখন ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের সামনে দাঁড়াই খুঁজে বার করার চেষ্টা করি - কেউ নিজেকে হেরে যাওয়া একজন মানুষ ভাবছে না তো। আমি তখন শুধু স্মরণ করি আমার 'উদয়ন পন্ডিত'কে।

Sayan Bhattacharjee
৩ মিনিট
আজও ক্লাসে খুঁজি উদয়ন পণ্ডিতকে

২০০৪ সাল, আমি তখন সপ্তম শ্রেণিতে নতুন ভাবে ভর্তি হই গড়িয়া বরদা প্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে। 'নতুন ভাবে' কারণ দক্ষিণ কলকাতার একটি নামি ইংরেজি মাধ্যম 'স্কুল' মনে করেছিল আমার মতো সাধারণ ছাত্রের "বাংলা মিডিয়াম বা কর্পোরেশন স্কুলেই শুধুমাত্র পড়া উচিত"। ভাগ্যিস মনে করেছিল, না হলে আমি জানতেই পারতাম না আমার দ্রোণাচার্য এই স্কুলের স্টাফরুমেই বসেন। আমার মাস্টারমশাই উদয়ন বৈদ্য। কোনও অন্ধকারাচ্ছন্ন জগতে হারিয়ে যেতেই পারতাম, বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকিত্বে তলিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল, অসামাজিক সঙ্গে মেলা মেশা করে ফেলতাম হয়তো, এমন অসংখ্য অন্ধকার চক্রব্যূহ ভেদ করে যিনি হাত ধরে টেনে আনলেন আলো পৃথিবীর বুকে তিনিই উদয়ন স্যার। ক্লাসের 'লাস্ট বয়' থেকে একবছরে 'ফার্স্ট বয়', যে ফার্স্ট বয়দের কদর থাকে এই সমাজের মানুষের মধ্যে।

প্রথম আলো :

নতুন স্কুলে প্রথম দিনই টিফিন পিরিয়ডের পরের ক্লাস ছিল ভূগোল। একজন দেখলাম দরজার বাইরেটা দেখে চিৎকারে করে ক্লাস বলছে ,"এই উদয়ন স্যার আসছে"। আমি দিনলিপি বইয়ে স্যারের নামটা দেখলাম। স্যার এলেন, ক্লাস নিশ্চুপ। একজন সাধারণ পোশাক পরিচ্ছদ গায়ে, ছোট্টখাট্ট চেহারা, কিন্তু তীক্ষ্ণ অথচ মায়াবী চোখ আর তেমনই সুন্দর করে কথা বলার ধরন। প্রথম ক্লাসে ঢুকেই আমাকে দাঁড় করালেন, তারপর যে কথাগুলো বললেন আমার জীবনের এক মুহুর্তে মনে হলো একটা আলোর ঝর্ণায় ধুয়ে গেল শরীর-মন সবটা। শিক্ষক এত সুন্দর হতে পারেন!

- "শোন সায়ন, পচা আলুর সঙ্গে মিশে কিন্তু পচে যাস না। এই সবাই শোন, শুধু ওকেই বলছি নাকি কথাগুলো - শোন, এক বস্তা ভালো আলুর মধ্যে যদি একটা খারাপ আলু থাকে, গোটা বস্তাটাই নষ্ট হয়ে যায়।"

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এক অনতিক্রম্য বনস্পতির ছায়া...

Teachers' Day 2023: একটি খদ্দরের পাঞ্জাবি, সাদা ধুতি, কালো ফ্রেমের চশমা আর পরিপাটি ক'রে আঁচড়ানো কেশদাম। স্যার পড়াতে এলেই দুরন্ত ছাত্ররাও শান্ত হয়ে যেত। শাস্তি তো দূরস্থান, স্যারকে কখনও বকতেও দেখিনি।

তারপর আমাকে হেসে বললেন -

- " তুই কিন্তু অত্যন্ত ভালো ছাত্র, আমি আগের ক্লাসে সব স্যারের থেকে শুনেছি, তুই কেমন ভাবে ক্লাস করেছিস - আমি কিন্তু তোর উপর নজর রাখছি।"

আমি 'ভালো ছাত্র' - এই কথাটা জীবনে যিনি প্রথম আমাকে বলেছিলেন তিনি উদয়ন স্যার। পিছিয়ে পড়া মানুষের মধ্যেও যে সামান্য কিছু থাকতে পারে একথা সবসময় স্যার শিখিয়েছেন। অনুপ্রেরণা জিনিসটাই তো আজ আস্তে আস্তে বিরল হয়ে যাচ্ছে আমাদের পৃথিবী থেকে - সেখানে আমাদের মতো অতি সাধারণ ছাত্রদের অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছেন স্যার আজও। কোনও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিভাজন না রেখে।

ফার্স্ট বয় কাকে বলে:

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সেই শিক্ষকদের কথা মনে পড়লেই ভিতরে টের পাই আস্ত টাইম-মেশিন

Teachers' Day 2023: শত হাতের লেখা প্র‍্যাক্টিসেও দীর্ঘকাল যে হাতের লেখার উন্নতি হয়নি, পঞ্চম শ্রেণিতে বিশ্বনাথবাবুর হাতের লেখা অনুকরণ করে সেই হাতের লেখাই উতরে গিয়েছিল।

ভূগোলের ক্লাসে একদিন স্যার সমুদ্র নিয়ে বিভিন্ন জিনিস বোঝাচ্ছেন, এমন সময় একটা গল্প শুরু করলেন স্যার। অনেকবছর আগে পৃথিবীর ভূ-বিজ্ঞানীরা নাকি মহাসাগরের অতলে এক ভয়ানক প্রাণীর সন্ধান পান, আর সেই প্রাণীর খোঁজে গিয়ে অতলে হারিয়ে যেতে থাকে বড় বড় সব জাহাজ, নৌবহর। গল্প বলার সেই ধরন যেন বিশ্ব ভ্রমণের সমান। তো, আমরাও সবাই উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলাম- কি সেই প্রাণী! এইবারই মোক্ষম চাল - "বলতে পারি, তবে ফার্স্ট হতে হবে। যে ফার্স্ট হবি তাকে দেবো এই বই।" কেন জানিনা আমি উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, স্যার আমি ফার্স্ট হবো। আমাকে এই রহস্যটা জানতেই হবে। স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন - "ফার্স্ট হবি কারণ তোকে এই উত্তরটা পেতে হবে তার জন্য। কিন্তু সায়ন, ফার্স্ট হওয়া আর ফার্স্ট বয় হওয়ার মধ্যে পার্থক্য প্রচুর। আমি বই ভালোবেসে পড়ার জন্য এই রহস্যের জালটা ছড়িয়েছিলাম।"

তারপর ফলাফল প্রকাশিত হয়, স্যার সেই রহস্যময় বইটি উপহার দেন - জুল ভার্ন -এর 'টুয়েন্টি থাইস্যান্ড লিগস আন্ডার দি সি'।

আরও একটু উঁচু ক্লাসে উঠতে স্যার বলেছিলেন - ভালো ছাত্র হতে হবে, সে সব সময় ফার্স্ট বয় নাও হতে পারে। সেদিন শিখতে পারি যে মানুষ সমাজের জন্য কাজ করে, কিছু সৃষ্টি রেখে যায় মানবতার জন্য তাকে ফার্স্ট বয় বলে। প্রতিযোগিতায় তাই আজও নামিনি আমি।

ক্যাপটেন নিমো:

স্যার শিখিয়ে দিয়েছিলেন একটা বইয়ের চরিত্র নিজের চলার পথে সাথী হতে পারে। সে পথ দেখাবে পৃথিবীর অজানা বিষয়কে জানার জন্য। আমি একটু বেশি স্যার, ম্যাডামদের উপর নির্ভরশীল ছিলাম বলে, শিখিয়েছিলেন নিজের লক্ষ্যকে স্থির রেখে, নতুন কিছু করার নেশায় যেন ক্যাপটেন নিমোর মতো এগিয়ে যেতে পারি। আর দিনে একবার করে সেই অমোঘ সাবধান বাণী - পচা আলুর সঙ্গে মিশে যেন পচা আলু না হয়ে যাই।

জীবনে আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সামান্য বইপত্র পড়ার জন্য কেউ কেউ ভালোবাসে হয়তো, মাথা উঁচু করে সোজা মেরুদণ্ড নিয়ে চলতেই পারতাম না যদি না স্যারের সঙ্গে দেখা হতো। যে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভালোবাসা পাই আমি, তার জন্য প্রাথমিক ভাবে তৈরি করে দিয়েছিলেন উদয়ন স্যার। আমি তো নিজেকে একপ্রকার বুঝিয়েই ফেলেছিলাম পড়াশুনা আমার মতো বাজে ছাত্রর দ্বারা হবে না। কিন্তু আজকে আমি যখন ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের সামনে দাঁড়াই খুঁজে বার করার চেষ্টা করি - কেউ নিজেকে হেরে যাওয়া একজন মানুষ ভাবছে না তো। আমি তখন শুধু স্মরণ করি আমার 'উদয়ন পন্ডিত'কে, যিনি আমাকে দিয়ে বলিয়ে নেন - "তুই কিন্তু অত্যন্ত ভালো ছাত্র/ছাত্রী - তুইই পারবি"।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।