রাজ্যবাসীর মতামত শিকেয়, 'অভিন্ন দেওয়ানি বিধি' পাশে প্রথম উত্তরাখণ্ড

Uniform Civil Code Bill tabled in Uttarakhand: দেশ জুড়ে যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে এত বিতর্ক, উত্তরাখণ্ডের বিধানসভায় পাশ হয়ে গেল সেই ইউনিফর্ম সিভিল কোড।

Sohini Das
৩ মিনিট
রাজ্যবাসীর মতামত শিকেয়, 'অভিন্ন দেওয়ানি বিধি' পাশে প্রথম উত্তরাখণ্ড

রামমন্দির গড়ার কাজ শেষ। লোকসভা ভোটের আগে এবার মোদির চোখ 'অখণ্ড ভারত'। আর সেই 'অখণ্ড' ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে চায় কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। আর তার শুভ মহরৎ হয়ে গেল উত্তরাখণ্ডে। দেশ জুড়ে যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে এত বিতর্ক, উত্তরাখণ্ডের বিধানসভায় পাশ হয়ে গেল সেই ইউনিফর্ম সিভিল কোড। উত্তরাখণ্ডের পুষ্কর সিংহ ধামী সরকার দেশে প্রথম অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করতে চলেছে।

আপাতত সেই বিলটি অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়া বাকি শুধু। সেখান থেকে সবুজ সঙ্কেত পেলেই পার্বত্য এই রাজ্যে চালু হয়ে যাবে বিতর্কিত এই দেওয়ানি বিধি। কিন্ত রাজ্যবাসী কি আদৌ সেটাই চান। না, আশপাশে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ দেখে তো তেমনটা মনে হচ্ছে না। উত্তরাখণ্ড বিধানসভায় চার দিনের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছিল সম্প্রতি। গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় সেই অধিবেশন। শোনা গিয়েছিল, বুধবার শেষ দিনের অধিবেশনেই উত্তরাখণ্ডের বিজেপি সরকার এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পাশ করাবে। আর কার্যত হলও তেমনটাই।

কী রয়েছে এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে? যতদূর জানা গিয়েছে, সব ধর্মের মানুষের জন্য বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, জমি-সম্পত্তি এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত এক এবং অভিন্ন আইন প্রচলনের কথা বলা হয়েছে এই আইনে। একই সঙ্গে সমস্ত ধর্ম নির্বিশেষে পুরুষদের বহুবিবাহ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে এই আইনে। শুধু তা-ই নয়, লিভ-ইন বা একত্রবাসের ক্ষেত্রেও তা নথিভুক্ত করাতে হবে বলে জানানো হয়েছে প্রস্তাবিত ওই আইনে। ওই বিধির আওতায় কোনও যুগল যদি একত্রবাস করতে চান, সেক্ষেত্রে তাঁকে অবশ্যই পুলিশ বা জেলা আধিকারিকদের অনুমতি নিতে হবে। আর যদি যুগলের বয়স একুশের কম হয়, সেক্ষেত্রে তাঁদের অভিভাবকদের অনুমতির প্রয়োজন হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এবার লিভ-ইন রেজিস্ট্রি না করলেই শাস্তি! কী বলা আছে বিজেপি সরকারের প্রস্তাবিত আইনে?

Live In Relation Registry : লিভ-ইন সম্পর্ক শুধুমাত্র একজন পুরুষ এবং একজন মহিলার মধ্যেই স্বীকৃত। এই আইনে সমকামী দম্পতিদের জন্য কোনও ঠাঁই নেই।

ধর্ম নির্বিশেষে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছর করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ‘রেজিস্ট্রি বিবাহ’ বাধ্যতামূলকের কথা বলা হয়েছে এই বিধিতে। কোনও যুগল ‘লিভ-ইন’ করতে চাইলে প্রথমেই তাঁদের নাম পুলিশের কাছে নথিভুক্ত করতে হবে। ‘লিভ-ইন’ সম্পর্কের ‘ঘোষণাপত্র’ সঙ্গে রাখতে হবে যুগলকে। সময় মতো প্রয়োজনে তা দেখাতে ব্যর্থ হলে যুগলের ২৫ হাজার টাকার জরিমানা এবং তিন মাসের জেল হতে পারে। ‘লিভ-ইন’ সম্পর্কে থাকা যুগলের যদি সন্তান হয়, তবে শিশুরা আইনি স্বীকৃতি পাবে।

বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও রাজ্যের সকলের জন্য একই নিয়ম বলবৎ করার কথা আছে এই বিলে। দম্পতিকে নির্দিষ্ট সময় ‘কুলিং অফ’ পিরিয়ডে থাকতে হবে। সেই সঙ্গে এই বিলে সন্তান দত্তক নেওয়ার নিয়ম আরও সহজ করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়াও সম্পত্তির ক্ষেত্রে ছেলে এবং মেয়েদের সমান অধিকার থাকবে। জন্ম দেওয়া সন্তান এবং দত্তক নেওয়া সন্তান— দু’জনেই সম্পত্তির ক্ষেত্রে সমানাধিকারী হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
লিভ-ইন করলেও রেজিস্ট্রি করতে হবে এবার? অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে যা করতে চাইছে বিজেপি

Uniform Civil Code : উত্তরাখণ্ডের জন্য প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে সকলকেই দত্তক গ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়েছে, মুসলিম মহিলাদেরও।

বিজেপির এই একগুচ্ছ আইন সংশোধন প্রস্তাবে প্রথম সায় জানিয়েছে উত্তরাখণ্ড। যদিও এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। দেশের সংবিধানপ্রণেতা বিআর অম্বেদকরের পৌত্র তথা বঞ্চিত বহুজন আঘাদি (VBA)-র প্রধান প্রকাশ অম্বেদকরের মতে, এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এইভাবে আরোপ করা যায় না। কারণ সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে তাঁদের নিজস্ব ধর্ম ও তার সংস্কার পালনের স্বাধীনতা দেয়। এই পরিস্থিতিতে যদি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি রূপায়িত করতে হয়, সেক্ষেত্রে সংবিধানকে পুরোপুরি বদল করার প্রয়োজন রয়েছে। নাহলে এই UCC-আইন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।জনগণের তাঁদের ব্যক্তিগত ধর্ম ও আইন মেনে চলবেন, না অভিন্ন দেওয়ানি বিধি মানবেন, সে ব্যপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। ফলে এই ধরনের আইন রূপায়ণের চেষ্টাকে 'অপপ্রচার' বলেই মনে করছেন অম্বেদকরের পৌত্র।

তবে তিনি যা-ই বলুন না কেন, বিজেপি রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হওয়ার সম্ভাবনা যে বেশ বেশি, তা একরকম পরিষ্কার। আর সেই ছবিটাই আরও একবার পরিষ্কার করে দিল উত্তরাখণ্ড। বিধানসভায় এই বিল পাশের পর সংবাদমাধ্যমকে মুখ্যমন্ত্রী ধামী বলেন, ‘‘এই আইন সমানাধিকারের কথা বলে। এটি কারও বিরুদ্ধে নয়। এই আইন মহিলাদের জন্য, যাঁরা সমাজে পদে পদে সমস্যার সম্মুখীন হন। এটি তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। বিলটি পাশ হয়েছে। উত্তরাখণ্ডের বিধানসভা ভোটে বিজেপি জিতলেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী ধামী।

গত বছর ভোটে জিতে ক্ষমতায় ফেরার পরেই সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তৎপর হন তিনি। উত্তরাখণ্ডে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার আইনি প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনাপ্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে কমিটিও গড়েছিল সে রাজ্যের সরকার। গত শুক্রবার সেই কমিটি মুখ্যমন্ত্রীর হাতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির খসড়া রিপোর্ট তুলে দেয়। তার পর এই বিল পাশ হওয়া ছিল সময়ের অপেক্ষা। এখন বাকি শুধু রাষ্ট্রপতির হাত থেকে অনুমোদন মেলার। সেটুকু হয়ে গেলেই উত্তরাখণ্ড হবে দেশের প্রথম রাজ্য, যেখানে বলবৎ হবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। কিন্তু উত্তরাখণ্ডে এ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ শুরু হয়েছে। মানুষ কি চায় আদৌ এই অভিন্ন আইন, 'অখণ্ড' ভারত! সেই সমীক্ষা কি আদৌ চালিয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার? প্রশ্ন থাকছেই।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।

দিল্লিতে মহিলা বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে যে সব প্রশ্ন

Delhi protest: দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে মহিলা আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।