বিদেশে মানুষের নিত্য ভরসা, অথচ কলকাতায় কেন বাতিল সাধের ট্রাম?

Kolkata Tram: আমাদের শহরে মেট্রো সম্প্রসারণ হয়, কিন্তু ট্রাম লাইন সম্প্রসারণের কথা ভাবা হয় না।

Sangita Dhara
৩ মিনিট
বিদেশে মানুষের নিত্য ভরসা, অথচ কলকাতায় কেন বাতিল সাধের ট্রাম?

অদ্ভুত সমাপতন। ডাবলিনে নিজের অফিসগামী ট্রামে বসে নিউজ স্ক্রোল করতে গিয়ে কলকাতার ট্রাম বন্ধ হওয়ার খবর পেলাম। হাতে-টানা রিকশা, হলুদ ট্যাক্সি, ট্রাম— কলকাতার গণপরিবহনের প্রতীক হয়ে উঠে আসে বারবার। দেখলাম, সোশ্যাল মিডিয়াতে বহু মানুষ ট্রাম নিয়ে নস্টালজিক। কিন্তু যা কিছু পুরনো, যা কিছু ঐতিহ্য সবই কি ভালো? নিশ্চয়ই না। এই কথা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই যে, কলকাতা শহরের গণপরিবহনের প্রতীক হিসাবে থেকে যাওয়া ছাড়া ট্রাম তার বর্তমান অবয়ব নিয়ে শহরের মানুষের রোজের যাতায়াতে বিশেষ কোনও সুরাহা দিতে পারছিল না। না ছিল সঠিক পরিকঠামো, না ছিল যথেষ্ট সংখ্যক ট্রাম এবং রুট, না সঠিক সময়সূচি।

উল্টোদিকে, বর্তমানে যে শহরে বাস করি, আমি নিজে শহরের মূলকেন্দ্রে না থেকেও রোজ শহরে কাজ করতে যাই ট্রামেরই ভরসায়। এই শহরের জন-ঘনবসতি অনুযায়ী ঠিক করা আছে ট্রামের ফ্রিকোয়েন্সি। যদিও কখনই সেটা ১০-১৫ মিনিটের বেশি হয় না। বহু চেনা মানুষ শহর থেকে বেশ খানিক দূরে নিজেদের স্থায়ী বাসস্থান গড়ে তুলছেন এই কথা মাথায় রেখে যে, এখানকার সরকার খুব শীঘ্রই ট্রাম লাইনের প্রসারণ ঘটাবে। অথচ ডাবলিনে ট্রাম ব্যবস্থা শুরু হয়েছে মাত্র ২০ বছর আগে। শুধু ডাবলিন না, ইওরোপের কত শহরে ঘুরতে গিয়ে দেখি ট্রাম দিয়ে মোড়া গোটা শহর। প্রাগ, অস্ট্রিয়া, বুদাপেস্ট, আমস্টারডাম— পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা পরিচিতদের মুখে শুনি, তাদের রোজের যাতায়াতের জন্য ট্রামের উপর নির্ভরতার কথা।

ডাবলিনের ট্রাম

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে কেঁপেছিল কলকাতা, ট্রামের মতোই ম্রিয়মাণ বাম আন্দোলন?

Kolkata Tram Fare Hike Protest: ১৯৫৩ সালে বিধান চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার সিদ্ধান্ত নিল ১ জুলাই থেকে ট্রামের দ্বিতীয় শ্রেণির ভাড়া এক পয়সা বাড়ানো হবে।

আধুনিক শহরগুলোতে ট্রামের এই জনপ্রিয়তার কারণ সেখানের প্রশাসন ট্রামকে যেমন পরিবেশবান্ধব যানবাহন হিসাবে মডেল করেছে, তেমনই সেটাকে যাত্রীদের সুবিধার্থে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তার জন্যও সঠিক পরিকল্পনা করেছে। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকট পরিবেশ। সব দেশ উঠে পড়ে লেগেছে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর জন্য। এখানেই ট্রামকে গণ পরিবহন হিসাবে ব্যবহার করার সবচেয়ে বড় উপযোগিতা। ট্রাম বিদ্যুৎ দ্বারা চালিত হয় এবং এই দেশগুলোতে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উদপাদনের জন্য কমছে কয়লার ব্যবহার। আর গণ যানবাহনের সঠিক পরিকাঠামো থাকলে মানুষের নিজের গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা কমে। সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলার এইগুলোই তো প্রাথমিক ধাপ। এবার প্রশ্ন, কলকাতার মতো ঘন জনবসতি পূর্ণ জায়গায় কতটা সম্ভব এরকম মডেল তৈরি করা?

এডিনবার্গের ট্রাম

কলকাতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গণ-যানবাহন হলো বাস। একটি বাসে যেখানে ৭০ -৮০ জন মানুষ ধরে, সেখানে একটি ট্রামে ধরে ২০০-র বেশি মানুষ। ট্রামগুলি প্রায় ৮ কিমি/ঘণ্টা গতিতে চলে, যেখানে বাসের গড় গতি ৯.৫ কিমি/ঘণ্টা। যদি ট্রাম লাইনগুলোকে রিজার্ভ করা যায়, ট্রামের গতি হতে পারে প্রায় ১৬কিমি/ঘণ্টা। অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ধরলে, গোটা ট্রাম ব্যাবস্থার পুনর্গঠন এবং পুনর্বিন্যাস করার প্রাথমিক ব্যয় বাসের তুলনায় হয়তো বেশি এবং ট্রামের পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণও ব্যয়বহুল, তবে ট্রামগুলির অপারেশনাল খরচও কম। যদি আমরা বাসের সঙ্গে তুলনা করি এবং রাস্তাগুলির রক্ষণাবেক্ষণের খরচ যোগ করি, বাস পরিচালনার মোট খরচ ট্রামগুলির চেয়ে বেশিও হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা দীর্ঘমেয়াদে ট্রাম ব্যাবস্থার পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক সুবিধা— প্রারম্ভিক ব্যয়কে ছাড়িয়ে যায়।

ইতালির ট্রাম

বিশ্ব ব্যাঙ্কের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর বায়ু দূষণের কারণে কলকাতায় ১০,০০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এরকম একটা সময়ে দাঁড়িয়ে পরিবেশবান্ধব ট্রাম ব্যাবস্থাকে তুলে দেওয়া বর্তমান প্রশাসনের দূরদর্শিতারই অভাব । আগামী দিনে আমাদের দেশকেও ভাবতে হবে কীভাবে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যাবহার বাড়ানো যায়। ভাবতেই হবে, অবশ্যম্ভাবী। ভবিষ্যতে বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ তৈরির জন্য গোটা পৃথিবী জুড়েই চলছে গবেষণা এবং পরিকল্পনা। এমতাবস্থায় ট্রাম, যা কিনা বিদ্যুতে চালানো যায় সেরকম পরিকাঠামোর ভিত্তি থাকার পরেও তা তুলে দেবার সিদ্ধান্ত একধরনের হঠকারিতা। আমাদের শহরে মেট্রো সম্প্রসারণ হয়, কিন্তু ট্রাম লাইন সম্প্রসারণের কথা ভাবা হয় না। বাড়ানোই যেত ট্রামের সংখ্যা, যাতে ট্রাম পাওয়ার সুযোগ নিয়ে মানুষকে ভাবতে হতো না। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে আনা যেত উন্নত মডেলের ট্রাম অথবা নিজেদের রাজ্যেই খোলা যেত নতুন শিল্প। সঠিক পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে ট্রাম লাইন, বাস লাইন আলাদা করে দেওয়া যেত এবং তাতে আরও ভালোভাবে ট্রাফিক পরিচালনা করা যেত। কিন্তু সেসব উদ্যোগ নেওয়ার এবং কার্যকরী করার ভাবনা তো প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেখাই গেল না। কেন এবং কার স্বার্থে, সেসব প্রশ্নও চাপা পড়ে যাবে। ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি, রাজ্যে বহু মেধা এবং টাকা খরচ হয় পৃথিবীর বাইরে স্পেস স্টেশন পাঠানো যাবে কিনা সেইসব সংক্রান্ত গবেষণায়। সেই গবেষণার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়েই প্রশ্ন থাকে, কিছু বাজেট, কিছু সময়, কিছুটা মেধা কি কলকাতা মেট্রোর পুনঃসংস্করণের জন্যও বরাদ্দ করা যেত না? প্রশাসনের অক্ষমতা তো বটেই, দায় আমাদের নাগরিক সমাজেরও।

ভিয়েনার ট্রাম

আমরা হারালাম আমাদের ১৫০ বছরের ঐতিহ্য, আর পেলাম পরবর্তী প্রজন্মকে আরও খানিক দূষিত বাতাস দেওয়ার দায়ভার। অনেক বছর পর কলকাতার পাশে মফসসলে বড় হওয়া আমি গল্প বলব কোনও এক শিশুকে, বাবা একদিন নতুন ফ্রক, পায়ে মোজা-জুতো পরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ট্রাম চড়াতে। সুখের স্মৃতি সঞ্চারিত করা সহজ, যদিও আমাদের বিশুদ্ধ পরিবেশ দিয়ে যাবার অঙ্গীকার ছিল!

লিখেছেন
Sangita Dhara
Sangita Dhara
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।