দেশদ্রোহ গেলেও থাকছে ইউএপিএ, আসলে কি শাক দিয়ে মাছ ঢাকা হচ্ছে?

জনসেবার দোহাই দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠান। অথচ মসনদে বসামাত্র মানুষকে দাস ভেবে নেওয়ার প্রবণতা। চিরাচরিত এই প্রথা চলে আসছে যুগ যুগ ধরেই। তাই শাসকের সমালোচনা করতে গেলেই দেশদ্রোহিতার (Sedition Law) নামে হাতকড়া পড়ে নাগরিকের হাতে। ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করা নাগরিককেই দেশদ্রোহী প্রতিপন্ন করার জিগির দেখা যায়। স্বাধীনতার ৭৫ বছরে, সম্প্রতি তাই বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছে মহামান্য আদালত। সরকারকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার আর্জি জানিয়েছে। কিন্তু কিন্তু করেও তাতে নিমরাজি হয়েছে সরকারবাহাদুর। কিন্তু দেশদ্রোহ আইনের যদিও বা বাতিল হয়, তাতে কতটা লাভ হবে, বলা মুশকিল। কারণ, ইউএপিএ-সহ বাকস্বাধীনতার ওপর আইনি খাঁড়ার অবাধ প্রয়োগ চলছেই।

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জেলে পুরতে ১৮৯০ সালে এই দেশদ্রোহ আইনের সূচনা ব্রিটিশদের। আজ থেকে ৭৫ বছর আগে সেই ব্রিটিশরা ভারত থেকে চলে গিয়েছে। নিজেদের দেশে ছ’দশক আগেই ওই আইনকে অচল ঘোষণা করে তারা। বছর তেরো আগে পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কিন্তু দাসত্বের প্রতীক, ঔপনিবেশিক ওই আইনের বোঝা আজও বয়ে বেড়াচ্ছে ভারত। কারণ ব্রিটিশ বিদায় নিলেও, দেশে প্রভুত্ব থেকে গিয়েইছে, কয়েক বছর অন্তর শুধু পাল্টেছে রাষ্ট্রনেতার মুখ। একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম রাখতে, কী কংগ্রস, কী বিজেপি, দণ্ডনীয় অপরাধ আইনে ১২৪-এ অনুচ্ছেদের ওই দেশদ্রোহ আইন প্রত্যাহারের গরজ দেখায়নি কোনও দলই। বরং নিত্যনতুন আইনের বজ্র আঁটুনি ক্রমশ চেপে বসেছে নাগরিকদের গলা, যার সামনে দেশদ্রোহ আইনও লঘু হয়ে গিয়েছে।


কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিতর্কিত দেশদ্রোহ আইনে গোটা দেশে ৩২৬টি মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে চার্জশিট জমা পড়ে ১৪১টি মামলায়। দেশদ্রোহিতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন মাত্র ছ’জন। ওই ছ’বছরে সবচেয়ে বেশি দেশদ্রোহের মামলা দায়ের হয় অসমে, ৫৪টি। বাংলায় আটটির মধ্যে চার্জশিট জমা পড়ে পাঁচটিতে। দোষী সাব্যস্ত হননি কেউ। মেঘালয়, মিজোরাম, ত্রিপুরা, সিকিম, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, লাক্ষাদ্বীপ, পন্ডিচেরি, চণ্ডীগড়, দমন ও দিউ এবং দাদরা ও নগর হাভেলিতে দায়ের হয়নি একটি মামলাও। সব ষচেয়ে বেশি সংখ্যক দেশদ্রোহের মামলা দায়ের হয় ২০১৯ সালে, সবমিলিয়ে ৯৩টি।

 

আরও পড়ুন: বিপ্লব দেবকে কেন সরানো হল! ভোটের আগেই ত্রিপুরায় আত্মসমর্পণ বিজেপির?


অন্য দিকে, ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (NCRB) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত, সাত বছরে গোটা দেশে UAPA ধারায় ৬,৯০০টি মামলা দায়ের হয়, অর্থাৎ প্রতি বছরে গড়ে ৯৮৫টি। ২০১৯ সালে সর্বাধিক ১,২২৬টি মামলা দায়ের হয়। ওই সাত বছরে সবমিলিয়ে ১০,৫৫২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। দোষী সাব্যস্ত হন ২৫৩ জন। অর্থাৎ, প্রতি বছর গড়ে ১,৫০৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়, যার মধ্যে প্রতি বছর দোষী সাব্যস্ত হন গড়ে ৩৬ জন। ২০২০ সালে হাথরস ধর্ষণকাণ্ড নিয়ে খবর করতে গিয়ে গ্রেফতার হন কেরলের সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান এবং আরও তিন জন। তাঁদের বিরুদ্ধও UAPA আনা হয়। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র নেতা তথা সমাজকর্মী উমর খালিদকেও ওই আইনে বন্দি করে রাখা হয়েছে। জেলবন্দি অবস্থায় মৃত্যু হওয়া সমাজকর্মী স্ট্যান স্বামীর বিরুদ্ধেও UAPA প্রয়োগ করা হয়।


UAPA-র পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা আইন (NSA), জন নিরাপত্তা আইনের (PSA) খাঁড়াও ঝুলছে। NCRB-র ওয়েবসাইটে NSA আইনে কত মামলা দায়ের হয়েছে, কতজনকেই বা গ্রেফতার করা হয়েছে, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান মেলে না। ১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হাতে প্রবর্তিত, NSA আইনে কোনও নাগরিককে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে মনে হলে, তাঁকে গ্রেফতার করতে পারে সরকার। এমনকী, কোনও বিদেশি নাগরিককেও গ্রেফতারি এবং প্রত্যর্পণ করার ক্ষমতা রয়েছে কেন্দ্র এবং রাজ্যের। কী অপরাধে গ্রেফতার, তা খোলসা না করেও সরকার চাইলে কাউকে ১০ দিন থেকে সর্বাধিক তিন মাস পর্যন্ত বন্দি করে রাখতে পারে। আবার সর্বাধিক এক বছরও বন্দি রাখা সম্ভব কাউকে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে মেয়াদ বাড়াতেও পারে সরকার।


অন্য দিকে, জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য আনা PSA আইনে দোষী সাব্যস্ত না হলেও সর্বাধিক দু’বছর কোনও নাগরিককে বন্দি করে রাখতে পারে সরকার। PSA আইনের ক্ষেত্রে দেশের কোনও ফৌজদারি আইনের আওতায় প্রাপ্য কোনওরকম রক্ষাকবচই কার্যকর নয়। PSA আইনে এই মুহূর্তে উপত্যকায় বন্দি ৫০০-র বেশি মানুষ, যার মধ্যে এ-বছর মার্চ-এপ্রিলেই গ্রেফতার হন ১৫০ জন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, এত সংখ্যক মানুষকে PSA আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে যে, উপত্যকার জেলে জায়গা না হওয়ায় অন্যত্র বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এমনকী, এক আইনে গ্রেফতার হয়ে জামিনে মুক্ত হলেও, পরক্ষণে PSA কার্যকর করে জেলে পোরার নজিরও রয়েছে। ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা খর্ব করার পর, PSA কার্যকর করেই উপত্যকার প্রাক্তন তিন মুখ্যমন্ত্রী ফারুখ আবদুল্লা, ওমর আবদুল্লা এবং মেহবুবা মুফতিকে বন্দি করে সরকার। দীর্ঘ সময় পর সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়া হলফনামার ভিত্তিতে মুক্তি পান তাঁরা।


দেশদ্রোহ আইন হোক বা UAPA, NSA হোক বা PSA, বর্তমানে এই সবক’টি আইনের প্রয়োগের উদ্দেশ্য অভিন্ন, যা হল, সন্ত্রাসবাদ এবং অসাধু উদ্দেশ্যর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা, ঐক্য এবং অখণ্ডতা রক্ষার অজুহাত খাড়া করে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা খর্ব করা। তাই মাসকয়েক আগে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রোহিন্তন নারিমান খোদ সর্বোচ্চ আদালতকে দেশদ্রোহ এবং UAPA আইন প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়েছিলেন। এতে দেশের সাধারণ নাগরিক প্রাণ খুলে শ্বাস নিতে পারবেন বলে মত ছিল তাঁর। সাম্প্রতিক ্লে তাঁর এই অবস্থান প্রতিফলিত হতে দেখা গিয়েছে দেশের বর্তমান প্রধান বিচারপতি নুথালপতি বেঙ্কট রমণার মন্তব্যেও। তাই স্থান-কাল-সময়বিশেষে প্রায়শই কেন্দ্রকে ‘লক্ষ্মণরেখা’ স্মরণ করিয়ে দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।


এক বছর ধরে পড়ে থাকা দেশদ্রোহ আইন বাতিলের আর্জি নিয়ে সম্প্রতি নিজেই সক্রিয় হন প্রধান বিচারপতি রমণা। সেই নিয়ে প্রথমে একরোখা অবস্থান দেখালেও, পরে কেন্দ্র নিজেই ঔপনিবেশিক আইনটির প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনার কথা জানায়। তাতে বিচারপতি রমণা জানিয়ে দেন, সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো না পর্যন্ত আইনটি আপাতত মুলতুবি থাকবে। তাতে আশার আলো দেখা গেলেও, দেশদ্রোহ আইন কিন্তু বাতিল হয়ে যায়নি এখনও। বরং পুরো বিষয়টি এখনও কেন্দ্রের ‘পুনর্বিবেচনা’-র ওপরই দাঁড়িয়ে রয়েছে। আবার দেশদ্রোহ আইনে আপাতত মামলা না করা গেলেও, UAPA প্রয়োগে বাধা নেই। আবার দেশদ্রোহ এবং UAPA, দুই ধারাই প্রয়োগ করা হয়েছে যাঁদের ওপর, দেশদ্রোহ আইন বাতিল হলেও, অন্যটির জন্য জেলেই থাকতে হবে তাঁদের।


এমনকী, দেশদ্রোহ আইন মুলতুবি করতেই হবে, এমন নিয়ম বেঁধেও দেয়নি আদালত। ফলে এই মুহূর্তেও কাউকে দেশদ্রোহ আইনে গ্রেফতার করা যেতেই পারে। আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখে যদি বোঝে, তিনি নির্দোষ, তবেই মিলবে মুক্তি। কিন্তু ক’জন আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশ করার সুযোগ পাচ্ছেন, তা নিয়ে ধন্দ রয়েছে। জুলাই মাসে পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত আপাতত দেশদ্রোহ আইনের ওপর স্থগিতাদেশ রয়েছে আপাতত। তারপর আগস্ট মাসেই মেয়াদ কার্যকালের মেয়াদ শেষ প্রধান বিচারপতি রমণার। তাই কেন্দ্র চাইলে পর্যালোচনার জন্য আরও সময় চাইতেও পারে। আবার দেশদ্রোহ আইন প্রত্যাহারের কৃতিত্ব নিতে মোদি সরকার যদিও বা আইনটি বাতিল করে, তা হলেও UAPA, NSA এবং PSA-সহ বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী আরও একগুচ্ছ আইন রয়েছে সরকারের হাতে, যা ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও মন্তব্য করার জন্য, এমনকী কোনও পোস্টে লাইক দেওয়ার জন্যও যে কারও বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা যেতে পারে এবং গত কয়েক বছরে তা হয়েওছে। তাই দেশদ্রোহ আইন বাতিল যদি হয়ও, তাহলেও দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে থাকার সবরকম উপাদানই মজুত রয়েছে ভারতীয় গণতন্ত্রে।

More Articles

;