মিথ্যে অপবাদের জেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছিল এই প্রতিভাবান কবিকে

Debabrata Mondal
৩ মিনিট
মিথ্যে অপবাদের জেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছিল এই প্রতিভাবান কবিকে

অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। না, প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে রোদ্দুর হওয়া হয়নি তার। ইঁদুর দৌড়ের পৃথিবী তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল একটা অন্ধকুপের দিকে। টমাস চ্যাটার্টনের গল্পটাও অনেকটা সেরকমই। রোদ্দুরের কথা ভাবতে ভাবতে তিনিও একদিন হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজেকে। ক্ষান্ত বর্ষণ, কাকডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুরও তখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল টমাসের থেকে। তখন একদম একা তিনি, একাকিত্বের অন্ধকার যেন গ্রাস করেছিল তাঁকে।

সালটা ১৭৫২। সময়টা শীতকাল। গোটা ব্রিস্টল শহর পাড়ি দিয়েছে ঘুমের দেশে।বছরের অন্যান্য সময় যে ব্রিস্টল সামান্য নিঃশ্বাস নেওয়ার ফুরসত পায় না, সেই ব্রিস্টল যেন সেদিন তার সমস্ত ব্যস্ততা জমা রেখেছে শীতঘুমের জন্য। এমনই এক দিনে টমাসের জন্ম ব্রিস্টল শহরের একপ্রান্তে। জন্মের পরে বাবাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি টমাসের। মা সামান্য সেলাই করে সংসার-সীমান্তে এক অসম লড়াই চালাতেন প্রতিনিয়ত, আর এই দারিদ্রের মাঝেই বেড়ে ওঠা টমাসের। কৈশোরে পা দিচ্ছেন যখন টমাস, তখনও লড়াই শেষ হয়নি টমাসের মায়ের। পরিবর্তন হয়নি নুন আনতে পান্তা ফুরয় অবস্থারও। ফলে, কিশোর টমাস রাস্তায় নেমেছিলেন, কাজের তাগিদে। তখনও ভাগ্যের চাকা ততটা বিরূপ নয় তাঁর, কাজ জুটে গেল একটা। স্থানীয় সেন্ট মেরি চার্চে পেজ বয়ের কাজ। তাতে সংসারের অবস্থা যতটা না ফিরেছিল, তার থেকেও টমাসের লাভ হয়েছিল বিস্তর। ফাদারের সাহচর্যেই অক্ষর পরিচয় তাঁর। যার ফলে সম্পূর্ণ অজানা এক জগতের দরজা এক নিমেষে উন্মুক্ত হয়ে যায় টমাসের কাছে। আর রহস্যময় সেই জগতের রহস্য ভেদ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে টমাসও।

অক্ষর পরিচয় তো হল, এরপরেই নিজের উৎসাহে চার্চের সমস্ত বইপত্র পড়তে থাকল ছোট্ট টমাস। নেপথ্যে ছিলেন চার্চের সেই ফাদার। তবে এই ফাদারের কাছেও অজানা ছিল টমাসের একটি প্রতিভা। সাত বছর বয়স থেকে কবিতা লিখতেন টমাস। তিনি যে অন্যান্য আর পাঁচজনের মতো হতে চাননি, তাঁর প্রতিভার জোর ছিল বলেই চাননি স্রোতে ভেসে যেতে। দশ বছর বয়সে টমাস অভূতপূর্ব এক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল। সেই কাঁচা বয়সেই লিখে ফেলল গোটা একখানা গীতিকাব্য। কাঁচা হিরে টমাস, ততদিনে তাঁকে চিনে ফেলেছেন চার্চের সেই ফাদার। এবার শুরু হল টমাসের আর এক জীবনযুদ্ধ। ফাদার বোধহয় অন্ধকারের শেষে আলোর বিন্দুটা দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর পরামর্শেই টমাস তাঁর পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রতিটি প্রকাশকের দরজায় কড়া নাড়তে থাকলেন, আর ক্রমাগত জুটতে থাকল ঘাড়ধাক্কা। কেউ পড়েই দেখেননি সেই পাণ্ডুলিপি।

কিন্তু ওই যে টমাস নতুন সকালের বার্তাবাহক, মেঘ ফুঁড়ে বেরবেন বলে তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। তাই এবার বড় বেশি দুঃসাহসিক এক কাজ করে ফেললেন কিশোর টমাস, যা পরবর্তীকালে তাঁকে ঠেলে দেবে আরও একক যাত্রার দিকে। পৃথিবীর কাছে তিনি পরিচিত হবেন এক দুর্ধর্ষ প্রতারকরূপে।

টমাসের ছিল ঈশ্বরদত্ত প্রতিভা। প্রতিটি প্রকাশকের অপমানের জবাব দিতে তিনি তিনশো বছর পূর্বের ইংরেজি সাহিত্যের ভাব, ছন্দ নকল করে লিখে ফেললেন একখানি দীর্ঘ গীতিকবিতা। না এখানেই থেমে থাকলেন না, প্রাচীন তুলোট কাগজকে জলে ভিজিয়ে রোদে শুকিয়ে আরও প্রাচীন করে তুললেন। তারপর সেই পাণ্ডুলিপি পাঠালেন হোরেস ওয়ালপলের কাছে। ওয়ালপল তখন একজন সাহিত্য-বোদ্ধা। তিনি পর্যন্ত স্তম্ভিত। তৎকালীন একটি পত্রিকায় তিনি লিখলেন, সেন্ট মেরি চার্চ থেকে আবিষ্কৃত এই পাণ্ডুলিপি পঞ্চদশ শতকের এক প্রতিভাধর কবির পাণ্ডুলিপি।

সমগ্র সাহিত্য সমাজ যখন উদ্বেল এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে, তখন কিশোর কবি টমাস দেখালেন তাঁর তুরুপের তাস। আবার চিঠি গেল সেই ওয়ালপলের কাছে। যে ওয়ালপল বলেছিলেন, এই পাণ্ডুলিপির কবি জিওফ্রি ও শেক্সপিয়রের মধ্যবর্তী সময়ের। টমাস এবার দাবি করলেন, আদতে এই পাণ্ডুলিপি তাঁর। এমনকী, কীভাবে তিনি তা লিখেছেন, তাও বিস্তারিতভাবে জানালেন সমালোচকদের। কিন্তু না, যে সমালোচকরা এতদিন এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে নানা গালভরা কথা বলেছিলেন, তারা যদি আজ মেনে নেন, এই অমর পাণ্ডুলিপির সৃষ্টিকর্তা এক কিশোর, যে কিনা চার্চে মালীর কাজ করে– তাহলে তো তাঁদের সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। ফলে টমাসের কপালে আবার জুটল ধিক্কার আর অপমান। টমাসকে দাগিয়ে দেওয়া হলো শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রবঞ্চকরূপে।সমালোচকরা দাবি করলেন টমাসের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যে। এই পাণ্ডুলিপির লেখক নিঃসন্দেহে পঞ্চদশ শতাব্দীর কোনও এক কবি।

টমাসের বয়স তখন ১৮। স্বপ্ন পূরণ আর হল না তাঁর। একাকিত্ব, মিথ্যে অভিযোগ, অপমান, অপবাদ আর স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা অনেক আগেই তাঁকে শেষ করে ফেলেছিল। এবার চিরদিনের মতো হারিয়ে গেলেন টমাস নামের সেই অসীম প্রতিভাময় কবি। আত্মহত্যা করলেন তিনি। সুইসাইড নোটে সে লিখে গিয়েছিল একটি লাইন– “আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী ইংরেজি সাহিত্যের বর্তমান যুগের তথাকথিত মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতেরা!”

কিন্তু সময় থেমে থাকেনি। ১৮৭১ সালে স্ফিট নামের এক পণ্ডিত গবেষণা করে জানালেন, এই পাণ্ডুলিপি পঞ্চদশ শতকের কোনও কবির নয়, এর লেখক সেই টমাস।যে আত্মহত্যা করেছিল একরাশ বঞ্চনা মাথায় নিয়ে।

টমাস তো শুধু একজন লেখক বা কবি নয়, সে যেন জগতের প্রতিটা অপমানিত লাঞ্ছিত কবির প্রতিভূ। শেষ পর্যন্ত রোদ্দুর হওয়া হয়নি তাঁর, কিন্তু সেইসব পণ্ডিত বা প্রকাশকদের মোক্ষম জবাব দিয়েছিল ইতিহাস।

তথ্যসূত্র: ‘প্রবঞ্চক’. নারায়ণ সান্যাল

লিখেছেন
Debabrata Mondal
Debabrata Mondal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।