শহর কলকাতায় বাঘের উৎপাত! গাঁজাখুরি নয়, সেদিন যা হয়েছিল...

rudranjan
৩ মিনিট
শহর কলকাতায় বাঘের উৎপাত! গাঁজাখুরি নয়, সেদিন যা হয়েছিল...

'এক ছিল মোটা কেঁদো বাঘ'। শহর ঘুরে দেখবার শখ হয়েছিল তার। সারাক্ষণ জঙ্গলে বসে মশার কামড় খেতে আর কারই বা ভালো লাগে? দক্ষিণরায় সোজা এসে উপস্থিত হলেন কলকাতায়, ছাড়লেন এক বেদম গর্জন। তারপর? 'তাই শুনে কেউ বদ্যি ডাকে, কেউ বা হাঁকে পুলিশ, কেউবা বলে, "কামড়ে দেবে সাবধানেতে তুলিস।" এমনটাই ছিল কলকাতার 'রয়াল বেঙ্গল রহস্য'। সে গল্প আজকের নয়, বহুদিন আগেকার।

কলকাতার ঠিক পাশে তখন ছিল সিমুলিয়া। সেখানে পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু। অর্থাৎ, এক কথায় বললে সুখে শান্তিতে বসবাস করে মানুষজন এমন এক নিরাপদ গঞ্জ। কিন্তু বেশিদিন সুখ আর করই বা সয়? 'যেখানেই যাও চলে', পদে পদে বিপদের ভয়। আর সেই নিয়মেই ১৮৪৯ সালের এক রোহমর্ষক ঘটনায় সিমুলিয়ার মানুষের রাতের ঘুম গেল ছুটে। এলাকায় নেকড়ে বাঘের উৎপাত শুরু হল। ১৯ এপ্রিলের 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকায় বাঘ বাবাজীর আগমনের খবর ফলাও করে প্রকাশিত হয়। তিনি নাকি ইতিমধ্যেই ঘটিয়ে ফেলেছেন ভয়াবহ সমস্ত কাণ্ডকারখানা। ১৩ এপ্রিল সন্ধের ঠিক পরে বাঘটা এসে পৌঁছয় বাবু শিবনারায়ণ দাসের গলিতে। এবং সোজা হানা দেয় নফর বাগদীর বাড়িতে। নফরের সাত মাসের কন্যা কোনোভাবে বাঘের সামনে এসে পড়ে এবং আর কোথাও কিছু না পেয়ে তাকেই মুখে করে বাঘটা পালানোর তোড়জোড় শুরু করে। কিন্তু সে যাত্রা সে পুরোপুরি সফল হয়নি। আশেপাশের মানুষজন ঘটনাটা দেখে ফেলায় হাহাকার আরম্ভ করে এবং সেই পরিত্রাহি শব্দে ভয় পেয়ে শিকার ফেলেই বাঘ পালায়। নফরের সদ্যোজাত কন্যাসন্তানকে অবশ্য জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা যায়নি। বাঘের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু ঘটেছিল।

এ ঘটনার ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল, পাশের পাড়াতেই ঘটে গেল ফের এক ভয়ানক কাণ্ড। তখন সবে অন্ধকার নেমেছে, এমন সময় এক রাজপুতের দেড় বছর বয়সি পুত্রসন্তানকে তুলে নিয়ে গেল দক্ষিণারায়। এ যাত্রাও তার শিকারের সাধ পুরোপুরি মিটল না। পাড়ায় 'গেল গেল' রব ওঠায় শিকারের আশা ছেড়ে দিয়ে বাঘ গা ঢাকা দিল, কিন্তু গোলমাল বাধল অন্য জায়গায়। রাজপুতের শিশুসন্তানের শরীরের স্পর্শকাতর কোনও এক জায়গায় বাঘটা দাঁত ফুটিয়ে দিয়েছিল, যার ফলে সেখান থেকে অনবরত রক্তপাত আরম্ভ হয়। তারপর মাত্র কয়েক ঘন্টা। বাচ্চাটাকে বাঁচানো যায়নি।

চারদিনের মাথায় ব্রিটিশ সরকার বাঘটাকে ধরার কোনোরকম চেষ্টা না করলে দুটো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়ে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি খানিকটা অভিযোগের সুরেই ঈশ্বর গুপ্তের পত্রিকায় লেখা হয়, " এইক্ষণে পুলিসাধ্যক্ষ মহাশয়েরা ও পল্লীস্থ লোকেরা কথিত ভয়ানক জন্তুর নিপাত বিহিত মনোযোগ করুন।"

কলকাতা বা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে বাঘের উপদ্রবের ঘটনা নতুন নয়। ১৮১৯ সালে 'সমাচার দর্পনে' প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায়, সে বছর সুন্দরবন থেকে থেকে বেরিয়ে একটা বাঘ এসে উপস্থিত হয়ছিল গৌরীপুর গ্রামে। গৌরীপুরের অবস্থান ছিল এখনকার দমদমের পাশে। বাঘটা শুড়িটোলা, বাগমারী এবং বেলগাছী এই তিনটে গ্রামে আনাগোনা করে শেষে গৌরীপুরে এসে হাজির হয় এবং এক মহিলাকে হত্যা করে। হরিপদ ভৌমিক তাঁর 'কলির শহর কলকাতা' বইতে দেখিয়েছেন কী ভাবে সুন্দরবনের জঙ্গল বুজিয়ে তার উপর রাতারাতি গড়ে উঠেছিল শহর কলকাতা। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় শিয়ালদহে এক পুকুর খোঁড়ার সময় মাটির তলা থেকে প্রচুর পরিমাণে সুন্দরী গাছের গুঁড়ি উদ্ধার করা হয়। ফলত, বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়না যে এ অঞ্চলে একসময় স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত ছিল সুন্দরবন।

তারপর তার উপর নেমে এলো ঔপনিবেশিক সভ্যতার ইমারত শোভিত আগ্রাসন। বাস্তুহারা হল অসংখ্য পশুপাখি। কেউ বা প্রাণ বাঁচাতে পালালো গভীর জঙ্গলে। নগরায়ণের কংক্রিটের তলায় ঘটল এক বাস্তুতন্ত্রের সলিল সমাধি। তারপর একদিন শুরু হবে প্রত্যাবর্তন। সভ্য লোকালয়ের বাসিন্দাদের মনে ত্রাস জাগিয়ে মাঝে মধ্যেই গহিন বনের জীবদের আনাগোনা ঘটতে লাগল কলকাতার রাজপথে। ব্যস্ত হয়ে উঠল পুলিশ প্রশাসন। এভাবেই তো চলতে থাকে। নগরায়ণ থেকে গোলকায়ন। ঊনবিংশ থেকে একবিংশ শতাব্দী। এলিফ্যান্ট করিডোরের উপর তৈরি হয় রেলপথ। আমাজনের বিস্তীর্ণ জঙ্গলের উপর ছড়িয়ে পড়ে বিধ্বংসী দাবানল। 'অরণ্যের অধিকার' ছেড়ে 'লুব্ধক' সম্প্রদায় চলে যায় অনিশ্চিত অজ্ঞাতবাসে।

বন ক্রমে ছোট হয়ে আসে। আর জনারণ্যে ঢুকে পড়ার জন্য় আমরা বাঘকে শাপশাপান্ত করি। কে কার ভিটে খেল, একবার ভেবে দেখবেন!

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।