খসে গেছে কত মুখ! স্মৃতিতে আজও অক্ষয় মহিষাদলের এই নিজস্ব কার্নিভাল!

Durga Puja 2023 : নন্দঢাকি একপ্রকার আমাদের অগোচরে চলে গেছিলেন। তারপর একদিন খবর এল নন্দঢাকি মারা গেছেন।

Madhurima Pattanayak
৪ মিনিট
খসে গেছে কত মুখ! স্মৃতিতে আজও অক্ষয় মহিষাদলের এই নিজস্ব কার্নিভাল!

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মহিষাদলে। বাড়ির খুব কাছেই একটা সাদামাটা পুজো হয়। এই পুজো আমার ছোটবেলার পুজো। আমার কিশোরী বেলার পুজো। যে ক'টা দিন বাড়ির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে ছিলাম, সেই ক'টা দিনের পুজো। আমাদের এই পুজো বাড়ি ফেরার গল্প। বাড়ি না ফেরারও গল্প। চিরবিচ্ছেদের গল্প। ফিরে আসা ও ছেড়ে চলে যাওয়ার গল্প। এ পুজো যেন আমাদের নিজস্ব 'অক্ষয় মালবেরি'।

আমাদের পুজোয় তথাকথিত কোনও থিম নেই। পুরনো ক'টা চেনা মুখের সঙ্গে দেখা হবে। সমস্ত দূরত্ব ঠেলে যখন পরবাস থেকে বাড়ি ফিরব, সেই ক'টা চেনা মুখ জিজ্ঞাসা করবে কবে এলাম, কতদিন আছি। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে ক'টা মানুষ পুজো দিতে আসবে। পাড়ভাঙা শাড়ি আর সিঁদুরের টিপ পরে ঠাকুরকে গড় করবে। তারপর ঠাকুরের সামনে নাক মুলবে, কান মুলবে। পরিবারের মঙ্গলকামনা করবে। হয়তো এটাই আমাদের পুজোর 'থিম'।

আমাদের পুজোয় উমার সামনে দাঁড়িয়ে অশীতিপর বৃদ্ধ বামুন অভিযোগ-অনুযোগও জানাতে পারেন। মায়ের কাছে সন্তান নালিশ জানাবে, এ আর কী এমন বড় কথা! আবার তাঁর দিকে আঙুল তুলে, ধমক-ধামকও দেন বৃদ্ধ। সন্তানকে স্নেহের বশে যেমনটা করেন মা-বাবা। তারপর নালিশ কিংবা শাসনের পর্ব শেষ হলে, আবার আনন্দে মৃদুচালে কোমর দুলিয়ে দেবীর আরতিতে ব্যস্ত হয়ে উঠবেন তিনি। আর বিসর্জনের আগে চোখের কোণ মুছে উমাকে জানাবেন, হয়তো পরের বছর থেকে আর উমার সঙ্গে দেখা হবে না তাঁর। উমার পুজো, তাঁকে ভক্তিজ্ঞাপন যেন এই বৃদ্ধের কাছে এখনও এক কার্নিভাল। এখানে কোনও কড়া অনুশাসন নেই। কিন্তু আনন্দ আছে। আছে গ্রাম্য সারল্য। আছে মা আর সন্তানের মধ্যে অমোঘ কোন পিছুটান।

মহিষাদল জায়গাটা এখন মফসসলে পরিণত হলেও (মতান্তরে জনপদ), আমি যখন জন্মেছিলাম তখন জায়গাটা ধ্যাড়ধেড়ে গ্রাম। টিমটিম করে হাতে গোনা কয়েকটা পুজো হতো। এখন অবশ্য পুজোর সংখ্যা বেড়েছে। বেশ কিছু জায়গায় আবার 'থিমপুজোর' কনসেপ্টও এসেছে। কিন্তু থিম পুজো বাদ দিলে, যে ক'টা খুব সাধারণ পুজো এখনও হয়, তাদের মধ্যে আমাদের এই পুজো একটি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সর্বজয়া নয়, আসলে ইন্দির ঠাকরুনেরই সন্তান দুর্গা...

Satyajit Ray Pather Panchali: দুর্গার মতো দিদিকে ভোলা যায় না। আসলে দুর্গাই একমাত্র দিদি যার অপুর মতো হাজার হাজার ভাই আছে।

থিম দূরের কথা, কয়েকজন লোক মিলে চাঁদা তুলে এই পুজোর আয়োজন করেন। তারপর পুজোর ক'টা দিন নিজেরাই খেটেখুটে পুজোর নিয়ম-কানুন, আনন্দ, হাসি-ঠাট্টা জিইয়ে রাখেন। কোনও এক বছর তো নিন্দুকে রটাল, আমাদের পুজোটাই নাকি উঠে যাচ্ছে।

তা দুগগা দুগগা করে এ বছরও আমাদের দুগগা পুজোটা হচ্ছে। অন্যান্য বছরের মতোই। শুধু প্রতি দশমীতে যে বৃদ্ধরা আগামী বছর পুজোটা আদৌ হবে কিনা, তাই ভেবে চিন্তা করতেন, কিংবা শুকনো গলায় বলতেন হয়তো এই পুজোই তাঁদের জীবনের শেষ পুজো, তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু মুখ আর নেই।

আমাদের এই পুজোরই এক সদস্য, পুজোর ওই ক'টা দিন দিন-রাত এক করে পুজোর প্রতিটা রীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। তাঁর একটু 'রাম'-নামের অভ্যেস ছিল (মতান্তরে বদঅভ্যেস)। পুজোর দিনগুলোও বাদ যেত না। আর আমাদের 'বাঙালি ভার্সনের' শক্তিরূপিণীদের যেহেতু মদ-মাংসে কোনওদিনই বিশেষ আপত্তি ছিল না, আমি তাঁকে 'রামনামের' জন্য কীভাবেই বা কাঠগোড়ায় তুলতে পারি?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মৃৎশিল্পীর ভুলে দেবী হয়ে গেলেন নীল, কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজোর ইতিহাস আজও বিস্ময় জাগায়

Durgapuja 2022: নদিয়া জেলার বহু বনেদিবাড়ি যুগ যুগ ধরে শামিল হচ্ছে এই উৎসবে। আজ মায়ের বিদায়-লগ্নে ছুঁয়ে দেখা সেইসব ঐতিহ্যকে।

তা কোনও এক বছর ভরপেট 'রামনাম' করে তিনি বসলেন সন্ধিপুজোতে। হাত লাগালেন একশো আটটা পদ্মের কুঁড়িকে ফুটিয়ে তোলার কাজে। কিন্তু মুশকিল হলো তিনি কিছুতেই আর বুঝতে পারেন না, ফুলগুলো সোজা না উলটো। এক-একটা ফুল হাতে নিয়ে একবার সোজা, তো একবার উলটো করে ধরে দেখতে লাগলেন। এ সবের মাঝেই, তাঁর হঠাৎ মনে হলো আস্ত দেবীঘটটাই উলটো করে বসানো। তিনি রওনা দিলেন দেবীঘট সোজা করতে। কোনও রকমে ক্ষান্ত করা হলো তাঁকে। তখন সম্ভবত আমি স্কুলের গণ্ডি পেরোব পেরোব করছি। কিংবা সেই বছরেই কলেজে উঠেছি। এসবের মাঝেও কিন্তু তিনি নিজের দায়িত্ব থেকে একচুলও নড়েননি কোনওদিনই।

তারপর অনেকটা বছর কেটে গেছে। গত পুজোয় জানতে পারলাম সেই ভদ্রলোক আর বেঁচে নেই। অশৌচের কারণে তাঁর পরিবারের কেউই পুজোয় আসতে পারেননি। সে বছর পুজোয় থিম ছিল না বটে, তবে বেখাপ্পা মণ্ডপসজ্জা আর অনাবশ্যক চকমকি আলোরও কমতি ছিল না। কিন্তু এত কিছুর পরেও কেমন খাঁ-খাঁ করছিল সবটা। একজন অন্য পরিবারের লোক, যার সঙ্গে আমার পুজোর ওই ক'টা দিনই সকাল-বিকেল দেখা হয়, পুজোয় তাঁকে না দেখতে পেয়ে মনে হয়েছিল আমার ছোটবেলার পুজো থেকে কী যেন একটা খসে পড়েছে৷ হারিয়ে গেছে চিরতরে। সে সব আর ফিরে আসবে না।

আমি যখন আরেকটু ছোট ছিলাম, তখন নন্দঢাকি আমাদের পুজোয় ঢাক বাজাতেন। বিসর্জনের পরে দেখতাম কাঁধে ঢাক তুলে, মোরামের লাল রাস্তা ধরে নিজের গ্রামের পানে পাড়ি দিয়েছেন তিনি। গাছপালার ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে শরৎ-সূর্যের বিষণ্ণ রোদ তাঁর উপর হেলে পড়ছে। বুক-চিনচিনে মৃদু উত্তরে বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে তাঁর সারা শরীর। শুকনো পাতা গাছ থেকে খসে পড়ছে পায়ের কাছে। আর নন্দঢাকি ঝাপসা হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছেন অনেক দূরে।

নন্দঢাকি একপ্রকার আমাদের অগোচরে চলে গেছিলেন। তারপর একদিন খবর এল নন্দঢাকি মারা গেছেন।

তারপরও বহু মুখ অগোচরে চলে গেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। কত স্মৃতি, কত হাসি, কত আনন্দ-অভিমান। শরৎ এসে সে সব মনে করিয়ে দেয়। আমরা যারা ঘর-বাড়ি-স্বজনকে ছেড়ে চিরতরে নিরুদ্দেশের পানে পাড়ি দিয়েছিলাম, পাড়ি দেওয়ার আগে সেসব অক্ষয়-স্মৃতি কাঁধে তুলে একটু একটু করে ঝাপসা হয়ে গেছিলাম, নন্দঢাকির মতই।

"সামান্য এই চলে যাওয়া নিয়ে মনে কোনও সন্দেহ ছিল না। কিন্তু আজ জানি, ওই চলে যাওয়াটা ছিল ঠিক মৃত্যুর মতো। মৃত্যুকালে কেউ কি বোঝে, এই যে চলে যাচ্ছে, আর ফিরবে না! তাকে বারবার সবাই বলছে, আবার জন্মাবি, আবার ফিরে আসবি। এই বাড়ি ঘর নদী নক্ষত্র সব তো রইল তোর।"

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।