নিছক গোয়েন্দা নয়, সে 'সত্যান্বেষী'! কেন নিজেকে এমনটা বলত শরদিন্দুর ব্যোমকেশ?

Sharadindu Bandopadhyay Byomkesh Bakshi : শেষে তাঁর বুদ্ধির জোরেই খুনি পাকড়াও হল। পরিচয় সামনে এল, বাড়ির সামনে নম্বর প্লেট, ‘ব্যোমকেশ বক্সী, সত্যান্বেষী’।

inscript
৩ মিনিট
নিছক গোয়েন্দা নয়, সে 'সত্যান্বেষী'! কেন নিজেকে এমনটা বলত শরদিন্দুর ব্যোমকেশ?

উত্তর কলকাতার মেসবাড়িতে অন্য নাম নিয়ে থাকছিল সে। হাবভাব বেশ সন্দেহজনকই বলা যায়। সঙ্গী ছিল বাঙালি এক লেখক, নাম অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। সেটা ছিল গত শতকের তিরিশের দশক। সেই সময় এরকম অনেক বাঙালি যুবকই উত্তর কলকাতার মেসবাড়ি ছেয়ে থাকত। কারও একটা চাকরি জোটানোর লক্ষ্য, কেউ আবার ভবঘুরে প্রকৃতির, কেউ আবার এই অজিতের মতোই লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দিন গুজরান করছে। হঠাৎই সেই মেসবাড়িতে খুন হল। তারপর শুরু হল একের পর এক কাণ্ড। দেখা গেল, চুপচাপ থাকা রহস্যময় যুবকটিই আসল ‘খেলোয়াড়’। শেষে তাঁর বুদ্ধির জোরেই খুনি পাকড়াও হল। পরিচয় সামনে এল, বাড়ির সামনে নম্বর প্লেট, ‘ব্যোমকেশ বক্সী, সত্যান্বেষী’। অজিত, পুঁটিরাম তো রইলই, বেশ কয়েক বছর পর হাজির হবে সত্যবতীও।

ব্যোমকেশ না ফেলুদা, এ নিয়ে বাঙালির তর্ক চলতেই থাকবে। জয়ন্ত-মানিক, কাকাবাবু, কর্নেলরা মাঝেমধ্যে ফাঁকেতালে এসে পড়ে বটে; কিন্তু এ দ্বন্দ্ব চিরকালীন। যেন বাঙালির গোয়েন্দা সাহিত্য জগতের ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা, ইস্টবেঙ্গল নাকি মোহনবাগান। ব্যোমকেশের সঙ্গে পুলিশের ভালোমতো যোগাযোগ। দরকার পড়লে সে খাকি উর্দিকে ধমক দিতেও প্রস্তুত। চোয়াল শক্ত করে, সিগারেট টানতে টানতে ভাবনায় মশগুল হয়ে যায়। আর একের পর এক দুর্ধর্ষ রহস্য, ভয়ংকর খুনের সমাধান করতে থাকে। সেখানে পরতে পরতে লেগে থাকে বিস্ময়। অনেকেরই মত, বাঙালির ছোটবেলা কাটে ফেলুদায়, আর যৌবনের প্রেম ব্যোমকেশ।

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ব্যোমকেশকে প্রথম খাতায় আর কলমে ধরলেন, তখন তিনিও মেসবাসী। তবে প্রথম থেকেই তাঁর বক্তব্য ছিল একটাই। ব্যোমকেশ হল ‘সকলের চেয়ে আলাদা’। সে আর পাঁচজন ‘গোয়েন্দা’র মতো নয়, সে সত্যান্বেষী। সত্যকে খোঁজা তাঁর কাজ। সেই ‘সত্য’ কথাটির মধ্যেই শরদিন্দু অনেক গোপন কথা ঢুকিয়ে রেখেছেন। যা প্রতিটা ব্যোমকেশের আখ্যান পড়তে পড়তে সামনে আসে। প্রস্ফুটিত হয় সেই সত্যের মানে।

অন্যান্য গোয়েন্দারাও যে আলাদা, সেটা প্রমাণ করতে সদা ব্যস্ত তার স্রষ্টারা। ফেলুদাকে যেমন একরকম ‘বাঙালি সুপারম্যান’-এর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন সত্যজিৎ রায়। তোপসের বিস্ময় চোখে, তাঁর এই দাদা সব করতে পারে। প্রখর দৃষ্টিশক্তি, অব্যর্থ নিশানা, সঙ্গী পিস্তল, কোথাও যাওয়ার আগে খুঁটিনাটি পড়ে নেওয়া, যোগব্যায়াম, নেপোলিয়নের মতো অল্প ঘুমিয়েই শরীর চাঙ্গা করা – এরকম অজস্র গুণের অধিকারী ফেলুদা। কাকাবাবুও এক কথায় অতিমানব – একটা পা নেই, তবুও বীভৎস সব অ্যাডভেঞ্চারে ‘পা’ বাড়িয়েছেন তিনি। স্বয়ং শার্লক হোমসের চরিত্রেও বিভিন্ন উদ্ভট জিনিস দেখা যায়। নেশা করে, বেহালা বাজায়, বাড়িতে থাকে মড়ার খুলি। অর্থাৎ, সাধারণ নয়, উদ্ভট, অদ্ভুত কিন্তু ক্ষুরধার বুদ্ধি আর তীক্ষ্ণ নজরে ভরা। কমবেশি সমস্ত গোয়েন্দাদেরই এমনই একখান ছবি।

আর ব্যোমকেশ? সে-ও আলাদাই। বাড়িতে কে আসছে, সেটা জুতোর শব্দ শুনে বলে দিতে পারে। কলমের কালির মধ্যে যে মাকড়সার রস মিশে আছে, সেটা বোঝার জন্যও তো সেরকম বুদ্ধির দরকার! পঞ্চেন্দ্রিয় সবসময় সজাগ। কিন্তু একইসঙ্গে সে দারুণভাবে মধ্যবিত্ত। সে সংসারী, বউ-বাচ্চা মিলিয়ে জমজমাট। সেখানে ভালোবাসাও আছে, ঝগড়া-রাগারাগিও। চেহারায় অন্য কোনও বিশেষত্ব নেই, কেবল চোখ দুটো উজ্জ্বল। ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়া আমার আপনার মতো আম বাঙালি। কিন্তু সত্যান্বেষী কেন? গোয়েন্দা বলতে এত দ্বিধা কেন শরদিন্দুর?

এর কারণ খুঁজতে গেলে ব্যোমকেশের প্রতিটি কাহিনিই মন দিয়ে পড়তে হবে। ব্যোমকেশের কাহিনি কেবল গোয়েন্দা, রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস নয়। সেখানে জড়িয়ে আছে মনস্তত্ত্ব, জড়িয়ে আছে সেই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এমনকী, দেশভাগ এবং সেই সময়ের দাঙ্গাও দিরে এসেছে শরদিন্দুর ব্যোমকেশের লেখায়। শুধু কি তাই? ব্যোমকেশের গল্পে আরও একটা জিনিস দেখা যায় – সম্পর্ক। সত্যবতীর সঙ্গে পরিচয়ও সেই রহস্য আর সম্পর্কের ভিতের কথা বলে। কিংবা চিত্রচোর, দুর্গরহস্যের মতো গল্পে একেকটা পরিবারের মধ্যে বয়ে চলা চোরাস্রোত। স্রেফ চুরি, ডাকাতি, খুনেই থেমে নেই ব্যোমকেশ। সেই সম্পর্ক আর ঘটনার ভেতরে বয়ে চলা সত্যের স্রোতকে বোঝার চেষ্টাই করে গিয়েছেন শরদিন্দু। কেবল চরিত্রের উত্তরণ নয়, লেখক হিসেবেও নিজের চিন্তাভাবনাকে ঝালাই করে নেওয়া।

মনে করুন ‘রক্তমুখী নীলা’র কাহিনি। যেখানে ব্যোমকেশ জানে, তার সামনে যে বসে আছে, সে-ই অপরাধী। সে-ই নীলাটি চুরি করেছে। কিন্তু কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছে না। শেষমেশ বিজ্ঞানে বিশ্বাসী ব্যোমকেশও রক্তমুখী নীলার মিথের ভেতর ঢুকে পড়ল। সেখান থেকে অপরাধীর মনের ভেতর হাতড়ে চলল পথ, যদি খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে সে। এবং শেষমেশ সে সফলও হল! স্রেফ গোয়েন্দা কাহিনি হিসেবে ব্যোমকেশকে আটকে রাখতে চাননি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। আর ঠিক এই জায়গাতেই সে সকলের থেকে আলাদা। এজন্যই সে সত্যান্বেষী; যে কেবল অপরাধ নয়, সমাজের, রাজনীতির, সম্পর্কের সত্যিগুলোকেও খোঁজার চেষ্টা করে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।