দিনের শেষে ভরসা সেই 'বাহা শাড়ি', শহুরে মঞ্চ কি সত্যিই লোকনাট্যের সঙ্গে সুবিচার করেছে?

Folk drama theatre in Bengal : আমরা যাকে লোকসংস্কৃতি বলে গ্রহণ করি সেটি প্রকৃত লোকজীবনের থেকে অনেকটাই দূরে, শহুরে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা।

Rajarshi Dhara
৪ মিনিট
দিনের শেষে ভরসা সেই 'বাহা শাড়ি', শহুরে মঞ্চ কি সত্যিই লোকনাট্যের সঙ্গে সুবিচার করেছে?

প্রসেনিয়ামে লোকনাট্যের সঙ্গে সুবিচার করা হচ্ছে কি না, এটা বোঝার আগে বুঝে নিতে হবে লোকনাট্য কাকে বলে ও তার ব্যাপ্তি কতটা। আশুতোষ ভট্টাচার্য মহাশয় লোকনাট্যর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, “লোকনাট্য লোকজীবনের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে মুখে মুখে রচিত এবং অভিনীত নাটক। কোনও পৌরাণিক কিংবা ঐতিহাসিক কাহিনী তার ভিতর প্রবেশ করা সঙ্গত নয়। তার কাহিনীতে পূর্ববর্তী কোনও ধারা কিংবা ঐতিহ্যও থাকে না”।

বরুণ কুমার চক্রবর্তী এই সূত্রে বলেছেন-

“আমরা গণতন্ত্রের সংজ্ঞার অনুকরণে বলতে পারি লোকেদের দ্বারা অনুষ্ঠিত, লোকেদের জন্য অভিনীত, লোকেদের দ্বারা আদৃত মূলত লোক বিষয়ক যে নাটক তাই হল লোকনাট্য”।

এঁদের ভাবনার সূত্র থেকে মোটামুটি লোকনাট্য সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শহুরে প্রসেনিয়াম মঞ্চে যে জিনিসটিকে লোকনাট্য বা লোক আঙ্গিক বলে অবিরাম শহুরে দর্শককে বেচার ও খাওয়ানোর চেষ্টা চলে, সেটি আদৌ কতটা লোকনাট্যর গুণ সম্পন্ন হয়। যদি বরুণ বাবুর সংজ্ঞা ধরেই মেলানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে – না এইসব নাটক বিশেষ জনগোষ্ঠীর ‘লোক’দের দ্বারা অনুষ্ঠিত, না ‘লোক’দের জন্য অভিনীত। কিছু শহুরে মানুষ (সবাই নয়) তাদের শহুরে মনন দিয়ে লোকসংস্কৃতিকে কিছুটা বুঝে এবং অনেকটা না বুঝে শহুরে মানুষের সন্ধ্যা উদযাপনের জন্য শহুরে মানুষদের মতো করে একটি নাট্যনির্মাণ করেন যাকে ‘লোক আঙ্গিকের নাট্য’ হিসাবে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়। লোকনাট্যর শিল্পীদের যে মনন, দর্শন, তাঁদের জীবনচর্যা কোনোটাই এই নাট্য নির্মাণে থাকেনা এবং থাকা সম্ভবও নয়। কিছুটা বাহ্যিক আহার্য অভিনয়ের উপর ভিত্তি করে (ট্রাইব সুলভ কস্টিউম, ধামসা মাদল ও ওই জাতীয় কিছু লোক-বাদ্যযন্ত্র, মুখোশ প্রভৃতি) একটা লোকনাট্যর রূপ দান করার চেষ্টা হয় মাত্র নাটকগুলোয়।

অবশ্যই সব নাট্য প্রয়োজনা এই দোষে দুষ্ট নয়। ‘মারীচ সংবাদ’, ‘মাধব মালঞ্চি কইন্যা’, ‘নাচনী’ প্রমুখ নাটক সত্যিই অবিস্মরণীয় এবং বাংলা তথা ভারতীয় থিয়েটারের মাইলফলক। তবে গত ১০-১৫ বছরে শহুরে মানুষের বিনোদন বিষয়ক ভোক্তা হৃদয় হঠাৎ অনেকটা বাঁক বদল করেছে। আমাদের শিশুকালেও সম্ভবত ব্যাপারটা এরকম ছিল না, আমাদের কৈশোর যৌবনে উত্তীর্ণ হতে হতে গোটা চিত্রটাই পরিবর্তিত হতে দেখা গেল। শহুরে মানুষ ‘লোক-সংস্কৃতি’ রক্ষা করার হাতিয়ার হিসাবে দেওয়ালে মাদুর লাগানো, বাউল গান হিসাবে ‘তোমায় হৃদমাঝারে রাখব’ শোনা, সিরিয়াল দেখে ‘বাহা শাড়ি’ পরা ইত্যাদিকে বেছে নিতে শুরু করল। স্বাভাবিকভাবেই বাহ্যিকভাবে লোক-সংস্কৃতি আরোপিত প্রযোজনাগুলির দিকে থিয়েটারের দর্শক ঝুঁকলো। এটা মনে রাখতে হবে যে থিয়েটারের দর্শক মূলত কিন্ত শহুরে খেতে পরতে পাওয়া শিক্ষিত জনগণ। এই মানুষদের মনে লোকনাট্য ও লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে যে ধারণা আছে সেটা অনেক অংশেই ওয়ান ডাইমেনশনাল বা এক পাক্ষিক। এটাও সম্ভব যে শহুরে দর্শকের কাছে লোক নাট্যের যা ধারণা সেটির সঙ্গে গ্রামের লোকজীবনের প্রকৃত লোক-সংস্কৃতি ও লোক নাট্যের ধারণার যোজন খানেক পার্থক্য।

শহুরে নাট্যমঞ্চে উঠে আসা লোক সংস্কৃতির ঝলক

এই প্রসঙ্গে একটি গল্প বলা যায়। গত ১৪ নভেম্বরে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ‘সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড দীপা চট্টোপাধ্যায় ফাউন্ডেশন’-এর পক্ষ থেকে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম ‘সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা’। বক্তা ছিলেন নট দেবশঙ্কর হালদার। বক্তৃতার মূল বিষয় ছিল মঞ্চে অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে সেতু তৈরি করা। এই প্রসঙ্গে দেবশঙ্কর ২০০৩ সালের একটি ঘটনা বলেন। বাংলার একটি গ্রামে ‘নান্দীকার’ তাদের দু'টি নাটক নিয়ে একটি নাট্য উৎসব করতে যায়। একটি নাটক ‘শেষ সাক্ষাৎকার’, যেটি ছিল একটি আরবান ড্রামা। অন্যটি ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ যে নাটকটিতে গ্রামের গল্প, গ্রামের মানুষের গল্প আছে। নান্দীকারের কথামতো উদ্যোক্তারা একটি অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করেন, যার মূল উপকরণ বাঁশ। নান্দীকার ভাবে যে, যেহেতু গ্রামের দর্শক, তাই তাদের শহুরে নাটক পছন্দ হওয়ার সম্ভাবনা কম। সেইজন্য তারা প্রথমদিন দর্শক ধরে রাখার জন্য গ্রাম কেন্দ্রিক নাটক ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ মঞ্চায়নের সিদ্ধান্ত নেন। ততদিনে ‘সোজন’-এর অনেকগুলি শো হয়ে যাওয়ার কারণে অভিনেতাদের একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল, কোন জায়গায় হাততালি পড়া উচিৎ। কিন্তু দেখা গেল, সেই গান বাজনা সংবলিত গ্রামের গল্প মঞ্চে দেখে গ্রামের মানুষ কোনওরকম প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। গোটা অভিনয়তে একবারের জন্যও হাততালি পড়ল না।

এই রিঅ্যাকশনের পর নান্দীকারের মানুষজন খুব হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের মনে একটা ভয় চেপে বসেছিল যে পরদিন এই ‘শেষ সাক্ষাৎকার’ দেখে ‘আরবান’ নাটক লোকজন আর দেখবেন না। কিন্তু এক্ষেত্রেও আবার ফল হল উল্টো। দেখা গেল সেই শহুরে নাটক গ্রাম্য জনতা আরও বেশি গ্রহণ করলেন। অভিনেতাদের সঙ্গেও দর্শকদের একটা যোগ স্থাপন হল।

এখন থেকে একটা খুব স্পষ্ট চিত্র উঠে আসে। আমরা যে বস্তুটিকে লোকসংস্কৃতি বলে গ্রহণ করি সেটি প্রকৃত লোকজীবনের থেকে অনেকটাই দূরবর্তী ও একদমই শহুরে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা। একে আদতেও ‘ফোক লোর’(Folklore) বলা যায় না, যা বলা যায় তা হল ‘ফেক লোর’ (Fakelore)। কারণ এইসকল অভিনেতা, নির্মাতা ও শিল্পীরা সেই লোকজ যাপনের মধ্যে বেড়ে ওঠেননি, সেই যাপনকে ধারণ করে বেড়ে ওঠেননি। কাজেই যখন সেই উপস্থাপন প্রকৃত লোকজীবনের মধ্যে গিয়ে পড়ে তখন দর্শক তার সঙ্গে নিজেদের রিলেট করতে পারেন না। দেবশঙ্কর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন, ‘সোজনে’র যে বাঁশের সাঁকো একাডেমির মঞ্চে একটা অন্যরকম প্রতীতি তৈরি করে। গ্রামের বাঁশের মঞ্চে সেই বাঁশের সাঁকো আলাদা কোনও প্রতীতি তৈরি করে না।

এই আলোচনা থেকে যে জায়গাটায় পৌঁছনোর চেষ্টা করা হল। আমরা শহুরে নাট্যমঞ্চে যে বিষয়টিকে লোক-সংস্কৃতি বা লোকনাট্য বলে চিনি সেটা আদতে কতটা লোকনাট্যের দর্শন দ্বারা পরিচালিত? আর কতটা লোকনাট্যর বাহ্যিক আড়ম্বর দ্বারা ‘সারফেস লেভেল’এ চালিত? এইটাও বোঝার চেষ্টা করা হল, যে চোখ দিয়ে আমরা শহুরে সংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতি বিচার করছি, সেই চোখটি সম্পূর্ণভাবে শহুরে চোখ, সেই চোখ দিয়ে নিরপেক্ষ ও সঠিক বিশ্লেষণ সম্ভব নয়।

লিখেছেন
Rajarshi Dhara
Rajarshi Dhara
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।