হাসিমুখে ভাতের থালা হাতে অফিস পাড়ার নন্দিনী, নিশ্চিন্ত চাকরি ছেড়ে কেন বেছে নিলেন এই পথ

Pice hotel Nandini Ganguly : নিশ্চিন্ত চাকরি ছেড়ে বাবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাইস হোটেল চালাচ্ছেন মমতা

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
হাসিমুখে ভাতের থালা হাতে অফিস পাড়ার নন্দিনী, নিশ্চিন্ত চাকরি ছেড়ে কেন বেছে নিলেন এই পথ

চৌকো করে কাটা কলাপাতা, তাতে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। সঙ্গে আলুভাজা, বেগুন ভাজা, করলা ভাজা, ডাল, সবজি। ভরপেট থালি মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকায়। চাইলে কেউ জুড়ে নিতে পারেন মাছ, মাংস, ডিম। মোট কথা জলের দরে পেটচুক্তি আহার। হাসিমুখে পসরা সাজিয়ে রয়েছেন মমতা। বন্দ্যোপাধ্যায় নয়, গঙ্গোপাধ্যায়। অফিস পাড়ার পরিচিত মুখ এখন ইনিই। পরনে জিনস্ আর কালো টপ। গলায় ঝুলছে ব্লু টুথ স্পিকার। শিক্ষিতা, আধুনিক তরুণী। ডালহৌসি চত্বরে সবাই চেনেন ‘ম্যাডাম’ নামে। দুপুরে খিদের মুখে ম্যাডাম থেকে ইনিই রোজদিন হয়ে উঠছেন ঘরের মেয়ে। ভাত বেড়ে খেতে দিচ্ছেন মা-জেঠু-কাকুদের।

ছাপোষা একটা ভাতের হোটেল। কলকাতা জিপিও-এর ঠিক উল্টো ফুটে। মাথার ওপর পাকা ছাউনি অবধি নেই। অথচ উপচে পড়ছে ভিড়। ‘একটা মাংস ভাত’ অথবা ‘ভেজ থালি একটা’ এমন অজস্র হুকুমের চটজলদি জোগান সেখানে। যদিও শুধু এটুকু পরিচয় দিলেই গল্প ফুরোয় না। মমতা গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে নন্দিনীর গল্প আরও অনেকটা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তারুণ্যে হার মানবে নামজাদা রেস্তোরাঁ, কলকাতার এই পাইস হোটেল ১০৭ বছরের বিস্ময়

Pice Hotel : কালীঘাট মন্দির থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে শতাব্দী প্রাচীন পাইস হোটেল তরুণ নিকেতন

‘রক্তকরবী’র নয়, আমার আপনার ঘরের মেয়ে নন্দিনী। নন্দিনী নামটা আদরের ডাকনাম। খাতায় কলমে নাম মমতা। বয়স মেরেকেটে সাতাশ আটাশ। পড়াশোনা করেছে ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে। চাকরিও করত ব্যাঙ্গালোরে। অথচ সেসব কিছু ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে এখন এক চিলতে একটা ভাতের হোটেলেই রুজিরুটি। কিন্তু কেন হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিল নন্দিনী? শুনতে রূপকথা মনে হলেও এই নন্দিনীর গল্পটা ঘোর বাস্তব। হঠাৎ করেই আলোর খুব কাছাকাছি উঠে এসেছেন যিনি। অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষায় বলতে গেলে, এখন ভাইরাল নন্দিনী ওরফে মমতা। ভাইরাল তার এক চিলতে ভাতের হোটেলটিও। ভেজ থালি ৩০, দুরকম বাড়তি ভাজা নিলে দাম বেড়ে হয় ৪০। চারা পোনা মাছ ভাত ৭০, রুই নিলে ৮০। আর চিকেন ১০০, মাটন ভাত ২০০ টাকা।

বাবা-মা-মেয়ে, তিনজনের অফিস পাড়ায় ছোট্ট গোছানো সংসার এই হেঁশেল। সকাল নটা থেকে শুরু হয়ে যায় রান্নার তোড়জোড়। নিজের হাতে রোজদিন বেলেঘাটা থেকে বাজার করেন নন্দিনীর বাবা চক্রধারী গাঙ্গুলি। মা বিনাদেবী থাকেন কোটা বাটার দায়িত্বে। এরপর মাঠে নামে মমতা। রান্নায় বাবার সঙ্গে হাত লাগায় সে। তারপর নিজে হাতে ভাত বেড়ে খেতে দেন সকলকে। করোনায় রবারের ব্যবসা ডুবে যায় নন্দিনীর বাবা। নন্দিনী তখন রাজ্যের বাইরে। সংসার চালানোর দায় হয়ে উঠছে দেখে বাধ্য হয়েই অফিস পাড়ায় এসে এক চিলতে দোকান খোলেন চক্রধারীবাবু। নন্দিনী বাদে বাকি দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন ইতিমধ্যেই। ফলে দোকানের দায়-দায়িত্ব সবই সমলাতে থাকেন স্বামী স্ত্রী মিলে। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন স্ত্রী বিনা গাঙ্গুলি। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে দিন পনেরোর ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরে নন্দিনী। ব্যাস গল্পটা ঠিক এরকম হয় হয়তো আজকের এই ছবিটার সাক্ষী হতে পারতাম না আমরা কেউই। গল্পের মোড় বদলের শুরু ঠিক এর পর থেকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
‘পেটচুক্তি’ খাওয়া, কলকাতার এই পাইস হোটেলগুলিতে জেগে স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প

Pice hotel: বাঙালি খানার আসল স্বাদ নিয়ে আজও বহাল কলকাতার পাইস হোটেলগুলি

বাবা মায়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দোকান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন নন্দিনী। নিশ্চিন্ত চাকরির মায়া ত্যাগ করে কঠিন জোয়াল তুলে নেয় কাঁধে। নন্দিনীর কথায়, “আমাদের জীবনে সামনের মানুষটি একবার পিছন থেকে বলতে হয়, এগিয়ে যাও, আমি আছি সঙ্গে। এটুকুই ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য যথেষ্ট। আমিও শুধু এটুকু ভরসায় দিতে চেয়েছিলাম বাবাকে। ভাইরাল হওয়ার কথা তো দিন পনেরো আগেও ভাবিনি।”

হ্যাঁ ঠিকই, জীবনের চাকা ঘোরানোর জন্য নেপথ্যে যিনি বসে আছেন তাঁর খবর আমরা কেউ রাখিনা। কিন্তু আমরা কাজ করি। ভালো কাজ,ভালকিছু ফিরিয়ে দেবে এমনটাই তো কাম্য। নন্দিনী তাই ব্যতিক্রম নন। আবার ব্যতিক্রমও। ব্যস্ত অফিস পারে যেখানে একের পর এক পুরুষ দোকানিদের ভিড় সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সে। ছক ভাঙছে এভাবেই। সে মনে করে না পুঁথিগত বিদ্যা কেবল অফিসের দরজায় শেষ হয়, বরং বিশ্বাস করে সেই শিক্ষা জীবনের। যা পথ চলতে শেখায়। লড়াই করতে শেখায়। নন্দিনী নিজে মুখেই বলে, “আমি খুব ভালো করেই জানি আজকের এই যে ফেম, তা যেমন হুট করেই এসেছে ঠিক তেমনই আবার হুট করেই চলে যাবে। থেকে যাবে কেবল রোজকার লড়াইটা। আর আমাদের এই ভাতের হোটেলটা। তাই লড়াইয়ের ময়দানে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতেই হবে।”

আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে নন্দিনীর মতো মেয়েরা সত্যিই উদাহরণ। যে ভেঙে পড়া সমাজের চোখে চোখ রেখে শিখিয়ে দিচ্ছে এর নাম আসল লড়াই। ছোট্ট একটা স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরেই পথ চলা যায়। রাতারাতি ভাইরাল হওয়া নন্দিনী তাই দিনের শেষে অফিস পাড়ার অন্নপূর্ণা। গরম কড়াইয়ে মাছ ভাজতে দিয়েই সে খোঁজ নিচ্ছে কারোর ভাত লাগবে কিনা। ফাঁক পেলেই এসে খুন্তি নাড়ছে, পাই পয়সার হিসেব রাখছে, আবার হাসি মুখে সামলাচ্ছে ক্রেতাদের ভিড়। এই মমতা ওরফে নন্দিনীদের বড্ড প্রয়োজন বর্তমান সময়ের। প্রয়োজন প্রতিটি পরিবারের। “কুছ পরোয়া নেই, এগিয়ে যাও, সঙ্গে আছি”, এই ডাকটুকুই তো জীবন বদলের জন্য যথেষ্ট।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।