উৎপলেন্দুর ছবি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মের সম্প্রসারণ...

Utpalendu Chakrabarty: তাঁর প্রধান চিত্রমালা, অন্তত 'চোখ’, 'ময়নাতদন্ত' আর 'দেবশিশু' প্রত্যক্ষভাবেই রাজনৈতিক ছবি।

Sanjay Mukherjee
৩ মিনিট
উৎপলেন্দুর ছবি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মের সম্প্রসারণ...

ইতিহাসের কী অপার কৌতুক যে, প্রায় ২৫ বছর পর 'ময়নাতদন্ত' শব্দটি জনপরিসরে সত্যিই তদন্ত দাবি করছে। স্বরচিত এই 'ময়নাতদন্ত' গল্পটি নিয়েই ১৯৭৪ সালে উৎপলেন্দু চক্রবর্তী মৃণাল সেনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাঁর ৪-ই মতিলাল নেহেরু রোডের বাড়িতে তখন আমাদের নিত্য যাতায়াত। আলাপ হয়েছিল উৎপলেন্দুর সঙ্গে। আমার থেকে বছর তিন-চারেকের বড় কিন্তু আমরা সবাই ৭০ দশকের। উৎপলেন্দুকে তখন আগুনের বাসিন্দা মনে হয়েছিল। সে মৃণালদাকে আরেকটি খসড়া চিত্রনাট্যও দেখায়, 'প্রসব' নামে। যেখানে একজন গ্রাম্য রমণী শেষ পর্যন্ত প্রসব করে রাইফেল ও রেডবুক! গোর্কির 'মানুষের জন্ম' গল্পটির অনুসরণে লেখা এই চিত্রনাট্য মৃণাল সেনের মনে ধরেনি। তিনি 'ময়নাতদন্ত' নিয়ে কিছুটা এগিয়েছিলেন কিন্তু তৎকালীন কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আইকে গুজরাল জানান, অনশনে মৃত্যু এখনও সংবিধানসম্মত নয়, তাই কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান পাওয়া যাবে না। ফলে প্রকল্পটি পরিত্যক্ত হয়। উৎপলেন্দু নিজেই তাঁর প্রথম কাহিনিচিত্র হিসেবে আশির দশকের শুরুতে ছবিটি বানান। সময়ের পাতা খুলে যাচ্ছে। সিনে ক্লাব অফ আসানসোলের একটি আলোচনায় উৎপলেন্দু যা বলেন তা ওই ফিল্ম সোসাইটির মুখপত্র সেলুলয়েড-এর প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয়। সেখানে নকশালপন্থী উৎপলেন্দু সরাসরি জানান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দাক্ষিণ্য ও অর্থের জোগান না থাকলে তিনি এই ছবি বানাতে পারতেন না। তিন বছর বাদে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার আবার তাঁর প্রতি সদয় হয় এবং 'চোখ' নির্মিত হয়। তৃতীয় ছবি 'দেবশিশু' অবশ্য এনএফডিসির অনুদান।

আমরা এগিয়ে গিয়েছি কিন্তু ফিরে দেখলে মনে হবে উৎপলেন্দু আমার মতো অজ্ঞাতকুলশীল নয়। ছিন্নমূল রচয়িতা ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রখ্যাত সাহিত্যকর্মী স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য তাঁর মামা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজির সুখ্যাত অধ্যাপক দীপেন্দু চক্রবর্তী তাঁর দাদা। সুতরাং উৎপলেন্দু যে সাহিত্য করবে তা পূর্ব নির্ধারিতই ছিল। সিনেমায় তাঁর প্রথম অবদান 'মুক্তি চাই' (১৯৭৭)। তখন বামফ্রন্ট সরকার সবে ক্ষমতায় এসেছে। বন্দিমুক্তির দাবিতে তোলা এই ছবি দেখাতে সে আমাকে নিউ সেক্রেটারিয়েটের চত্বরে নিয়ে যায়। বস্তুত এই ছবি সদ্য ভূমিষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকারকে অনেক সাহায্য করেছিল বন্দিমুক্তির বিষয়ে একটি খসড়া তৈরি করতে। সেই সূত্রেই তৎকালীন তথ্য সংস্কৃতিমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। উৎপলেন্দু কত বড় শিল্পী ছিল তা নিয়ে তর্ক তোলা যায়, কিন্তু তাঁর ছবি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মের সম্প্রসারণ। উৎপলেন্দু কোনওক্রমেই অরাজনৈতিক ছিলেন না। তাঁর প্রধান চিত্রমালা, অন্তত 'চোখ’, 'ময়নাতদন্ত' আর 'দেবশিশু' প্রত্যক্ষভাবেই রাজনৈতিক ছবি। এতটাই রাজনীতির যে তাঁকে উত্তর-ঋত্বিক, উত্তর-মৃণাল পর্বের সূচনা বলা যায় বাংলা ছবিতে। এই সময়েই বিপ্লব রায়চৌধুরীর 'শোধ', বুদ্ধদেবের 'নিম অন্নপূর্ণা', উৎপলেন্দুর 'চোখ' এবং গৌতম ঘোষের 'হাংরি অটাম' ও 'দখল' প্রকৃতই বাংলা ছবিতে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির রঙ লাগিয়ে দিয়েছিল। উৎপলেন্দু ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনকে শ্রদ্ধা করতেন কিন্তু তাঁর মূল ভালো লাগা সত্যজিৎ রায়। 'পথের পাঁচালি' ও পরবর্তীকালে 'সদগতি' থেকে তিনি কখনই মুক্তি পাননি। বস্তুত, 'চোখ' ছবিতে ওম পুরী ও শ্রীলা মজুমদারের অভিনয় দেখলেই বোঝা যায় তিনি হাত পাতছেন সদগতির ওম পুরী ও স্মিতা পাতিলের কাছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তরুণ মজুমদার জানতেন, রাজনীতির চেয়ে মনুষ্যত্বর বয়স বেশি

আমার মনে হয়, বাংলা চলচ্চিত্রে একদিকে যেমন ঋত্বিক ঘটক কাহিনিকে ভেঙেচুরে শিল্পের এক কাঞ্চনজঙ্ঘা তৈরি করেন, অন্যদিকে তরুণ মজুমদার কিন্তু গল্পের পর গল্পে টিলার পর টিলা তৈরি করে রাখেন ছোটনাগপুর, সাঁওতাল পরগনা উপত্যকায়।

তথ্যচিত্রের প্রতি উৎপলেন্দুর একটা আগ্রহ ছিলই। ১৯৮৩ আর ১৯৮৪-তে দেবব্রত বিশ্বাস আর সত্যজিৎ রায়ের সংগীত নিয়ে দু'টি ছবি তুলেছিলেন তিনি যা আমাদের সংস্কৃতি চর্চার উজ্জ্বল উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। পরে 'সুনীল সাগরে' নাম দিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপরও একটি ছবি তুলেছিলেন। যদিও সেই ছবি আমি দেখিনি।

এই তো বছর চার-পাঁচ আগে উৎপলেন্দুর সঙ্গে আমার দেখা। আমাকে সরাসরি অভিযোগ করে বললেন, "আপনি বলেন অনেক কিছু, কিন্তু আমার সম্বন্ধে তো কিছু বলেন না বা লেখেন না?” আমি ঈষৎ লজ্জিত হয়ে বলেছিলাম, সবসময় তো সুযোগ পাওয়া যায় না! সুযোগ এল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একটি চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আমি তাঁদের বলি, উৎপলেন্দু এক্ষেত্রে অনেক উপযুক্ত ব্যক্তি, তাঁকে অনুরোধ জানাও। ছাত্ররা আমার নাম করে তাঁকে অনুরোধ জানায়। তিনি আসেন। বক্তৃতাও দেন। আর সবচেয়ে আশ্চর্য, সারাদিন ছাত্রদের সঙ্গে বসে থেকে সব ছবিগুলো দেখেন। ছাত্ররা আমাকে বলেছিল, "স্যার উনি গভীর তৃপ্তিতে আমাদের জড়িয়ে ধরেছেন, তারপর ট্যাক্সিতে উঠেছেন।" আমাদের সত্তর দশক সত্যিই যৌবনের ছিল। নবারুণ বলতেন, সত্তর দশক ছাড়া আমরা কেউই কিছু হতাম না। কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। দুঃখ শুধু এটাই, আমি উৎপলেন্দুকে নিয়ে কিথা বললাম কিন্তু সে আর শুনতেই পেল না।

লিখেছেন
Sanjay Mukherjee
Sanjay Mukherjee
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।