সৌরজগতের মধ্যেই রয়েছে আরও একটা পৃথিবী! চমকে গেলেন বিজ্ঞানীরাও

Madhurima Pattanayak
৩ মিনিট
সৌরজগতের মধ্যেই রয়েছে আরও একটা পৃথিবী! চমকে গেলেন বিজ্ঞানীরাও

চেনা ভূখণ্ডের মতোই এখানে রয়েছে ছোট ছোট পাহাড়, বয়ে চলেছে কল্লোলিনী নদী। পাশে কোথাও আছে টইটম্বুর দিঘি। কখনও বা আকাশভাঙা বৃষ্টি এসে ভরিয়ে তুলছে সমুদ্র। যেন সত্যি-ই পৃথিবীর অজানা কোনও স্থান এটি।

শুধু দিঘিতে জলের বদলে রয়েছে অন্য রাসায়নিক পদার্থ। জমিটি তৈরি হয়েছে বরফ দিয়ে, যার উপরিতলে তরল মিথেনের বাষ্প বয়ে চলেছে। বাতাসে মিশ্র গ্যাসের পরিবর্তে ভেসে চলেছে নাইট্রোজেন গ্যাস। সেই গ্যাসের প্রভাবে তৈরি হচ্ছে বালিয়াড়ি, ঠিক যেন মরুভূমির বালিয়াড়ির মতোই দেখতে। কিন্তু বালির বদলে তা তৈরি হয়েছে হাইড্রোকার্বন-নির্মিত কণা থেকে।

যেন মনে হবে, কল্পবিজ্ঞানে বর্ণিত কোনও এক জগতের কথা বলেছে, যা দেখতে পৃথিবীর মতো হলেও, পৃথিবীর থেকে তার বিস্তর পার্থক্য। তবে না, সেই জগত কল্পবিজ্ঞানের নয়। বরং বাস্তবের। আর নীল গ্রহের সঙ্গে মিল পাওয়া সেই জগত আপনি খুঁজে পাবেন এই সৌরমণ্ডলেই। তবে কোনও গ্রহে নয়, উপগ্রহের বুকে।

হ্যাঁ, টাইটানের জগতে আপনাকে স্বাগত। পৃথিবী থেকে ১,৪২৭ কোটি কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শনির একটি উপগ্রহ টাইটান। টাইটান ছাড়াও তার আরও একাশিটি উপগ্রহ রয়েছে, প্রদক্ষিণ করছে শনিকে অবিরত। শনি আর তার উপগ্রহরা যেন সৌরজগতের ভেতর আরও একটি সৌরজগৎ।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, কীভাবে টাইটানের জমিতে বিভিন্ন ধরণের ভৌগোলিক গঠন গড়ে উঠেছে। সেখানে পাহাড়, সমতল কিংবা অন্যান্য জটিল ভূপ্রাকৃতিক গঠনের পিছনে কী গূঢ় প্রক্রিয়া লুকিয়ে রয়েছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এই গবেষণার থেকে জানা যাচ্ছে, টাইটানের জমিতে ছোট ছোট বালিয়াড়ি গড়ে উঠেছে গ্লোবাল স্যান্ড সাইকল বা বিশ্বব্যপী বালুচক্রের কারণে। এবং এই বালুচক্র ঋতুভিত্তিতে দেখা যায়।

সাম্প্রতিককালে জিওফিজি়ক্যাল রিসার্চ লেটার নামক জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা তুলে ধরছে এই ঋতুভিত্তিক চক্র, টাইটানের জমিতে কীভাবে বানিয়ে তুলেছে জটিল ভৌগোলিক গঠন।

অন্যদিকে পৃথিবীর বুকে কিন্তু টিলা বা ছোট ছোট পাহাড় তৈরি হয় সিলিকেটেড পাথর দিয়ে। কিন্তু বাতাসের কার্যকলাপে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় চূর্ণ হয় সেই পাথর। আবহবিকার বা ওয়েদারিংয়েরও হাত থাকে তার পিছনে। সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা, সুবৃহৎ পাহাড় থেকে ক্ষয়ে গিয়ে জমা হয় পৃথিবীপৃষ্ঠে। কখনও বা স্রোতস্বিনী নদীর জলে মিশে তারা পলির আকারে জমা হয় নদীর নিম্ন অববাহিকায়।

টাইটানেও পৃথিবীর সঙ্গে সাদৃশ্য থাকে একাধিক। সাদৃশ্য থাকে পূর্ববর্ণিত প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও। শুধু টাইটানের মতো পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে জমা হওয়া পলিতে জৈব পদার্থ থাকে না। গবেষকরা দেখল, টাইটানে জমা হওয়া পলি জৈব পদার্থসমৃদ্ধ। গবেষকরা বহুকাল ধরেই বোঝার চেষ্টায় রত ছিলেন, কীভাবে এই জৈব পদার্থ শক্ত দানাতে পরিণত হচ্ছে, যারাই আবার টাইটানের বুকে এই বৈচিত্রময় ভৌগোলিক গঠন গড়ে তুলেছে তিলেতিলে।

সেই উত্তরও খুঁজে আনল গবেষকরা। স্ট্যানফোর্ডের গবেষক ম্যাথিউ লাপোত্রে জানাচ্ছেন, ঋতুভিত্তিক বালুচক্রই টাইটানের বুকে এত বৈচিত্র‍্যময় ভৌগোলিক গঠনের পিছনে দায়ী, যে ভৌগোলিক গঠনের তুলনা টানা যায় আমাদের বাসগ্রহ পৃথিবীর সঙ্গেও।

লাপোত্রে গেলেন বিষয়ের আরও গভীরে, জানালেন এই ভাসমান দানাগুলি পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খায়। তখন আরও ক্ষয় হয় তাদের। আর এই ক্রমাগত সংঘাতে দানাগুলির আকার ক্রমশ কমতে থাকে। কিন্তু এতদিন তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না, কীভাবে আবহমানকাল ধরে সেই দানাগুলির মোটের ওপর আকার একই থাকছে। সেই আকারের সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য আর কোনও প্রক্রিয়া কাজ করছে?

সেই উত্তরও খুঁজে পাওয়া সম্ভব পৃথিবীর দিকে তাকালে। পৃথিবীর বুকে ওয়েডস বলে একপ্রকার গোলাকার, ক্ষুদ্র কণা পাওয়া যায়। মূলত ক্রান্তীয় অঞ্চলের অনতিগভীর সমুদ্রে, ঠিক যেমনটা দেখা যায় বাহামাসে। এই দানাগুলো জমা হয় তখনই, যখন ক্যালশিয়াম কার্বোনেট মাটির সঙ্গে সন্নিবিষ্ট জলের গা থেকে, এই দানাগুলোর গায়ে এসে যুক্ত হয়। এই দানাগুলোর মধ্যে কোয়ার্ৎজ়ও উপস্থিত।

ঠিক এই ঘটনা গবেষকদের জানান দেয়, কীভাবে টাইটানের বুকে টিলার মতো গঠন তৈরি হয়, অথচ সেই টিলাগুলো যে উপাদান বা কণা দিয়ে তৈরি, তারা নিজেরাই কত হালকা। গবেষকদের প্রাথমিক উপাদান এই কণাগুলি পরস্পরের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। আর তার প্রভাবেই পরস্পরকে ধরে থাকা, এবং সংঘবদ্ধ হয়ে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে।

লাপোত্রের মতে এই সৌরজগতেই রয়েছে বিকল্প একটি পৃথিবী- কত আলাদা পৃথিবী আর টাইটান, তবু কোথাও গিয়ে তারা যেন এক।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।