জাতীয় সংগীত হওয়ার যোগ‍্য নয়! কেন এই দাবি উঠেছিল 'জনগণমন' নিয়ে

National Anthem: কবিগুরু নিজের যে সৃষ্টি মানুষকে দিয়ে গিয়েছিলেন, তা শুধু তাঁকে শ্রদ্ধা এবং ভালবাসাই এনে দেয়নি, একই সঙ্গে এনেছে লাঞ্ছনা, অপমান।

Raktim Dey
৪ মিনিট
জাতীয় সংগীত হওয়ার যোগ‍্য নয়! কেন এই দাবি উঠেছিল 'জনগণমন' নিয়ে

১৯১৩ সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়। হেমন্ত কালে শীতের আমেজ বেশ ভালো বোঝা যাচ্ছে তখন। এমন এক বিকেলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘোড়ার গাড়িতে শান্তিনিকেতন সফরে বেরিয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল চৌপাহাড়ির জঙ্গলে শাল এবং দেবদারু গাছ দেখতে যাবেন। শোনা যায় যে, তাঁর যাত্রাপথে একটা পোস্ট অফিস ছিল। তিনি পোস্ট অফিস পেরিয়ে যাওয়ার সময় পোস্ট অফিসের কর্মী তাঁকে ডেকে গাড়ির কাছে আসেন। তারপর সেই কর্মী কবিগুরুকে একটা টেলিগ্রাম এগিয়ে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেই টেলিগ্রাম হাতে নিয়ে পরে পড়বেন বলে নিজের জোব্বার পকেটে রেখে দিয়েছিলেন। তাই দেখে কর্মী বললেন যে, সেই টেলিগ্রাম বিদেশ থেকে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ প্রথমে আগ্রহ প্রকাশ না করলেও উপস্থিত সকলের আগ্রহ দেখে পকেট থেকে টেলিগ্রামটা বের করেছিলেন। লন্ডনের একটি ঠিকানা থেকে কবিগুরুর জোড়াসাঁকোর বাড়িতে টেলিগ্রামটা পাঠানো হয়েছিল। সেই টেলিগ্রামে লেখা ছিল যে, সুইডিশ অ্যাকাডেমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সাহিত্য বিভাগে সেই বছরের নোবেল পুরস্কার দিতে চাইছে। কবি যেন পুরস্কার স্বীকার করে তার জবাব পাঠান। 'গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে'- এই খবর খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। খবর ছড়িয়ে পড়ার গতির সঙ্গে মানুষের আনন্দের পরিমাণ যেন পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছিল। যদিও সবাই কবিগুরুর সাফল্যে খুশি হতে পারেনি।

১৯১৩ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধুমাত্র প্রথম ভারতীয় হিসেবে নয়, এশিয়ার প্রথম সাহিত্যিক হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তাই পুরস্কারপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশে কবিগুরুর নাম ছড়িয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগে যে সাহিত্যিকরা নোবেল পেয়েছিলেন, তাঁরা মূলত সাদা চামড়ার ইউরোপীয় ছিলেন। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেলপ্রাপ্তি সম্পর্কে বহু ইউরোপীয় নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। তাঁদের মনে হয়েছিল যে, বহু যোগ্য সাহিত্যিককে ব্রাত্য করে রবীন্দ্রনাথকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এমনকী, এক ইংরেজি দৈনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাওয়া এই পুরস্কারের পিছনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক ভূমিকা দেখানোর চেষ্টা করেছিল। এছাড়া লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসে গর্ডন রে ইয়ং লিখেছিলেন যে, এমন এক অযোগ্য সাহিত্যিককে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে, যাঁর প্রথম নাম ঠিক করে উচ্চারণ করা যায় না। তাঁর লেখা ইউরোপ এবং আমেরিকার খুব কম মানুষই পড়েছে এবং তাঁর থেকেও কম মানুষ তাঁর নাম জানে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ক্রিকেটার কবিগুরু! যে রবীন্দ্রনাথকে আজও চেনেই না বাঙালি

Rabindranath Tagore: রবীন্দ্রনাথ কিঞ্চিৎ ক্রিকেট খেলেছিলেন বটে, তবে তিনি ঠিক কোন সময়ে ক্রিকেট খেলেছিলেন, তা নিয়ে পরিষ্কারভাবে কিছু বলা নেই কোথাও।

সমস্ত আনন্দ, আবেগ, সমালোচনার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অবিচল। তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তির জন্য শুভেচ্ছা জানিয়ে তাকে পাঠানো অসংখ্য চিঠির উত্তর দেওয়ার পরে তিনি তার বন্ধুকে এক দীর্ঘ চিঠি লিখে নিজের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন, কারণ তাঁর বন্ধু রথেনস্টাইন প্রথম তাঁর সাহিত্যের নমুনা সুইডিশ অ্যাকাডেমির কাছে পাঠিয়েছিলেন। কবিগুরু তাঁর পুরস্কারের সম্পূর্ণ অর্থ তাঁর প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির জন্য ব্যয় করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর নোবেল পদক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ২০০৪ সাল অবধি বিশ্বভারতীর রবীন্দ্র ভবনের একটি ঘরে রাখা ছিল। ২৬ মার্চ, ২০০৪ সালে রবীন্দ্র ভবনের সেই ঘরের তালা খুলতে দেখা যায় যে, অন্যান্য বহু মূল্যবান জিনিসের সঙ্গে চুরি গিয়েছে সেই বিখ্যাত নোবেল পদক। নোবেলপ্রাপ্তি থেকে নোবেল চুরি যাওয়া, দু'টি আলাদা শতাব্দীতে হলেও দুটো ঘটনার মধ্যে একশো বছরের ব্যবধান ছিল না। চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তার গাফিলতির কথাও জানা যায়। স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় সংস্থা এই চুরির তদন্ত করেছিল। যদিও কিছু মানুষ প্রাথমিকভাবে গ্রেফতার হলেও কয়েকজনের নাম ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। বাঙালির সেই গর্বের নোবেল যেন কোনও গভীর অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে।

কবিগুরু নিজের যে সৃষ্টি মানুষকে দিয়ে গিয়েছিলেন, তা শুধু তাঁকে শ্রদ্ধা এবং ভালবাসাই এনে দেয়নি, একই সঙ্গে এনেছে লাঞ্ছনা, অপমান। জীবিত অবস্থায় এবং মৃত্যুর পরেও তাঁকে বহু মানুষের বহু ব্যঙ্গ এবং সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিগত বছরেও তাঁর রচিত ভারতের জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। একাংশের ভারতীয়, তার মধ্যে কিছু বাঙালিও ছিলেন, তাঁরা বলতে শুরু করেন যে, 'জনগণমন' ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে থাকা উচিৎ নয়; কারণ এই রচনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জের উদ্দেশে লিখেছিলেন। এই ধরনের দাবি থেকেই বোঝা যায় যে, কিছু মানুষ বাস্তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে কতটা অজ্ঞানতার অন্ধকারে। জনগণমন-র মূল কবিতা 'ভারত ভাগ্যবিধাতা'-র একটি পংক্তিতে 'স্নেহময়ী তুমি মাতা' সম্বোধন রয়েছে। এই সম্বোধন পঞ্চম জর্জের উদ্দেশে হতে পারে কখনও?

রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর লেখা অথবা রচনা সম্পর্কে উদাসীন থাকার কারণেই এই ধরনের বক্তব্য পেশ করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশায় এই বিতর্ক যখন দানা বাঁধে, তখন নিজের লেখা একটি চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন যে, কখনওই পঞ্চম জর্জ অথবা কোনও রাজনৈতিক দলের উদ্দেশে তাঁর এই রচনা নয়। সেই চিঠি অথবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল রচনা পড়লে কোনও মানুষ এই আজগুবি যুক্তি মানতে পারে না। এই উদাসীন মনোভাবের কারণেই হয়তো নোবেল পদক চুরি গেলেও খুঁজে পাওয়া যায় না। বিষ্ণু দে-র ভাষায় বলতে গেলে, বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানে শুধু পঁচিশে বৈশাখ এবং বাইশে শ্রাবণ। বাঙালির এই উদাসীন মনোভাব এবং নিজের ইতিহাস থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষাতেই ধ্বনিত হয়েছে বিদ্রুপ, "সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী /রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি।"

তথ্য ঋণ: ইন্ডিয়া টিভি, ইন্ডিয়া ইন পিক্সেল

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।