রেগে আগুন অমিত শাহ! বঙ্গ বিজেপির নেতারাই কি বারবার মুখ পোড়াচ্ছেন তাঁর?

শাহি-তোপের নিশানায় এবার বিজেপি'র রাজ্য নেতারা৷ পদ খোয়ানোর ভয়ে বাড়ছে তাঁদের রক্তচাপ৷ অপরাধের যা বহর, তাতে শুধু পদ খোয়ানোতেই 'শাস্তি' শেষ নাও হতে পারে৷ রাজনৈতিক মহলের ধারণা, আম এবং ছালা, দুটোই হাতছাড়া হতে পারে গেরুয়াবাহিনির রাজ্য সেনাপতিদের৷

 

জনগণকে ভুল বোঝালে তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়তো মেলে না৷ পরবর্তী ভোট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়৷ কিন্তু কাশীপুরের ঘটনা নিয়ে বঙ্গ বিজেপি-র নেতারা গত ৬ মে যে ভাবে বিভ্রান্ত করেছেন অমিত শাহকে, তাতে রুষ্ট হয়েছেন খোদ দলের শীর্ষনেতা তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী৷ এই রোষের কোপ দ্রুত নেমে আসতে পারে রাজ্য কমিটির ঘাড়ে৷ সূত্রের খবর, এই ক্ষোভ তিনি উগরেও দিয়েছেন৷ শোনা যাচ্ছে, এভাবে কেন তাঁকে ভুল বোঝানো হলো, তার কৈফিয়তও শাহ তলব করেছেন বঙ্গ নেতাদের কাছ থেকে৷ মোটের ওপর, রহস্যজনকভাবে মৃত বিজেপি কর্মী অর্জুন চৌরাসিয়ার মরদেহের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসায়, হতমান হয়েছেন অসহায় অমিত শাহ৷ প্রসঙ্গত, গত ৬ মে দলের রাজ্য নেতাদের 'পরামর্শে' কাশীপুরের ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে রাজ্য সরকার তথা শাসক দলকে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করে অনেক কথা শাহ বলেছিলেন৷ নিজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও ওই মৃত্যুর ঘটনার সিবিআই স্তরের তদন্ত দাবি করেছিলেন তিনি৷ বলেছিলেন, "এই হত্যাকাণ্ডের সিবিআই তদন্ত হওয়া উচিত। গত কিছুদিনের মধ্যে অনেকগুলি ক্ষেত্রে সিবিআই তদন্তের নির্দেশে দিয়েছে আদালত। দেশের কোথাও এত কম সময়ে এতগুলি সিবিআই তদন্তের নির্দেশের নজির নেই। সাধারণ মানুষের মতো আদালতেরও রাজ্য পুলিশের উপরে আস্থা নেই।" বলেছিলেন, "অর্জুন চৌরাসিয়ার রাজনৈতিক হত্যা হয়েছে। জঘন্য হত্যা হয়েছে। সারা বাংলায় বিরোধী নেতাদের হত্যা করার একের পর এক উদাহরণ সামনে আসছে। আজই রাজ্য সরকারের কাছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক রিপোর্ট তলব করছে। দোষীদের সবাইকে কঠোর শাস্তি সুনিশ্চিত করব।"

 

 

সেদিন এই ধরনের মন্তব্য করার আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাথায় রাখা উচিত ছিল, (১) ন্যূনতম তদন্ত তখনও পর্যন্ত শুরু হয়নি, (২) তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন কেন্দ্রীয় সরকারি কোনও এজেন্সির রিপোর্টও তাঁর হাতে তখন ছিল না, (৩) তিনি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, দলের নিচুতলার নেতাদের ইন্ধনে মন্তব্য করা একদমই হঠকারিতা হচ্ছে কি না, (৪) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখ থেকে এভাবে 'সিবিআই-তদন্ত' চাওয়া ঠিক হচ্ছে কি না৷ সেদিন এসবকিছুই ভাবেননি অমিত শাহ৷ অবশ্য ভাববেনই বা কেন! দলের দায়িত্বশীল পদাধিকারীরা তাঁকে 'ব্রিফ' করেছেন, "অর্জুন চৌরাসিয়াকে খুন করে ঝুলিয়ে দিয়েছে তৃণমূল৷ তাঁর কলকাতা সফরের মাঝেই দলের এক কর্মীকে এভাবে খুন করবে তৃণমূল, আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চুপ থাকলে কর্মীরা হতোদ্যম হয়ে পড়বে।"

 

আরও পড়ুন: ঐতিহাসিক জয়ের ১১ বছর, আজ কোথায় দাঁড়িয়ে মমতার তৃণমূল?


শাহ বিশ্বাস করেছেন রাজ্য নেতাদের এই কথা৷ তিনি তো জানেন না, বঙ্গ বিজেপির যাবতীয় অভিযোগই দাঁড়িয়ে আছে কল্পনা আর অসত্যের ওপর৷ তাই তিনি প্রতিক্রিয়ায় তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক তোপ বর্ষণ করেছেন৷ তৃণমূলের কঠোরতম শাস্তিও দাবি করেছেন৷

 

ওদিকে কলকাতা হাই কোর্ট এই মৃত্যুর মামলায় মরদেহের ময়নাতদন্তের ভার দেয় কেন্দ্রীয় সরকার-নিয়ন্ত্রিত কম্যান্ড হাসপাতালকে৷ যথারীতি ময়নাতদন্ত হয় এবং সেই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পরই বিজেপির রাজ্য নেতারা যে হাওয়া দিয়ে অমিত শাহের বেলুন ফুলিয়ে দিয়েছিলেন, তা চুপসে যায়৷ বোকা হয়ে যান শাহ৷ এমন পরিস্থিতিতে আগে পড়েননি তিনি৷ ময়নাতদন্তের রিপোর্টে অর্জুনের খুন হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে৷ বলা হয়েছে, সে আত্মহত্যাই করেছে৷ এদিকে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে মৃত বিজেপি নেতা অর্জুন চৌরাসিয়ার অনলাইন জুয়ায় আসক্তির কথাই উঠে আসছে৷ কয়েক বছর ধরেই এই অনলাইন জুয়ায় ডুবে গিয়েছিলেন তিনি৷ হেরেছেন লক্ষ লক্ষ টাকা৷ এই নিয়ে পরিবারে চরম অশান্তি চলছিল৷ যাঁদের কাছ থেকে টাকা ধার করে অর্জুন জুয়া খেলে হেরেছে, তারাও ফেরত চাইছিল টাকা৷ প্রাথমিক তদন্তের শেষে পুলিশ মোটামুটি নিশ্চিত, জুয়ায় বিপুল পরিমাণ টাকা খোয়ানো, এই নিয়ে পারিবারিক অশান্তি এবং পাওনাদারদের তাগাদা, এই তিনের জেরেই আত্মঘাতী হয়েছেন বিজেপির ওই নেতা৷ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেখার পর বিজেপি নেতারা ভাবছেন, কম্যান্ড হাসপাতালে ময়নাতদন্তের দাবি আদালতে তোলা ব্লান্ডার হয়েছে৷ রাজ্য সরকারের কোনও হাসপাতালে হলে ফের চিল-চিৎকার করা যেত৷ওদিকে,এইভাবে বেইজ্জত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই অমিত শাহ চটেছেন দলের নেতাদের উপর৷ শাস্তি দেওয়ার মকশো করছেন দিল্লি বসে৷ ঘনিষ্ঠ মহলে শাহ বাংলার নেতাদের তুলোধনা করে বলেছেন, "এরা কেউ মাটির খবর রাখে না, সব বিষয়কেই নিজেদের মতো সাজিয়ে নেয়।" অমিত শাহকে ভুল বুঝিয়ে এবং ন্যূনতম খোঁজখবর না নিয়েই রাজ্য বিজেপি নেতারা এই মৃত্যুকে 'খুন' বানিয়ে দেন এবং খুনের দায় চাপান তৃণমূলের ঘাড়ে৷ এই পর্যন্ত না হয় ঠিকই ছিল, বিজেপি প্রায় সব ঘটনার ক্ষেত্রেই এমন করে৷ কিন্তু মাতব্বরি দেখাতে এই মিথ্যা, স্বরচিত কাহিনিই ব্রিফ করা হয় শাহকে৷ নানা রং চড়িয়ে শাহকে বলা হয়, নিজের চোখেই দেখুন, বাংলায় তৃণমূল ঠিক কেমনভাবে খুন করছে বিজেপি কর্মীদের৷ শুধু অসত্য তথ্য পেশ করাই নয়, বিজেপি নেতারা সেদিন অকুস্থলে পর্যন্ত টেনে আনেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে৷ শাহ দলের নেতাদের ওপর ভরসা করে শত ব্যস্ততার মাঝেও কাশীপুরে পা রাখেন এবং হাস্যকর কিছু কথা বলে যান৷ এই ধাক্কাটা এখন ঠিক নিতে পারছেন না অমিত শাহ৷ বাংলার নেতাদের ভোটের পর থেকেই 'অপদার্থ', 'অযোগ্য' ছাড়া অন্য কিছুই ভাবছিলেন না শাহ৷ কিন্তু কিছু করতে পারছিলেন না দলীয় বাধ্যবাধকতার কারনে ৷ এবার সেই রাগ মেটাতে চাইছেন অমিত শাহ৷ বিজেপি সূত্রে খবর, এই ঘটনায় বিস্তর চটেছেন শাহ। রাজ্য নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, "এরা কেউই কোনও খবর রাখে না, শুধুই অজুহাত খোঁজে৷ একুশের নির্বাচনে এরাই ভুলভাল তথ্য দেওয়ায় দুশো পার করা যায়নি। কাশীপুরের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে এরা ভুল খবর দেয় এবং আমায় ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে দলের এবং আমার সম্মান ডুবিয়ে দিয়েছে।"

 


এদিকে এই কাণ্ডের পর তৃণমূলের সমালোচনার মুখে পড়েছেন অমিত শাহের ভূমিকা৷ তা নিয়েও প্রচণ্ড রেগেছেন শাহ। সেই ক্ষোভই এবার উগরে দিতে চলেছেন বঙ্গ বিজেপির নেতাদের ওপর৷

 

 

এমনিতেই শাহ-র এবারের কলকাতা সফরে তেমন কিছু প্রাপ্তি হয়নি রাজ্য নেতাদের৷ ৩৫৬ ধারা জারি করার রাজ্য নেতাদের আবদার তিনি খারিজ করে দিয়েছেন। বিরোধী দলের ঠিক কেমন করে লড়াই করা উচিত, তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইয়ের ইতিহাস থেকে শিখতে বলেছেন৷ এতেই কাত হয়ে পড়েছে বিজেপির রাজ্য কমিটি৷ তার ওপর এখন শাহকে ভুল বোঝানোর দায় চেপেছে তাদের ঘাড়েই৷ অভিযোগ এনেছেন খোদ শাহই৷ শিয়রে সমন নিয়ে এখন শাস্তির অপেক্ষায় রয়েছেন রাজ্য নেতারা৷

 

আসলে, সব কাজ সবার দ্বারা হয় না৷ রাজার পার্ট সবার জন্য নয়৷ চিড়িয়াখানা ছাড়া যারা জীবনে বাঘ দেখেনি, তারাই যদি 'রিং মাস্টার' হয়ে যায়, তাহলে অস্তিত্বের সংকট অবধারিতভাবেই দেখা দেবে৷ মিথ্যাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে মুখ পোড়ার আশঙ্কা থাকে সবসময়৷ আর এবার তো বাঘের সামনে দাঁড়ানোমাত্রই সন্ধ্যা হয়েছে৷ বঙ্গ বিজেপির শীর্ষ নেতাদের একাংশ যেভাবে দল পরিচালনা করছেন, তাতে দলের মুখ বার বার পুড়ছে৷ তবুও হুঁশ ফিরছে কই?

 

 

অমিত শাহ পাকা মাথার খেলোয়াড়৷ তাঁর বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি, রাজ্য নেতারা অযোগ্য, অদক্ষ, সাংগঠনিক কোনও মেরুদণ্ডই নেই তাঁদের৷ পদে আছেন বলে পাঁচটা লোক সমীহ করে৷ পদ না থাকলে পাশের বাড়ির পড়শিরাও এঁদের চেনে না৷

 


রাজ্য নেতারা যে তাঁদের সীমাবদ্ধ যোগ্যতার কথা জানেন না, তেমন নয়৷ তবুও নিজেদের হুঁশ ফিরছে কোথায়? এই নেতাদের অযোগ্যতা, অপরিণামদর্শিতা, অনভিজ্ঞতার জেরেই কি এভাবে কালি লেগেছে শাহের মুখে? শাহ অন্য ধাতুতে তৈরি৷ দম্ভ আর অহংকারে সবসময়ই গমগম করছেন৷ সেই শাহ রাজ্য নেতাদের মূর্খামির শিক্ষা দেবেন, বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা৷ অপেক্ষা শুধু সময়ের৷

More Articles

;