রোজ নিয়ম করে হাঁটাহাঁটি মৃত‍্যুকে ঠেলে দেবে দূরে, প্রমাণ মিলছে গবেষণায়

কথায় আছে, বাঙালি নাকি সামান্য অসুখ হলেই সাধারণত দু'টি বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে থাকে। প্রথমটা হলো, বেশি করে জল খাওয়া আর দ্বিতীয়টি হলো, সকালে ঘুম থেকে উঠেই হাঁটতে যাওয়া। পর্যাপ্ত পরিমাণে জলের জীবনে কী ভূমিকা রয়েছে, তা না হয় অন্য কোথাও বলা যাবে, আপাতত মানুষের জীবনে হাঁটার গুণাগুণ নিয়ে দু'-একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা জানিয়ে দেওয়া যাক।

একথা জানলে আপনি হয়তো অবাক হবেন, জামা ইন্টারনাল মেডিসিনের (JAMA internal medicine) একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বেশিরভাগ মানুষ যদি দিনে অন্তত অতিরিক্ত ১০ মিনিট হাঁটার অভ্যেস তৈরি করতে সক্ষম হন, তাহলে প্রতি বছর প্রায় ১,১০,০০০ জন মৃত্যুর কোপ থেকে রক্ষা পেতে পারেন। জামা-র এই গবেষণাটিতে এই প্রথমবার অ্যাক্সিলোমিটার বা অ্যাক্টিভিটি ট্র‍্যাকারের সাহায্য নেওয়া হয়। অনেকেই মনে করে থাকেন, হাঁটা কিংবা কায়িক পরিশ্রমের সঙ্গে মানুষের আয়ুর সম্পর্ক একেবারেই সমানুপাতিক। অর্থাৎ, মানুষ যত বেশি কায়িক পরিশ্রম করবে, ততই সে পরমায়ু লাভ করতে সক্ষম হবে। এই কথাটিও আবার ঠিক নয়। সেন্টার ফর ডিসিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (Centre for Disease Control and Prevention) মত অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি প্রতি সপ্তাহে ১৫০ মিনিট কায়িক পরিশ্রম করতে পারেন, তবে তিনি নানা রোগের হাত থেকে নিস্তার পেতে পারেন। কিন্তু আমেরিকার একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২৫ শতাংশ মানুষই এই পরিমাণ কায়িক পরিশ্রম করতে অক্ষম।

তবে একথাও সত্য, সবার পক্ষে নিয়ম করে ব্যায়াম করা সম্ভবপর নয়, বরং রোজ সকালে হাঁটা অনেক বেশি সহজ। তাই চলুন, চটপট দেখে নেওয়া যাক নিয়মিত হাঁটা কীভাবে মানবদেহে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

আরও পড়ুন: পাতে এই খাবার থাকলেই ক্যানসারকে চিরবিদায়! বলছে গবেষণা

১। হার্ট ভালো থাকে: হৃদপিণ্ড ভালো রাখার জন্য হাঁটা খুবই উপকারী। ভারতে বার্ষিক প্রায় ১২ মিলিয়ন মানুষ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তাই, ভারতের মতো দেশে প্রতিটা মানুষের জীবনে হাঁটা কিংবা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা কতখানি জরুরি, তা বলার অবকাশ রাখে না। দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে সিমানে নামের এক গোষ্ঠীর কথা জানা যায়, যে গোষ্ঠীতে ৮০ বছর বয়সি ব্যক্তির হার্ট একজন ৫০ বছর বয়সি মানুষের ন্যায় সক্ষম এবং এর মূল কারণ হল, এরা প্রায় গোটা দিনটাই শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকে।

২। মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে: সারাদিন যদি কেউ শুয়ে-বসে কাটায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই শরীরে পেশির শক্তি কমে যায় এবং এর ফলেই মানব মস্তিষ্ক ক্রমে শুকিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু আমরা যখন হাঁটাহাঁটি করি বা অন্য কোনওভাবে সক্রিয় থাকি, তখন পেশি থেকে উৎপন্ন মলিকিউল বা অণু আমাদের মস্তিষ্ক সচল রাখতে সহায়তা করে। এর মধ্যে আবার একটি অণু মস্তিষ্কতে রক্ত চলাচলে সাহায্য করে, তাই নিয়মিত হাঁটলে মস্তিষ্কও সজাগ থাকে ও শক্তিশালী হয়।

৩। হজমে সাহায্য করে: খাদ্যের পরিপাকের ক্ষেত্রে হাঁটার বিশেষ ভূমিকা লক্ষ করা যায়। মানুষ যখন হাঁটাহাঁটি করে, তখন খাবার হজম হয় অনেক বেশি। তাই বেশিরভাগ চিকিৎসক রাত্রের খাবারের পর খানিকটা হাঁটতে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আবার ডায়েটেশিয়ানরাও এই একই পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও চিকিৎসকরা ওষুধের থেকে হাঁটার ওপর বেশি জোর দিয়ে থাকেন।

৪। বিষণ্ণতা কাটাতে সাহায্য করে: আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন বা দুরারোগ্য ব্যাধিগুলির মধ্যে বিষণ্ণতা অন্যতম। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুয়ে-বসে দিন কাটানো মানুষদের মধ্যে বেশি বিষণ্ণতার প্রভাব লক্ষ করা গেছে। রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা থেকে বিষণ্ণতার সৃষ্টি হয় বলে অনেকে ধারণা করেছেন। তাই কেবল যে শারীরিক ক্ষেত্রে হাঁটার কার্যকারিতা সীমাবদ্ধ রয়েছে তা নয়, হাঁটলে ভালো থাকবে আপনার মনও।

৫। সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে: এই বিষয়টি একেবারে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। শুধু তাই নয়, প্রত্যহ হাঁটাহাঁটি করলে আপনার সৃজনশীলতাও অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এক জায়গায় হতাশ হয়ে বসে না থেকে যদি সেই সময় একটু হাঁটা যায় কিংবা খানিক অন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসা যায়, তাহলে সমস্যা থেকে শীঘ্র মুক্তি পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঔপন্যাসিক স্টিফেন কিং-এর কথা, তিনি নিয়মিত প্রচুর পরিমাণে হাঁটেন। এছাড়াও শোনা যায়, দার্শনিক এবং লেখক বার্ট্রান্ড রাসেলও না কি যখন হাঁটতে বেরতেন, তখন সঙ্গে নিয়ে যেতেন এক টুকরো কাগজ, নিজের চিন্তা-ভাবনা তৎক্ষণাৎ লিখে রাখার জন্য। এছাড়াও বলা যায়, নিয়মিত হাঁটতে বের হলে আপনি নিমেষেই বন্ধু বানাতেও সক্ষম হতে পারেন।

৬। শরীরের গঠন অটুট রাখে: বর্তমান সময়ে মানুষের অধিকাংশ সময়ই কাটে কম্পিউটারের সামনে বসে। এর ফলে অল্প বয়সেই মানুষের মধ্যে পিঠে এবং কোমরে ব্যথার প্রবণতা দেখা যায়। আসলে মানুষের শরীর এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকার মতো করে গঠিত হয়নি, তাই শুয়ে-বসে থাকলে এই ধরনের অসুবিধাগুলির সম্মুখীন মানুষকে হতে হবেই। তাই কাজের মাঝেও যদি একটু হেঁটে আসা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের সমস্যা থেকে দূরে থাকা সম্ভব হবে।

তবে আপনার যদি হাঁটার অভ্যেস একেবারেই না থাকে, তবে, প্রথমে ১০ মিনিট করেই এই অভ্যেস শুরু করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সময় করে দিনে তিনবার হাঁটলেই সমস্যার সমাধান মিলবে। তাও যদি আপনি ১০ মিনিট সময় বের করতে না পারেন, তাহলে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু পরিবর্তন করতে পারেন। যেমন,

১) লিফটের বদলে সিঁড়ির ব্যবহার করতে পারেন।
২) হেঁটে বাস-ট্রাম ধরে অফিসে যান।
৩) বাড়ি ফেরার পথে খানিকটা রাস্তা আগে নামুন, বাকি রাস্তা হেঁটে ফিরুন।
৪) নিজের পোষ্যকে নিয়ে নিয়মিত হাঁটতে বেরিয়ে পড়ুন।

 

More Articles

;