প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবন কতটা 'সবার'

Sindhu Som
৪ মিনিট
প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবন কতটা 'সবার'

বছর ঘুরল, ফের ১৪ ফেব্রুয়ারি। প্রেমের উদযাপনের দিন। যদিও যে বস্তু প্রেম, তা কি উদযাপনের? এই প্রশ্নে বিতর্ক আজকের নয়। মোটামুটি উদারনীতিবাদের বেনো জলের সঙ্গে সঙ্গে যে সমস্ত বাজার কেন্দ্রিক উদযাপন ঢুকে পড়েছিল বাংলা সংস্কৃতির জগতে তাদের মধ্যে ভ্যালেন্টাইনস্‌ ডে অন্যতম। নব্বইয়ের দশকের আগে প্রেমে একটা বৈষ্ণব-বৈষ্ণব গন্ধ ছিল। রবীন্দ্রনাথ থেকে হাংরি পর্যন্ত ‘ভদ্রলোক’ সমাজের যে ধারণায় খুব একটা হেরফের করে উঠতে পারেননি কেউই। বরং অভিসার ইত্যাদি নিয়ে বিচিত্র সব কল্পনা থাকত। সবটাই যে খুব সুখকর তা নয়। আকছার শোনা যেত, সাহিত্য থেকে বন্ধু বান্ধবের আড্ডায়–গোপনীয়তাতেই প্রেমের মজা। এও এক উদযাপন, তবে নিঃশব্দ। ভালো মন্দে যাচ্ছি না, তবে নব্বইয়ের দশকে সশব্দ উদযাপন শিখাল তারাই, যাদের বাজির কারখানা, এটুকুই বলার। কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। এই উদযাপন মূলত কাদের? বিত্তবান বা নিদেন মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর কিশোরী থেকে তরুণ তরুণী–এই বর্গের বাইরে এক বিরাট ক্ষেত্র এই উদযাপনের বাইরে পড়ে। এলজিবিটিকিউ কম্যুনিটি থেকে বয়স্ক মানুষজন–সংখ্যাটা কম নয়। যাদের উদযাপন সমাজ ভালো চোখে দেখে না। বাঁকানো দৃষ্টির ছুরি ‘সামাজিকতা’র হিসেবে শান দেয় যাদের উদযাপনের উপর সারাক্ষণ।

কয়েক বছর হল ভারতে লিঙ্গের ক্ষেত্রটিতে যাদের অপর করে রাখা হয়, তাদের প্রেমকে, বিবাহকে স্বীকৃতি দিয়েছে ভারতীয় আইন। বহু লড়াইয়ের পর, একবার আইনী ঘোষণা করেও সে নির্দেশ তুলে নেওয়ার পর। মানসিক ভাবে কিছুটা হলেও ‘অপর’ লিঙ্গের এতে খানিকটা আরাম মেলার কথা। কিন্তু সামাজিক পরিসরে তাদের অবস্থান কী? ভ্যালেন্টাইনস ডে-র বাজার সর্বস্ব অর্থনীতিও কি তাদের গুরুত্ব দেয় বাংলার বুকে? তাদের জন্য লেখা হয় কোনও প্রেমের গান? হিন্দি ও ভোজপুরি গানের বাজার সম্ভবত বাংলার সবথেকে বেশি। কিন্তু বাবুরা পার্টির বিশিষ্ট ক্ষেত্র ছাড়া ভোজপুরি বোঝেনও না, ভোজপুরি খোঁজেনও না–তাই আপাতত সেটি বাদ রাখা গেল। হিন্দি গানের কী অবস্থা?

বর্তমানে হিন্দি গানের যে দৈত্যপ্রতিম পরিবেশক বলিউড, কর গোনা কয়েকটি সিনেমা ছাড়া সেখান থেকে ‘অপর’ লিঙ্গের গান, যা আবার জনপ্রিয়, খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সিনেমার ক্ষেত্রটিও তাই। যুক্তি উঠতে পারে প্রেমের গানের আবার লিঙ্গ ভেদ কী? এ যুক্তি নতুন নয় বহু পুরনো। কিন্তু হিন্দির ক্রিয়ায় লিঙ্গের বাইনারি বসানো রয়েছে। গানের ভাবেও। ম্যাসকুলিন এবং ফেমিনিন–এই দুই গোত্রের মধ্যে তাঁকে পড়তেই হবে। এছাড়াও গানের চিত্রায়ণ এতটাই মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছে আপামরের, যে সে গান নিজের বলে মনে করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে অপর লিঙ্গের মানুষদের। বাংলা সিনেমার জগতেও এক দুটি ছাড়া সেভাবে প্রয়াস হয়নি, হলেও জনপ্রিয় হয়নি। প্রশ্ন থাকেই–কেন হল না? শুধুই দর্শক-শ্রোতাদের দায়? নাকি চেষ্টারও কি অভাব ছিল? এমনকি উপহারের যে চল আমরা দেখি–তার কটা একজন ‘অপর’ লিঙ্গ রাজনীতির মানুষের রুচির ওপর নির্ভর করে বানানো? টেডি বিয়ারের প্রতিটি ফ্যাশন পর্যন্ত লিঙ্গগত ভাবে ‘স্ট্রেইট’, ‘মেইনস্ট্রিম’। একজন কুইয়ার লিঙ্গের মানুষকে কেন তা কিনতে বাধ্য করা হবে?

বয়স্ক মানুষদের প্রেম—কথাটাতেই যেন একটা নেতিবাচক ইঙ্গিত রয়েছে। মানুষ সচেতন হয়েছে, তাদের এইসব কথা শুনতে এবং পর্দায় দেখতে খুবই ভালো লাগে। আলোচনায় আসর জমে। বেড়া ভাঙার যে বুলি আজকের দিনে ক্রমাগত শুনতে হয়, সামন্ত্রতান্ত্রিক বেড়া ভেঙে ফেলার উদযাপন নাকি আজ, প্রশংসনীয়–সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হয় যখন সেই বেড়াভাঙার যুক্তিও এক বিশেষ শ্রেণির সুবিধা অনুযায়ী বৈধ হয়। ‘বয়স্ক’-র অর্থ কী? বয়সের কারণে মানুষকে অপর করে তোলাও কি সামন্ততান্ত্রিক নয়? তাই ভ্যালেনটাইনস ডে মুষ্টিমেয় শ্রেণির হয়ে থেকে যায়, মানুষের উদযাপন সে হয়ে উঠতে পারে না। অনেকেই সমর্থন করেন আজকাল। কিন্তু কোনও আত্মীয়র ক্ষেত্রটিতে এই সমর্থন বাতাসে মিলায়। এ কেমন সমর্থন?

উপহারের যুক্তিটি এই ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এবং সর্বোপরি প্রেম উদযাপন করা দুই ‘বয়স্ক’কে, ঘনিষ্ঠদের স্বীকৃতি পেলেও, পাবলিক প্লেসে রেস্তোরাঁ থেকে রাস্তায় কী দৃষ্টি সহ্য করতে হবে, আদৌ তা তাঁদের উদযাপনের আনন্দ বিন্দুমাত্রও নিতে দেবে কিনা–এও ভাববার বিষয়। সেক্ষেত্রে কীভাবে ভ্যালেণ্টাইনস ডে কে মানুষের উৎসবের মধ্যে ফেলা যাবে? এছাড়াও বাজার সর্বস্ব অর্থনীতির ‘দামী’ প্রেমের উদযাপন লিঙ্গ, বর্ণ, বয়েস নির্বিশেষে অর্থনৈতিক ক্ষমতা যাদের নেই, ক্রেতা হওয়ার ন্যূনতম সাধ্য যাদের নেই, তাদের আলাদা করে রাখে। চলতি পেটিএমের বিজ্ঞাপন তার অন্যতম উদাহরণ।

একদিকে সামন্ততান্ত্রিক ভয়ভীত প্রেম, অপরদিকে ক্রেতানির্দিষ্ট উদযাপন–এই দুই মেইনস্ট্রিমের বাইরে মানুষের প্রেম নিয়ে চর্চা কোথায়? তবে আশার বিষয় বর্তমানে টিণ্ডার বা কিউপিড বা শাদি ডট কমের মতো ডেটিং অ্যাপ ও ম্যাট্রিমনি সাইটগুলি একে একে এই দাবি নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে। দীর্ঘদিনের চাপা পড়া কণ্ঠ একটু একটু করে জায়গা বুনছে নিজের। এতে ভার্চুয়াল জগতে সামাজিক চোখ রাঙ্গানির নাগালের বাইরে ব্যক্তিগত ভাবে বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, যৌনতা উদযাপনের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। এসবই প্রাথমিক স্তরের কাজ যদিও। তবু স্বীকৃতি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সমাজের বিষদৃষ্টির বাইরে নিজের মতো করে নিজের জীবনের স্বাদ নেওয়াটুকুর সুবিধা পাওয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আজ প্রেমের উদযাপনের দিন। বেড়া ভাঙার দিন—মেনে নিলাম। এমন দিনে আমাদের নিজস্ব সামাজিক ট্যাবু গুলো ভাঙার মধ্যে দিয়েই না হয় প্রেমের উদযাপন হোক। যাতে আমাদের উদযাপন এক বিরাট সংখ্যক মানুষের অপরায়নের মূল্যে না হয়, যাতে প্রেম বৈধের বেড়া ভেঙে মানুষের হয়ে ওঠে—টাকা পয়সা খরচ না করেও এমন একটা শপথ নেওয়া যেতেই পারে আজ। বিশেষত, “সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই” পক্তিটি যখন বাংলাতেই লেখা হয়েছিল প্রেমের গান গাইতে গিয়েই।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।