অভিমন্যু হয়ে নতুন দিনের সূর্য ছিনিয়ে আনবে পড়ুয়ারাই

Bangladesh Quota Protest: রক্তস্নানে হাজারো আবু সাঈদ-তাঈম জেগেছে আজ বাংলার ঘরে ঘরে। আমি তো পড়ুয়াদের আহত বাঘের মতো দেখি। এতদিন ঘাতকেরা ছাত্রদের ঘৃণা দেখেছে, এবার দেখবে ক্রোধ।

inscript
৩ মিনিট
অভিমন্যু হয়ে নতুন দিনের সূর্য ছিনিয়ে আনবে পড়ুয়ারাই

কোটা আন্দোলন ইস্যুতে উত্তাল গোটা বাংলাদেশ। রাস্তায় কত পড়ুয়া যে প্রাণ হারিয়েছেন তার হিসেব নেই। যদিও গণমাধ্যমগুলো খণ্ডিতভাবে জানাচ্ছে, এই সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। হাসপাতালগুলোতে ঢল নেমেছে আহতদের, বাড়ছে মৃত্যু। আজও গুলিবিদ্ধ দু'জনের মৃত্য হয়েছে হাসপাতালে। পুরো জাতিকে অন্ধকারে রেখে সরকার যে নৃসংশতা চালিয়েছে, তাতে এই সংখ্যাটা বিশ্বাস করা বেশ কঠিন।

পড়ুয়াদের আন্দোলনে বারুদ ঢেলেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাংবাদিক সম্মেলনে এক সাংবাদিকের উস্কানিতে তিনি আন্দোলনকারীদের 'রাজাকারের নাতি-পুতি' বলে উল্লেখ করেন। এই কটাক্ষ মানতে পারেননি বিক্ষুব্ধ পড়ুয়ারা। ওই রাতেই নামেন রাস্তায়, অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে দেশের সকল ক্যাম্পাস। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের নামে দেশজুড়ে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি নির্বিচারে গুলি চালায় ছাত্রদের উপর। সশস্ত্র ছাত্রলীগ-যুবলীগ, আওয়ামী লীগও নামে হত্যার মিশনে।

গত ১৬ জুলাই রংপুরেরে রাস্তায় বুক চিতিয়ে দাঁড়ান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। নিমেষেই প্রশস্ত বুক ভেদ করে যায় পুলিশের বুলেট! দূর প্রবাসে বসে সেই ভিডিয়োটি বার বার দেখেছি, আর ভেবেছি— হত্যাকারী পুলিশ সদস্য ইউনুস আলির কি পরিবার-পরিজন নেই? নিজেকে প্রশ্ন করেছি, রাতে বাসায় ফিরে ইউনুস আলি কি ঘুমোতে পেরেছিলেন আদৌ?

ওই রাতে ইউনুস আলির ঘুম এসেছিল কি না জানি না, কিন্তু ঘুমোতে পারেননি পুলিশের উর্দি পরা ময়নাল হোসেন। কারণ তিনি হাসপাতালের মর্গে আবিস্কার করেছিলেন তাঁর কলেজপড়ুয়া ছেলে ইমাম হাসান তাঈমের নিথর দেহ। গত ২১ জুলাই পুলিশের ছোড়া ছররাগুলি আবু সাঈদের মতই তাঈমেরও বুক বিদীর্ণ করে দিয়েছে। গুলি তো আর স্বজন চেনে না!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সব যোগাযোগ বন্ধ! বাংলাদেশে আটকে ভারতের পড়ুয়া ফিরতে পারবেন তো?

Indian Students stuck in Bangladesh: এখনও পর্যন্ত ৫৭২ জন ভারতীয় ছাত্র, ১৩৩ নেপালি ও চার ভুটানি পড়ুয়াকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

ছেলের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে বড়কর্তাকে ময়নাল জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে, স্যার?' হয়তো একই প্রশ্ন ছিলো শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেনেরও। যদিও ইউনুস আলি কিংবা ময়নাল হোসেনদেরই সে প্রশ্নের উত্তর জানা। পিতৃত্বে ময়নাল হোসেনের সঙ্গে আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেনের কোনও ব্যবধান নেই । দু'জনেরই অশ্রুর রং এক, একই আহাজারি। দু'জনের বুকের গভীরে আজ একই শূন্যতা। ব্যবধান কেবলই ওই পুলিশের উর্দিটা। গত এক সপ্তায় ঘটে যাওয়া এমন হাজারো ঘটনার বর্ণনা দেওয়া যায় এক নিঃশ্বাসে। চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, কী ঘটেছে সেখানে। এতো আহাজারি, এতো মৃত্যুশোক বইবে কী করে এ জমিন?

ঘাতকের বুলেটের সামনে আজও জাগ্রত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শহীদ ড. সামসুজ্জোহা। তিনি যে মশালটা আবু সাঈদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তা শত-সহস্র হাতে উঠেছে। সেই মশাল হাতে পথে নেমেছিলেন কলেজপড়ুয়া তাঈমও। পুলিশ বাবা আগেই জানতেন, শিক্ষার্থীদের দমনে তারা কতটা খড়গহস্ত। তাই তো ছেলেকে আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু উত্তাল তরঙ্গ কি বাঁধ দিয়ে আটকানো যায়? মুক্তির উন্মাদনায় ঠিকই সব বাধা তুচ্ছ করেছিলেন তাঈম। তাই তো আজ তিনি মুক্তবিহঙ্গ!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে তোলপাড়! কেন রাস্তায় নামল বাংলাদেশের বিক্ষুব্ধ ছাত্রযুব?

Bangladesh: সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারসহ সব কোটা বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবি করে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন পড়ুয়ারা। এরই মধ্যে আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য।

রক্তস্নানে হাজারো আবু সাঈদ-তাঈম জেগেছে আজ বাংলার ঘরে ঘরে। আমি তো পড়ুয়াদের আহত বাঘের মতো দেখি। এতদিন ঘাতকেরা ছাত্রদের ঘৃণা দেখেছে, এবার দেখবে ক্রোধ। গগনবিদারী স্লোগানে নড়ে গেছে স্বৈরাচারের ভিত, এবার পতনের গান। তারা ফিরবেই, ফিরতেই হবে। নতুন বাংলাদেশে তারাই তো দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধা।

রক্তের দাগ কি এত সহজেই মুছে ফেলা যায়? ইন্টারনেট বন্ধ করে, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করে কি গণহত্যা আড়াল করা যায়? অবশ্য আন্দোলন দমনে এই কৌশল আওয়ামী লীগের পুরনো। দেশে গত এক যুগের সাংবাদিকতার সুবাদে দেখেছি দলটির ক্রমে দানব হয়ে ওঠা।

আন্দোলনের মোড় ঘোরাতেও পটু দলটি। আন্দোলনকারীদের ঢালাওভাবে জামায়াত-বিএনপির লেবেল লাগানো হয়েছে। সমন্বয়কারীদের তুলে গিয়ে করা হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। শরীরে চেতনানাশক পুশ করে অচেতন করে রাখা হয়েছে দিনের পর দিন। কোথাও কোথাও বন্দি করে আন্দোলন স্থগিতের কথা ঘোষণা করতে বাধ্য করা হয়েছে।

এত কিছুর পরও দমানো যায়নি শিক্ষার্থীদের। শেষে নিজেরাই শুরু করেছে জ্বালাও-পোড়াও। চট্টগ্রামে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শ্রমিক লীগের সভাপতি দিদারুল আলমের গ্রেফতার সামনে এনেছে অকাট্য প্রমাণ। এই ক'দিনে গ্রেফতার করা হয়েছে পাঁচ সহস্রাধিক। কেবল ঢাকাতেই দায়ের হয়েছে দুই শতাধিক মামলা, চলছে গণগ্রেফতার। পুরো দেশটাই এখন জেলখানা!

গদি টিকিয়ে রাখতে শেখ হাসিনা প্রথমেই বসেছেন তিন বাহিনীর প্রধানের সাথে। এ অভিযোগ অবান্তর নয় যে আওয়ামী লীগের শাসনকালে সব নিয়োগ-পদন্নোতি হয়েছে দলীয় বিবেচনায়। নানান কৌশলে বিরোধীশূন্য করা হয়েছে, কয়েক জন থেকে গেলেও তাঁরা কোণঠাসা। একাধিক অনিয়ম-দুর্নীতির পরেও কতিপয় কর্তা পার পেয়েছেন শুধুমাত্র সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার দৌলতে। তাঁরাই এখন আন্দোলন দমন করার প্রতিদান দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীরাও পাশে দাঁড়িয়েছে স্বৈরাচারের। এরাই তো ব্যাঙ্ক লুটে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। অর্থপাচার করে বিদেশে গড়ে তুলেছেন সাম্রাজ্য। দলীয় গণমাধ্যমকর্মীরাও নেমেছেন একজোট হয়ে। তাঁরাও তো ফুলে ফেঁপে উঠেছেন গত এক যুগে।

এই লুটেরা জোটের বিরুদ্ধে ছাত্র-পড়ুয়াদের অসম লড়াই চলছে, চলবে। পথে পথে নৃশংস হত্যার ছবি দেখেও কি এখনও দ্বিধাবিভক্ত থাকবেন? জেগে উঠুন, বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ান। তারুণ্য আজ জেগেছে। আপনি-আমি পাশে দাঁড়ালেই অভিমন্যু হয়ে দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে নতুন দিনের সূর্য ছিনিয়ে আনবে এ তারুণ্য।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।