ভোলেবাবা, সদগুরু, রামদেবের 'ভণ্ডামির' বিরুদ্ধে আইন আনা কতটা জরুরি?

Hathras Bhole Baba Fake Godman: রবিশঙ্কর এবং রামদেব ২০১৪ সালের আগে রীতিমতো বিজেপির হয়ে ঘুরিয়ে প্রচার করেছিলেন।

আবার শিরোনামে হাথরাস, আবার শিরোনামে উত্তরপ্রদেশ। কয়েকবছর আগে এই হাথরাসেই এক দলিত নাবালিকা ধর্ষিতা হন।  সেখানকার পুলিশ-প্রশাসন কোনও তদন্ত না করেই সেই দলিত মেয়ের সৎকার করে দেয়, জ্বালিয়ে দেয় তাঁর দেহ, ভোররাতে। সেই সময় বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা বারবার হাথরাস যাওয়ার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন সাংবাদিকরা খবর করতে উত্তরপ্রদেশে পৌঁছে যান। তাঁদের আটকে দেওয়া হয়, এমনকী হাথরাস যাওয়ার রাস্তায় গ্রেফতার করা হয় সিদ্দিক কাপ্পানকে। এবারের ঘটনা আরও মর্মান্তিক, আরও বেদনাদায়ক। ‘ভোলে বাবা’ নামে এক স্বঘোষিত ভণ্ড বাবার সৎসঙ্গ অনুষ্ঠানে, চূড়ান্ত অব্যবস্থা এবং বিশৃঙ্খলার কারণে পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছেন প্রায় ১২৫জন মানুষ, যাঁদের মধ্যে আছেন বহু মহিলা এবং শিশু। আহতের সংখ্যাও বহু।

ঘটনাস্থলের ভিডিও দেখে হাত পা শিউরে ওঠে। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে রয়েছে কিছু হাওয়াই চটি, বহু চটিই শিশুদের। যাঁরা শুধুমাত্র অন্ধবিশ্বাসের কারণে ভোলে বাবাকে দর্শন করতে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তাদের সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। তদন্ত এবং তর্জনগর্জন শুরু হয়েছে ঠিকই। তবে তা পর্যাপ্ত কি? উঠে আসছে নানা প্রশ্ন। উত্তরপ্রদেশ প্রশাসন কি এই মর্মান্তিক ঘটনাকে স্রেফ দুর্ঘটনা বলে দায় এড়াতে পারে? কেন প্রশাসনিক অপদার্থতা বলা হবে না বিষয়টিকে? কীভাবে এই ভোলে বাবার এত বাড়বাড়ন্ত হলো যে তাঁর বিরুদ্ধে হাথরাসের ঘটনার জন্য এফআইআরও দায়ের করা যাচ্ছে না? প্রশ্ন করতে হবে দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও, যিনি দেশের মানুষকে ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। প্রশ্ন করতে হবে, কোনও একদিন সবাই ভালো থাকবে বলে কি একজন সাধারণ মানুষের 'আজকের' ভালো থাকার ন্যূনতম অধিকারও নেই? যাঁরা সেদিন ভোলে বাবা’র অনুষ্ঠানে আহত হয়েছেন, তাঁদের হাসপাতালের অভিজ্ঞতা এত ভয়াবহ কেন? 

আরও পড়ুন- তাঁকে দেখতে গিয়েই পদপিষ্ট হয়ে মৃত ১২১! কে এই হাথরাসের ভোলে বাবা?

স্বঘোষিত ভণ্ড ভোলে বাবা ১২৫ জনকে 'পার' করিয়ে নিজেই পগারপার হয়ে যান। ভোলে বাবা আসলে কে? সূরযপাল জাটভ ওরফে নারায়ণ সাকার হরি, ওরফে ভোলে বাবা এক সময়ে পুলিশের গোয়েন্দা ছিলেন। ১৯৯৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। সেই কারণে জেল হওয়াতে তাঁর চাকরিও যায়। তখনও তিনি ভোলে বাবা হয়ে ওঠেননি। ১৯৯৯ সালে জেল থেকে বেরিয়েই নিজেকে, ‘সাকার বিশ্বহরি বাবা’ বলে পরিচয় দিতে শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে পৈতৃক বাড়িতেই তিনি তাঁর আশ্রম খুলে বসেন এবং ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ভোলে বাবা। দিনে দিনে তাঁর ভক্তসংখ্যা বাড়তে থাকে। মূলত দিল্লি লাগোয়া আগ্রাতেই তাঁর ভক্তসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ, হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, হরিয়ানাসহ দিল্লিতেও এই ভোলে বাবার প্রভূত প্রভাব। এদের অনেকেই ভোলে বাবার এই স্বর্ণালী জেলযাত্রার অতীতের কথা জানেন না। ভোলে বাবার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ভক্তসংখ্যা হুড়মুড়িয়ে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যের জমি দখল করে নিজের আশ্রম গড়ে তোলেন তিনি। শোনা যায়, ভোলে বাবার আশ্রমে তাঁর নিজের নির্দিষ্ট ঘরে শুধুমাত্র ‘সুন্দরী মহিলা’ এবং ঘনিষ্ঠ কিছুদের প্রবেশাধিকার ছিল। বাইরের লোকজনের ভোলে বাবার ঘরের কাছে অবধি পৌঁছনোর অধিকারও ছিল না।

এই বাবা আবার প্রচুর শৌখিন গাড়িতে চড়তে ভালবাসেন বলে শোনা যায়। যদিও কোনও গাড়িই নিজের নামে ছিল না। সমস্ত গাড়িই কেনা হতো তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বড়সড় ভক্তকূলের নামে। পুলিশকর্মী থেকে ধর্মগুরু হয়ে ওঠার এই যাত্রাপথ নিয়ে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, পুলিশ-প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেই এই সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন ভোলে বাবা। লক্ষ লক্ষ ভক্তদের থেকে পাওয়া বিপুল অনুদান যে তিনি রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক জগতে বিলিয়েছেন তা বলাই বাহুল্য। স্থানীয় কিছু সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ভক্ত সংখ্যা বাড়াতে তিনি রীতিমতো এজেন্ট অবধি নিয়োগ করতেন যাঁরা ভোলে বাবার নামে বেশ কিছু গল্পকথা ছড়াতেন, যাতে সাধারণ মানুষ আকৃষ্ট হতে পারে।

হাথরাসের মর্মান্তিক এই ঘটনার পরে ভোলে বাবা সম্পর্কে অনেক কিছুই শোনা যাচ্ছে। তবে শুধুই তো ভোলে বাবা নন, ভারতবর্ষে গত দশ বছরে এইরকম কত বাবাদের উত্থান ঘটেছে তার ইয়ত্তা নেই। এক একজনের আবার এত প্রভাব যে তাঁদের স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই মঞ্চে দেখা গেছে। প্রথমেই বলতে হয় বাবা রাম রহিমের কথা। তিনি যাবজ্জীবন জেল খাটা সত্ত্বেও মাঝে মধ্যেই প্যারোলে মুক্তি পান। একাধিক ধর্ষণ, এক নাবালিকা ভক্তকে ধর্ষণে অভিযুক্ত হয়ে জেল খাটলেও তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি এতটুকুও কমেনি। বাবা রামদেব, শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর, সদগুরুর কথাও বলতে হয়। রবিশঙ্কর এবং রামদেব ২০১৪ সালের আগে রীতিমতো বিজেপির হয়ে ঘুরিয়ে প্রচার করেছিলেন। রামদেব ‘ইন্ডিয়া আগেন্সট কোরাপশন’ লড়াইতে সামনের সারিতে ছিলেন। টাকার তুলনায় ডলারের দাম বৃদ্ধি, কিংবা পেট্রল ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি বা দুর্নীতি নিয়ে তখন মনমোহন সিং এবং ইউপিএ সরকারকে প্রায় প্রতিদিন রামদেব এবং শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর নিন্দা করে গেছেন।

আসলে ওই সময়ে নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী করার এক সুপরিকল্পিত প্রচার চালানো হয়েছিল, যার মাথায় ছিলেন প্রশান্ত কিশোর এবং তাঁর সংস্থা। ভণ্ড বাবাদের এবং বলিউডের বেশ কিছু তারকাকে সেই সময়ে প্রচারে শামিল করে নেওয়া হয়, যাতে মনে হয় যে নাগরিক সমাজ থেকে মনমোহন সিং এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠছে। ২০১৪ সালের পরে রামদেব এবং শ্রী শ্রী রবিশঙ্কররা যখন দেখেন, এবার তাঁদের পছন্দের নরেন্দ্র মোদিই দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তখন তাঁরা আরও প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। রামদেব তাঁর শিষ্য আচার্য বালকৃষ্ণের সাহায্যে ‘পতঞ্জলি’ নামে একটি সংস্থা খুলে ফেলেন। দাঁতের মাজন, ভোজ্য তেল থেকে শুরু করে প্রসাধনী, ওষুধ! কী নেই তাঁদের পণ্য সামগ্রীতে। কোভিডের সময়ে পতঞ্জলি রীতিমতো বড় বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করে, তাদের তৈরি ‘করোনিল’ খেলে কোভিড সেরে যাবে। পরবর্তীতে সেই ওষুধ নিয়ে মামলা হওয়ার পরে সুপ্রিম কোর্টের ধমক খেয়ে তারা স্বীকার করে নেন, ওই দাবি মিথ্যে ছিল। তাতেও কি রামদেবের জেল হয়নি, শাস্তিও না।

আমাদের দেশে ভণ্ড বাবাদের সঙ্গে রাজনৈতিক জগতের প্রথম সারির মানুষদের সরাসরি যোগাযোগ বহুদিন ধরেই ছিল। গত দশ বছরে তা বেড়েছে। নাহলে সদগুরুর ইশা ফাউন্ডেশন সংস্থা তামিলনাডুতে জঙ্গলের জমি দখল করে বিশালা আশ্রম বানায় কী করে? নানা সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীই সদগুরুর নানা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। বাবাদের বাড়বাড়ন্তের কারণ সহজেই অনুমেয়। এই সমস্ত ভণ্ড বাবারা ভক্তদের বলেন, জীবন যেন সরল হয়, যাপন যেন কখনই ভোগের না হয়। সমস্ত জাগতিক বস্তুই যেন তাঁরা ত্যাগ করতে শেখেন অথচ নিজেরা বিলাসবহুল গাড়ি চড়েন। হাতের ঘড়ির দাম আমাদের দেশের বহু মানুষের সারা বছরের রোজগারের সমান।

আরও পড়ুন- ৮০ হাজারের অনুমতি নিয়ে ২.৫ লক্ষ সমাগম! হাথরাসে কেন মহিলারাই পদপিষ্ট হলেন বেশি?

বিজেপিকে হিন্দুত্বের প্রচার করার জন্য আর সরাসরি নামতেও হয় না। এই ভণ্ড বাবারা সেই কাজটাই করে দেন। যে সময়ে নাগরিকত্ব আইনে সংশোধনী আনা হয়েছিল, সেই ২০১৯ সালে সামাজিক মাধ্যমে বাবা রামদেব, সদগুরু এবং শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর সহ বহু বাবারা ওই আইনের সপক্ষে তাঁদের যুক্তি খাড়া করেছিলেন। গত দশ বছরে যে সমস্ত সরকারি পদক্ষেপ করা হয়েছে, তার প্রত্যেকটির সমর্থনে কোনও না কোনও বাবা দাঁড়িয়েছেন। এই ভণ্ড বাবারাও ভালোই জানেন, তাঁদের এত বৈভব, ঐশ্বর্য এবং ক্ষমতাকে ভোগ করতে গেলে, রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী এবং পুলিশ-প্রশাসনের উপর তলার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই চলতে হবে।

যে সমাজে, যে পৃথিবীতে একজন মানুষ সর্বক্ষণ মনে করেন তিনি পরাজিত, অসফল মানুষ, সেই সময়ে এই ধরনের বাবারা এসে সেই মানুষদের মনে আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করেন। আধ্যাত্মিক ধারণা ওই ভক্তের মধ্যে সঞ্চারিত করে 'বশীকরণ' সম্ভব।এই বাবারা হয়ে ওঠেন মেষপালক আর তাঁদের অঙ্গুলিহেলনে চলে অসংখ্য মেষ। সেই মেষের দলই ধনসম্পত্তি প্রদান করে, বাবাদের আরও খ্যাতি ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে, রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা ওই বৃত্তে ঢুকে পড়ে। তৈরি হয় একটা দুষ্টচক্র।

হাথরাসের মর্মান্তিক ঘটনার জন্যও ভোলেবাবার দুষ্টচক্রই দায়ী। তাই প্রথমেই সূরয পাল সিং জাটভ, ওরফে ভোলেবাবাকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতেই হবে। ভোলেবাবার সঙ্গে কোন কোন রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রশাসনের কোন মানুষের যোগ ছিল, তা খতিয়ে দেখতে হবে। আইন আনতে হবে এই সমস্ত ভণ্ড বাবাদের বিরুদ্ধে। প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে আইন প্রণয়নের দাবিও তোলা হয়েছে। যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল মানুষদের উচিত এই দাবিকে সামনে রেখে আওয়াজ তোলা যাতে ভবিষ্যতে ভোলে বাবাদের মতো বাবারা যেন পগারপার না হতে পারেন।

 

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

More Articles