আদিবাসী রাষ্ট্রপতিকে সামনে রেখেই এবার আদিবাসীদের বনভূমিতে কোপ?

সত্যিই কি আদিবাসীদের কথা ভাবছে সরকার? না কি সেই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে?

Manjushree Samanta
৩ মিনিট
আদিবাসী রাষ্ট্রপতিকে সামনে রেখেই এবার আদিবাসীদের বনভূমিতে কোপ?

ভারতের বিশাল অংশের মানুষ বনভূমিতে আবর্তিত হয়ে বেঁচে থাকে। জঙ্গলের মধ্যে এবং পাশাপাশি অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ হয় প্রধানত বনভূমিকেই কেন্দ্র করে। চিরকালই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের অনধিকার প্রবেশকারী হিসাবে দেখা হয়, বিভিন্ন অন্যায়-অত্যাচারের শিকার হতে হয় তাদেরই নিজস্ব বাসস্থানে।

২০০৬ সালে সংসদে ঐতিহাসিক 'বনবাসী তফসিলি জনজাতি এবং অন্য পারম্পরিক বনবাসীদের বনাধিকার স্বীকার আইন, ২০০৬' (সংক্ষেপে, বনাধিকার আইন) পাশ হয়েছিল। এই আইনের প্রস্তাবনায় বলা আছে যে, বনবাসীদের স্বীকৃত অধিকারের মধ্যে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ থাকছে, এবং মানুষের অংশগ্রহণের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য আরও বজায় থাকবে। তার ফলে অরণ্য সংরক্ষণ করতে আরও সুবিধে হবে। এই আইন অনুযায়ী, জঙ্গলের জ্বালানি কাঠ, বাঁশ, ফলমূল, ঘাস, ভেষজ উদ্ভিদ, লতাপাতা- সব ধরনের বনজ সম্পদ ব্যবহারের অধিকার থাকবে অরণ্যবাসীদের, যদিও এসব আইনে উল্লিখিত বিষয়ের বেশিটাই লিখিত আইন হয়েই রয়ে গিয়েছে। বেশিরভাগ সময়েই বননির্ভর জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়ে থাকে, বনজ সম্পদ ব্যবহারের কারণে।

সম্প্রতি ২০২২ সালে বন সংরক্ষণ আইনে কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে সংসদে। এই নতুন ধারায় বলা হয়েছে যে, জঙ্গলের অধিবাসী এবং গ্রামসভার অনুমোদন ছাড়াই নির্বিচারে জঙ্গল কাটা যেতে পারে। এইসব জঙ্গলের বনজ সম্পদ বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করাও যাবে। পূর্বের আইন অনুযায়ী বাণিজ্যিক কারণে জঙ্গল কাটার প্রয়োজন হলে জঙ্গলের ওপর নির্ভরশীল অধিবাসী মানুষদের থেকে সম্মতি গ্রহণ করা আবশ্যক ছিল। এবার যথেচ্ছভাবে কর্পোরেট সংস্থার হাতে তুলে দিতে আর কোনও প্রকার যাতে বাধা না তৈরি হয়, তারই ব্যবস্থা করেছে সরকার। ২৮ জুন এই আইনের সংশোধনী পাশ হয়ে গিয়েছে সংসদে। এই নতুন ধারার ফলে জঙ্গলের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে জঙ্গলের ওপর নির্ভরশীল আদিবাসী ও তফশিলি জনজাতির মানুষেরা, তাদের জীবনযাত্রা ব্যহত হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দ্রৌপদী মুর্মুকে সামনে রেখেই চলছে ইতিহাস পালটে দেওয়ার খেলা

পরপর রামনাথ কোবিন্দ এবং দ্রৌপদী মুর্মুর বাছাই মানে আসলে সবকা সাথ সব কা বিকাশ নীতির বাস্তবায়ন- এমন বার্তাই দিতে চাইছে বিজেপি। এমনকী দ্রৌপদী মুর্মু সেই কথা বলেও ফেলেছেন। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বিজেপি তাদের এই পদক্ষেপটিকে ডিভিডেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে ভবিষ্যতে।

এই প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে কোনও আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধি নির্বাচিত হলেন। আসলে দ্রৌপদী মুর্মুকে এই আসনে বসিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার অর্থাৎ বিজেপি রাজস্থান, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়-এর আগামী বিধানসভা নির্বাচন এবং পরে লোকসভা নির্বাচনে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভোট পাওয়ার চেষ্টা করতে চাইছে। এই রাজ্যগুলিতে মোট ১২৮টি আসন তফসিলি জনজাতি বা এসটি-দের জন্য সংরক্ষিত। ২০১৭ এবং ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি শুধুমাত্র ৩৫টি আসনে জিততে পেরেছিল। তবে কি হারানো ভোটব্যাঙ্ক ফিরে পেতেই এই সস্তা রাজনীতির খেলায় মেতেছে বিজেপি? তাই আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিকে রাষ্ট্রপতির সম্মানে অভিষিক্ত করা? যাতে সহজে আরও কোনও সন্দেহ ও প্রশ্ন ছাড়াই শোষণ, অত্যাচার করা যায়? দ্রৌপদী মুর্মুকে সামনে রেখে আদিবাসী সমাজের সর্বনাশ করাই এখন লক্ষ্য?

সত্যিই কি আদিবাসীদের কথা ভাবছে সরকার? না কি সেই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে? এই আইনের সংশোধনীর ফলে খুব সহজেই যে-কোনও বেসরকারি সংস্থা অথবা সরকার জঙ্গলের অধিবাসীদের তাদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করতে পারবে। এর ফলে নির্বিচারে অরণ্যগুলি ধ্বংসের মুখোমুখি হবে। জঙ্গলের অধিবাসীদের এবং গ্রামসভার থেকে কোনও প্রকার সম্মতি না নিয়েই এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদি সরকার।

২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আদিবাসীদের জমি ছিনিয়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। অথচ, নয়া আইন অনুযায়ী তাদের মতামত নেওয়া আর বাধ্যতামূলক নয়, বরং তাদেরকেই অজ্ঞাতে উচ্ছেদ করা যেতে পারে আইনিভাবে। নয়া আইনে জঙ্গলের জমি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারগুলিকে, আগে এই দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের। সরকারের দাবি অনুযায়ী, বনভূমি এলাকাগুলি সহজেই উন্নয়নের কাজে আসবে এর ফলে। এই আইন অনুযায়ী জঙ্গলের জমি প্রথমেই তুলে দেওয়া হবে বেসরকারি সংস্থা বা শিল্পপতিদের হাতে, তারপর ক্ষতিপূরণ হিসেবে বৃক্ষরোপনের অর্থ নেওয়া হবে। সব শেষে সেই অঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীদের জানানো হবে এবং রাজ্য সরকার তাদের দাবি খতিয়ে দেখে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে। এর ফলে যেমন আদিবাসী মানুষদের প্রতি অবিচার হবে, তেমনই অবিচার হবে পরিবেশের প্রতিও। এই ভয়াবহ আইনে বনাঞ্চল, অরণ্য সবই শিল্পপতিদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, পূর্বের সরকার আদিবাসীদের কথা ভেবে কিছুই করেনি। অথচ এমন সিদ্ধান্তে অরণ্যের অধিকার ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে একনায়কতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাই করছে না তো মোদি সরকার?

অথচ এতদিন এই জঙ্গলে বসবাস করা মানুষগুলোই জীবনকে বাজি রেখে বনভূমিকে আগলে রেখেছে। আজ তাদেরই জীবন নিশ্চিতরূপে দুর্বিসহ করে তোলা হচ্ছে 'ফরেস্ট কনভারশন রুলস ২০২২'-এর মাধ্যমে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।