ডাক্তার হয়ে হাজার হাজার ফুট থেকে লাফ! ভারতের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার আজও আড়ালেই

India’s first female paratrooper: ১৯৫৯ সালে বিমান বাহিনীর সকল ডাক্তারদের জন্য ডেকে পাঠানো হয় প্যারাট্রুপিংয়ের জন্য। সেই ডাকে বহু পুরুষও ভয়ে এগিয়ে আসেননি।

Shibani
৩ মিনিট
ডাক্তার হয়ে হাজার হাজার ফুট থেকে লাফ! ভারতের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার আজও আড়ালেই

হিপ হিপ হুররে! হিপ হিপ হুররে! হিপ হিপ হুররে! হাজার ফুট উচ্চতা অবধি শব্দগুলো ঠিকঠাক কানে আসছে না। তবে ব্যর্থ হলে চলবে না। ঝাঁপ দিতেই হবে। ভারতীয় বিমাবাহিনীর একটি ডাকোটা প্লেনের খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এমনটাই আউড়ে যাচ্ছিলেন গীতা। বাঙালি চনমনে তরুণী প্যারাট্রুপার গীতা চন্দ্র। জীবনে প্রথম এত উচ্চতা থেকে ঝাঁপ দিতে চলেছেন তিনি। তাঁর সামনেই রয়েছেন আরও তিনজন প্রশিক্ষক প্যারাট্রুপার। নীচে বিপুল জনতার ভিড় সাক্ষী হতে চলেছে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাসের।

সাল ১৯৫৯, ১৭ জুলাই। রোগা, পাতলা, শ্যাম বর্ণের মেয়েটি ভয় ও উত্তেজনায় একপ্রকার গুটিয়ে গেলেও নতুন ইতিহাস গড়তে চলেছেন। হাজার হাজার মানুষের প্রত্যাশাকে বুকে বেঁধে সবুজ সংকেত পাওয়া মাত্রই সমস্ত কিছুকে পেছনে ফেলে তীব্র একাগ্রতার নিয়ে প্লেন থেকে ঝাঁপ দিলেন গীতা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাঁচতে চাওয়ার তীব্র আকুতি! বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে লাইফ জ্যাকেটের এই পাহাড়!

Life Jacket Mountain: পৃথিবীর বিস্ময় জাগানো পাহাড়, লাইফ জ্যাকেটের পাহাড়! পাথুরে জমিতে স্তূপ হয়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীদের লাইফজ্যাকেট।

ব্যাস! শূন্যে পড়তেই কিছু সেকেন্ড সব নিশ্চুপ! বোধশক্তিও যেন কিছুটা কমে এল। ধীরে ধীরে প্যারাসুট খুলতেই নীচে নেমে এলেন গীতা। এ একপ্রকার বিশ্ব জয়! ভারতের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার গীতা লিখলেন আকাশ জয়ের গল্প, ভয় জয়ের আখ্যান! তবে গল্প শুনতে যতটা আকর্ষণীয় বাস্তবে তা মোটেই তেমন ছিল না। কোনও দেশের কোনও মহিলাই তখনও অবধি এই প্রায় দুঃসাধ্য কাজটি করে উঠতে পারেননি, গীতা পেরেছিলেন। ছোট থেকে অদম্য সাহসী, ডানপিটে গীতা কিন্তু আসলে পেশায় ডাক্তার। ১৯৫৭ সালে প্রথম ভারতীয় বিমান বাহিনীতে ডাক্তার হিসেবেই যোগদান করেন তিনি। ছোটবেলা কেটেছে অধুনা বাংলাদেশের রংপুরে। বাবা ছিলেন কলেজের অধ্যাপক। সাইকেল চালানো থেকে গাছে ওঠা- কিশোরী গীতার কাছে এসব ‘অ্যাডভেঞ্চার’ ছিল নেহাতই মামুলি খেলা।

১৯৫৯ সালে বিমান বাহিনীর সকল ডাক্তারদের জন্য ডেকে পাঠানো হয় প্যারাট্রুপিংয়ের জন্য। সেই ডাকে বহু পুরুষও ভয়ে এগিয়ে আসেননি। কোনও কিছু না ভেবেই এগিয়ে এসেছিলেন সাহসী গীতা। তবে মহিলা হওয়ার দরুণ তাঁর এহেন ইচ্ছেকে বহু উপায়ে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল কর্তৃপক্ষ। বলা বাহুল্য, সে সময় (আজও প্রায় একই) সকলেরই ধারণা ছিল এসব কাজ শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য, সাহস শব্দের উপর অধিকার, দাবি কেবলই পুরুষের! স্বাভাবিকভাবেই গীতাকেও সে কথা পরিষ্কারভাবে জানানো হয়। গীতা কোনওকালেই দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না। যত বাধা দেওয়া হয় তত যেন প্যারাট্রুপিংয়ের ইচ্ছে আরও প্রগাঢ় হয়ে ওঠে! সহকর্মীদের বিরূপ মনোভাব যেন তাঁর সংকল্পকে শত গুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবেই লড়াইটা গীতা চন্দ্রের একার পক্ষে হয়তো সম্ভবও হতো না যদি না সেই সময় তাঁর পাশে থাকতেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। সুব্রত ছিলেন একজন এয়ার মার্শাল এবং সেই সময় বিমান বাহিনীর অধিনায়ক। তাঁর সম্মতিতেই ১৯৫৯ সালে প্যারাট্রুপিংয়ের স্কুলে প্রশিক্ষণের জন্য ভর্তি হন গীতা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জন্ম থেকেই নেই দু'হাত, পায়ে চালান বিমান! চাইলেই হয় অসাধ‍্যসাধন, প্রমাণ করেছেন তিনি

Jessica Cox: জন্মগতভাবে দু'হাত নেই, তাতে কী! তবু আকাশে বিমান ওড়ানোর মতো দুঃসাধ্য কাজ করছেন জেসিকা।

বর্ষার সময়টুকু বাদ দিয়ে বাকি সারা বছরই প্যারাট্রুপিং স্কুলে ট্রেনিং চলে। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটেছিল সেই বছর। মাত্র একজন প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে স্কুল চলেছিল বর্ষাকালেও। প্রায় মাস দেড়েক ধরে পিটি, প্যারেড, দৌড় সবেতেই নিয়মিত ঘাম ঝরাতে লাগলেন গীতাকে। সকালে ঘুম ভাঙার পর তাঁর প্রথম কাজই ছিল পাঁচ মাইল দৌড়। প্যারাট্রুপিং চাট্টিখানি কথা তো নয়। যেমন প্রয়োজন মানসিক শক্তি তেমনই প্রয়োজন শারীরিক শক্তি এবং কঠোর পরিশ্রম করার ক্ষমতার। যেকোনও প্রশিক্ষণার্থীর সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ এই সময়টাই। প্রতিবারই মনে হয়, এই বুঝি হেরে গেলাম! তারপরেও একবার শেষ চেষ্টার প্রত্যাশা।

দেড় দু’মাস এভাবে চলার পর শুরু হয় গ্রাউন্ড ট্রেনিং। প্যারাসুট নিয়ে নামার বিভিন্ন কলা কৌশল, শরীরের অঙ্গভঙ্গি এবং নিরাপদে মাটিতে নামার কৌশল শেখানো হয় এই সময়।

১৭ জুলাইয়ের মাত্র আট দিন পরেই দ্বিতীয়বার প্যারাট্রুপিং করেন গীতা। তবে প্রথম দিনের মতোন তা মোটেই সহজ ছিল না। একটি সাক্ষাৎকারে গীতা বলেছিলেন, “দ্বিতীয় বার ঝাঁপ দেওয়ার পরই প্যারাসুটটা দড়ির সঙ্গে জট বেঁধে গিয়েছিল। যেকোনও মুহূর্তে সাংঘাতিক বিপদও ঘটতে পারত। তবে কথাতেই তো আছে মেয়েদের কই মাছের প্রাণ, তেমনই একপ্রকার বেঁচে ফিরেছি।”

বাকিটা ইতিহাস! শুরুর পর থেকে আর থেমে থাকেননি গীতা। দিনের আলোয় তো বটেই, রাতের গহিন অন্ধকারেও তাঁকে তাড়া করেছে প্যারাট্রুপিংয়ের নেশা। মাঝরাতেও ট্রেনিং করতেন তিনি। দেড় মাসের মাথায় অগাস্টে শেষ হয় তাঁর এই কঠিন প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে সুব্রত মুখোপাধ্যায় নিজের হাতে ব্যাজ পরিয়ে দিয়েছিলেন গীতাকে। রংপুরের ডাক্তারি পড়া কন্যা বাংলায় এক অদ্ভুত ইতিহাস রচনা করে গেলেন নিরুচ্চারে। এতটাই শব্দহীন সেই উড়ান যে গীতা চন্দ্রের নাম ইতিহাসে আজও প্রায় অধরাই রয়ে গেল।

লিখেছেন
Shibani
Shibani
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।