গোমাংস খাওয়ার অভিযোগ! বাংলার পরিযায়ী শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা! কী করছিল পুলিশ?

Migrant worker Sabir Malik lynched: অভিযুক্তরা খালি প্লাস্টিকের বোতল বিক্রির ভান করে সাবির মালিক এবং তাঁর বন্ধু আসিরুদ্দিনকে একটি দোকানে ডেকেছিল।

inscript
৪ মিনিট
গোমাংস খাওয়ার অভিযোগ! বাংলার পরিযায়ী শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা! কী করছিল পুলিশ?

পশ্চিমবঙ্গের যুবক। কাজ করতে গিয়েছিলেন হরিয়ানায়। ধর্মে মুসলমান। খাদ্যাভ্যাসে গরুর মাংস খাওয়ার ইতিহাস আছে। গরু খাওয়ার সন্দেহে পিটিয়ে মারার নজির তো ভারতবর্ষ দেখেইছে। আকলাখের পর এবার পশ্চিমবঙ্গের সাবির! পরিযায়ী মুসলিম শ্রমিককে পিটিয়ে মারল গো রক্ষক গোষ্ঠী! গত ২৭ অগাস্ট ২২ বছরের সাবির মালিককে চরখি দাদরি জেলায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আবর্জনা কুড়িয়েই সংসার চালাতেন সাবির। হংসওয়াস খুর্দ গ্রামে স্ত্রী এবং দুই বছরের মেয়েকে নিয়ে ছিল তাঁর ছোট্ট পরিবার। সাবিরকে পিটিয়ে মারার ঘটনায় হরিয়ানা পুলিশ দুই কিশোর সহ সাতজনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের সঙ্গে গো-রক্ষক গোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে, বিশদে তদন্ত চলছে।

পুলিশ জানাচ্ছে, সাবিরের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে, একদল যুবক গ্রামে পুলিশকে ডেকেছিল। এই যুবকরা দাবি করেছিল, ওই পরিবারে গরুর মাংস রান্না করে খাওয়া হচ্ছে। পুলিশ ওই মাংস বাজেয়াপ্ত করে তা পরীক্ষার জন্য পাঠালেও পুলিশের দাবি, অভিযুক্তরা আইন হাতে নিয়ে সাবিরকে পিটিয়ে হত্যা করে। সেই সময় অবশ্য পুলিশ কী করছিল সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। সাবিরের আত্মীয়রা বলেছেন, ওই একই দিনে, তাদের থানায় ডেকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তারা গরুর মাংস খান কিনা।

পুলিশ জানাচ্ছে, অভিযুক্তদের নাম অভিষেক, মোহিত, কমলজিৎ, সাহিল এবং রবিন্দর। ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ ধীরাজ কুমারের বক্তব্য, “মঙ্গলবার ২৭ অগাস্ট, একদল যুবক হংসওয়াস খুর্দ গ্রামে কয়েকজন আবর্জনা কোড়ানো সাফাইকর্মীদের পাকড়াও করে। এই যুবকদের অভিযোগ, এই সাফাইকর্মীরা গরুর মাংস খাচ্ছিলেন। ওই একই গ্রামে থাকতেন সাবির। পুলিশকেও ঘটনাস্থলে ডাকা হয়েছিল। পুলিশ ওই গ্রামে গিয়ে তল্লাশির পরে ওইখানে ঝুপড়িতে বসবাসকারী কয়েকজন মানুষকে মাংস রান্না করে খেতে দেখেন। ফরেনসিক এবং ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। মাংসগুলি বাজেয়াপ্তও করা হয় এটা দেখতে যে আসলে সেগুলি সত্যিই গরুর মাংস ছিল কিনা।" রিপোর্ট কিন্তু তখনও আসেনি। অথচ পুলিশের এই নমুনা বাজেয়াপ্ত করে পরীক্ষার জন্য পাঠানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই অভিযুক্তরা সাবির মালিককে ধরে ফেলে এবং ভয়াবহভাবে পেটায়। গণপিটুনিতে সাবিরের মৃত্যু হয়। ওই এলাকায় বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষই ছিলেন পরিযায়ী শ্রমিক।

পুলিশ জানাচ্ছে, অভিযুক্তরা খালি প্লাস্টিকের বোতল বিক্রির ভান করে সাবির মালিক এবং তাঁর বন্ধু আসিরুদ্দিনকে একটি দোকানে ডেকেছিল। সেখানে তাঁদের দু'জনকেই মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। আসিরউদ্দিন ঘটনাস্থল থেকে পালাতেও এই অভিযুক্তরা সাবির মালিককে একটি মোটরবাইকে করে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় এবং সেখানে আবার পেটায়। ওইখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে সাবির যেখানে থাকতেন সেই ঝুপড়ির কাছে তাঁর লাশ পাওয়া যায়।

অভিযোগকারী এবং সাবিরের শ্যালক সুরাজুদ্দিন সরকার ওই একই ঝুপড়িতে থাকেন। তিনি বলছেন, ২৭ অগাস্ট বিকেলে, তিনজন লোক এসে তাঁকে ডেকে বলেছিল যে, প্রচুর বাতিল জিনিস বিক্রির জন্য পড়ে আছে। সাবির তখন তার রিকশা ও ব্যাগ নিয়ে ওই লোকদের সঙ্গে চলে যায়। পরে স্থানীয় বাজার এলাকায় সাবিরের রিকশা পাওয়া যায়। "প্রথমে তাঁকে বাজারের কাছে মারধর করা হয়, তারপর দূরে একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে আরও মারধর করা হয়। বিকেল পৌনে পাঁচটা নাগাদ একটি নালায় তাঁর লাশ পাওয়া যায়। এই দিনের আগে এক দুপুরে আমার বাবা এবং আমাকে স্থানীয় থানায় ডেকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে আমাদের কাছে গরুর মাংস আছে কিনা। আমরা স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, আমরা রান্না করিনা এবং গরুর মাংস এখানে পাওয়াও যায় না। পরে আমার বোন আমাকে জানায় সাবির বেরিয়েছিল কিন্তু ফেরেনি। আমি পুলিশকে জানাই। পুলিশ তাঁর লাশ খুঁজে পায়,” বলেন সুরাজুদ্দিন সরকার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গোমাংস রপ্তানিকারকদের থেকেও ইলেক্টোরাল বন্ডে কোটি কোটি টাকা! কে নিল?

Beef Exporter Electoral Bond: বিজেপি মুখে গো-হত্যা বিষয়ক কড়া নীতির কথা যতই বলুক না কেন গোমাংস রপ্তানিকারকদের থেকে টাকা নিতে কিন্তু কোনও বাধা রাখেনি।

“আমরা গত পাঁচ বছর ধরে এখানে কাজ করেছি। অনেকেই এখানে আমাদের চিনতেন। আমি কখনই ভাবিনি আমাদের সঙ্গে এমনটা হবে। কারও সমস্যা হলে আমাদের বলা উচিত ছিল। আমরা চলে যেতাম। ওকে পিটিয়ে মেরে ফেলল কেন?” প্রশ্ন করেছেন সাবির।

পুলিশ বলছে, “আসামিদের আদালতে হাজির করে পুলিশের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। হরিয়ানায় নির্বাচনের কারণে রাজ্যে আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা চরখি দাদরির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পতাকা মিছিল করছি। এখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং শান্তি ভঙ্গ নেই,” বলেন ডিএসপি।

সাবির পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার মিয়ারভেরির বাসিন্দা। এমন বর্বর ঘটনায় তাঁর পরিবার হতবাক। সাবির গত পাঁচ বছর ধরে বাড়ি থেকে দূরে। প্রতি ছয়-সাত মাস অন্তর বাড়ি ফিরতেন তিনি। গত শুক্রবার নিজের গ্রামে সাবিরের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। সুরাজুদ্দিন জানিয়েছেন, হরিয়ানা পুলিশ বলেছিল সাবিরের পরিবারকে হরিয়ানাতে নিয়ে আসা হোক কারণ তারা চেয়েছিল দেহটি সেখানেই কবর দেওয়া হোক। কিন্তু সুরাজুদ্দিন পুলিশকে অনুরোধ করেন যাতে পশ্চিমবঙ্গেই আত্মীয়দের কাছে দেহটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সাবিরের কাকা বাবর আলি মল্লিকও জানান, সাবিরের দেহ ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের পুলিশের কাছে বারবার আবেদন করতে হয়েছে তাঁদের।

সাবিরের পরিবার জানিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফোন করে সাবিরের আত্মীয়দের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তৃণমূলের রাজ্যসভার সদস্য এবং পরযায়ী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের (পশ্চিমবঙ্গ) চেয়ারপার্সন সামিরুল ইসলাম বলেছেন, "এ ভয়াবহ ঘটনা। আমরা পরিবারের পাশে আছি। আমাদের সরকার হরিয়ানা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। বিভিন্ন রাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের নিশানা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ওড়িশাতেও তাদের মারধর করা হয়। আমরা সাবিরের বিচার চাই।”

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

‘মহাকাব্য যদি কোথাও জন্মে থাকে, তবে তা ফুটপাতে’—কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্তের সঙ্গে 'আড্ডা'য় অত্রি ভট্টাচার্য

The Other Kolkata of krishnapriya Dasgupta: কলকাতার সেই অচেনা ফুটপাতের মানুষরা কীভাবে বেঁচে থাকেন? সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আজকালের প্রাক্তন সাংবাদিক কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত কী দেখেছেন? আর আজকের সংবাদমাধ্যম কেন বদলে গেল তাঁদের দেখার চোখে? তাঁর স্মৃতি, সাংবাদিকতা ও আজকের বদলে যাওয়া শহর নিয়েই তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় অত্রি ভট্টাচার্য।

১৯৭১ থেকে ২০১১: কলকাতার ফুটপাথে থাকা মানুষদের রোজনামচা কেমন ছিল?

Kolkata pavement dwellers survey: ১৯৭১ থেকে ২০১১—এই চার দশকে কলকাতার ফুটপাথবাসীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ৭০ হাজারে পৌঁছেছে। ফুটপাথবাসীদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। কেউ থাকেন উড়ালপুলের নীচে, কেউ রেললাইনের পাশে, আবার কেউ পরিত্যক্ত পাইপের ভিতরে। শহরের অসংগঠিত অর্থনীতিতে ফুটপাথবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের জীবনযাপন, কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি নিয়ে অতীতে বেশ কিছু গবেষণা ও সমীক্ষাও হয়েছে।

শুধু আমেরিকা বা আফ্রিকাতেই নয়, বাংলাতেও ছিল দাসপ্রথা

International Day for the Remembrance of the Slave Trade and its Abolition: ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক দাসব্যবসা স্মরণ দিবস। হাইতির দাসবিদ্রোহের পাশাপাশি স্মরণ করতে হবে, বাংলার মাটি থেকে লক্ষাধিক মানুষকে বলপূর্বক নির্বাসিত করার ইতিহাস। চট্টগ্রাম, হুগলি, সুন্দরবন হয়ে আরব, আফ্রিকা, মরিশাসে পৌঁছেছেন বাংলার দাসেরা। শুধু ইতিহাসে নয়, আজও বাঙালির আন্তর্জাতিকতা চর্চায় দাসেদের উল্লেখ প্রাসঙ্গিক।

ঘাড়ধাক্কা খেয়ে ওপারে, বাংলাদেশে যেভাবে বেঁচে আছেন সাইদা ফকির

Saida Fakir Deportation: বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগের পর কী ভাবে দিন কাটছে সাইদা ফকিরের? বাংলাদেশের কোথায় আছেন? কারা আশ্রয় দিল তাঁকে?

সোনালি সুইটির পর এবার সাইদা, 'ঘাড়ধাক্কা'র তালিকায় নতুন নাম যে প্রশ্ন তুলছে

Saida Fakir Case: সাইদা ফকিরকে বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে নাগরিকত্ব যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবির ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি। কাউকে দেশছাড়া করার আগে যথাযথ তদন্ত ও সাংবিধানিক সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই বিতর্ক ফের উঠে এসেছে।

ফিরে দেখা: সোনালি-সুইটিদের নরক যাত্রা

Sonali Khatun, Sweety Bibi: দু'দশক দিল্লিতে থাকার পরও কেন সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবিদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানো হলো? নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও কেন জেল, পুশব্যাক ও অপমানের শিকার হতে হলো তাঁদের? সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবাধিকার প্রশ্নকে আরও সামনে এনে দিল?

উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম, তবু ফল প্রকাশের দিন হোটেলে কাজে ব্যস্ত সাগর

Sagar Mondal: উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম। মোট ৪৮৮ নম্বর। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন বাড়িতে নয়, গুজরাটের আমেদাবাদের একটি হোটেলে কাজে ব্যস্ত ছিল পূর্ব বর্ধমানের সাগর মণ্ডল। পরিযায়ী শ্রমিকের ছেলে সাগরের স্বপ্ন আইএএস হওয়ার।

যেভাবে ভোট দিলেন পরিযায়ী শ্রমিকরা

West Bengal election 2026: পরিযায়ী শ্রমিকেরা কেন মরিয়া হতে ভোট দিতে ফিরলেন? শুধু সরকার বাছতে, নাকি নিজের নাগরিকত্ব, পরিচয় আর জীবিকার নিরাপত্তা প্রমাণ করতে? এ বারের ভোট কি তবে পরিযায়ীদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই?