রোজ নিয়ম করে হাঁটাহাঁটি মৃত‍্যুকে ঠেলে দেবে দূরে, প্রমাণ মিলছে গবেষণায়

সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বেশিরভাগ মানুষ যদি দিনে অন্তত অতিরিক্ত ১০ মিনিট হাঁটার অভ্যেস তৈরি করতে সক্ষম হন, তাহলে প্রতি বছর প্রায় ১,১০,০০০ জন মৃত্যুর কোপ থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

Arunima Mukherjee
৪ মিনিট
রোজ নিয়ম করে হাঁটাহাঁটি মৃত‍্যুকে ঠেলে দেবে দূরে, প্রমাণ মিলছে গবেষণায়

কথায় আছে, বাঙালি নাকি সামান্য অসুখ হলেই সাধারণত দু'টি বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে থাকে। প্রথমটা হলো, বেশি করে জল খাওয়া আর দ্বিতীয়টি হলো, সকালে ঘুম থেকে উঠেই হাঁটতে যাওয়া। পর্যাপ্ত পরিমাণে জলের জীবনে কী ভূমিকা রয়েছে, তা না হয় অন্য কোথাও বলা যাবে, আপাতত মানুষের জীবনে হাঁটার গুণাগুণ নিয়ে দু'-একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা জানিয়ে দেওয়া যাক।

একথা জানলে আপনি হয়তো অবাক হবেন, জামা ইন্টারনাল মেডিসিনের (JAMA internal medicine) একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বেশিরভাগ মানুষ যদি দিনে অন্তত অতিরিক্ত ১০ মিনিট হাঁটার অভ্যেস তৈরি করতে সক্ষম হন, তাহলে প্রতি বছর প্রায় ১,১০,০০০ জন মৃত্যুর কোপ থেকে রক্ষা পেতে পারেন। জামা-র এই গবেষণাটিতে এই প্রথমবার অ্যাক্সিলোমিটার বা অ্যাক্টিভিটি ট্র‍্যাকারের সাহায্য নেওয়া হয়। অনেকেই মনে করে থাকেন, হাঁটা কিংবা কায়িক পরিশ্রমের সঙ্গে মানুষের আয়ুর সম্পর্ক একেবারেই সমানুপাতিক। অর্থাৎ, মানুষ যত বেশি কায়িক পরিশ্রম করবে, ততই সে পরমায়ু লাভ করতে সক্ষম হবে। এই কথাটিও আবার ঠিক নয়। সেন্টার ফর ডিসিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (Centre for Disease Control and Prevention) মত অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি প্রতি সপ্তাহে ১৫০ মিনিট কায়িক পরিশ্রম করতে পারেন, তবে তিনি নানা রোগের হাত থেকে নিস্তার পেতে পারেন। কিন্তু আমেরিকার একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২৫ শতাংশ মানুষই এই পরিমাণ কায়িক পরিশ্রম করতে অক্ষম।

তবে একথাও সত্য, সবার পক্ষে নিয়ম করে ব্যায়াম করা সম্ভবপর নয়, বরং রোজ সকালে হাঁটা অনেক বেশি সহজ। তাই চলুন, চটপট দেখে নেওয়া যাক নিয়মিত হাঁটা কীভাবে মানবদেহে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

১। হার্ট ভালো থাকে: হৃদপিণ্ড ভালো রাখার জন্য হাঁটা খুবই উপকারী। ভারতে বার্ষিক প্রায় ১২ মিলিয়ন মানুষ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তাই, ভারতের মতো দেশে প্রতিটা মানুষের জীবনে হাঁটা কিংবা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা কতখানি জরুরি, তা বলার অবকাশ রাখে না। দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে সিমানে নামের এক গোষ্ঠীর কথা জানা যায়, যে গোষ্ঠীতে ৮০ বছর বয়সি ব্যক্তির হার্ট একজন ৫০ বছর বয়সি মানুষের ন্যায় সক্ষম এবং এর মূল কারণ হল, এরা প্রায় গোটা দিনটাই শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকে।

২। মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে: সারাদিন যদি কেউ শুয়ে-বসে কাটায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই শরীরে পেশির শক্তি কমে যায় এবং এর ফলেই মানব মস্তিষ্ক ক্রমে শুকিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু আমরা যখন হাঁটাহাঁটি করি বা অন্য কোনওভাবে সক্রিয় থাকি, তখন পেশি থেকে উৎপন্ন মলিকিউল বা অণু আমাদের মস্তিষ্ক সচল রাখতে সহায়তা করে। এর মধ্যে আবার একটি অণু মস্তিষ্কতে রক্ত চলাচলে সাহায্য করে, তাই নিয়মিত হাঁটলে মস্তিষ্কও সজাগ থাকে ও শক্তিশালী হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পাতে এই খাবার থাকলেই ক্যানসারকে চিরবিদায়! বলছে গবেষণা

নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে শরীরচর্চা, ভিটামিন ডি এবং ওমেগা থ্রি একসঙ্গে লক্ষণীয় মাত্রায় কমিয়ে দেয় ক্যানসারের সম্ভাবনা।

৩। হজমে সাহায্য করে: খাদ্যের পরিপাকের ক্ষেত্রে হাঁটার বিশেষ ভূমিকা লক্ষ করা যায়। মানুষ যখন হাঁটাহাঁটি করে, তখন খাবার হজম হয় অনেক বেশি। তাই বেশিরভাগ চিকিৎসক রাত্রের খাবারের পর খানিকটা হাঁটতে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আবার ডায়েটেশিয়ানরাও এই একই পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও চিকিৎসকরা ওষুধের থেকে হাঁটার ওপর বেশি জোর দিয়ে থাকেন।

৪। বিষণ্ণতা কাটাতে সাহায্য করে: আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন বা দুরারোগ্য ব্যাধিগুলির মধ্যে বিষণ্ণতা অন্যতম। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুয়ে-বসে দিন কাটানো মানুষদের মধ্যে বেশি বিষণ্ণতার প্রভাব লক্ষ করা গেছে। রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা থেকে বিষণ্ণতার সৃষ্টি হয় বলে অনেকে ধারণা করেছেন। তাই কেবল যে শারীরিক ক্ষেত্রে হাঁটার কার্যকারিতা সীমাবদ্ধ রয়েছে তা নয়, হাঁটলে ভালো থাকবে আপনার মনও।

৫। সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে: এই বিষয়টি একেবারে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। শুধু তাই নয়, প্রত্যহ হাঁটাহাঁটি করলে আপনার সৃজনশীলতাও অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এক জায়গায় হতাশ হয়ে বসে না থেকে যদি সেই সময় একটু হাঁটা যায় কিংবা খানিক অন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসা যায়, তাহলে সমস্যা থেকে শীঘ্র মুক্তি পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঔপন্যাসিক স্টিফেন কিং-এর কথা, তিনি নিয়মিত প্রচুর পরিমাণে হাঁটেন। এছাড়াও শোনা যায়, দার্শনিক এবং লেখক বার্ট্রান্ড রাসেলও না কি যখন হাঁটতে বেরতেন, তখন সঙ্গে নিয়ে যেতেন এক টুকরো কাগজ, নিজের চিন্তা-ভাবনা তৎক্ষণাৎ লিখে রাখার জন্য। এছাড়াও বলা যায়, নিয়মিত হাঁটতে বের হলে আপনি নিমেষেই বন্ধু বানাতেও সক্ষম হতে পারেন।

৬। শরীরের গঠন অটুট রাখে: বর্তমান সময়ে মানুষের অধিকাংশ সময়ই কাটে কম্পিউটারের সামনে বসে। এর ফলে অল্প বয়সেই মানুষের মধ্যে পিঠে এবং কোমরে ব্যথার প্রবণতা দেখা যায়। আসলে মানুষের শরীর এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকার মতো করে গঠিত হয়নি, তাই শুয়ে-বসে থাকলে এই ধরনের অসুবিধাগুলির সম্মুখীন মানুষকে হতে হবেই। তাই কাজের মাঝেও যদি একটু হেঁটে আসা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের সমস্যা থেকে দূরে থাকা সম্ভব হবে।

তবে আপনার যদি হাঁটার অভ্যেস একেবারেই না থাকে, তবে, প্রথমে ১০ মিনিট করেই এই অভ্যেস শুরু করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সময় করে দিনে তিনবার হাঁটলেই সমস্যার সমাধান মিলবে। তাও যদি আপনি ১০ মিনিট সময় বের করতে না পারেন, তাহলে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু পরিবর্তন করতে পারেন। যেমন,

১) লিফটের বদলে সিঁড়ির ব্যবহার করতে পারেন।

২) হেঁটে বাস-ট্রাম ধরে অফিসে যান।

৩) বাড়ি ফেরার পথে খানিকটা রাস্তা আগে নামুন, বাকি রাস্তা হেঁটে ফিরুন।

৪) নিজের পোষ্যকে নিয়ে নিয়মিত হাঁটতে বেরিয়ে পড়ুন।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।