কোনও কথাই নতুন নয়, এই কথাটাই বুঝেছি

Year End 2023 : প্রতি বছরই মনে হয় মাথার উপর একটা তাক খালি হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ আমরা একা হয়ে যাচ্ছি, ফাঁকা হয়ে যাচ্ছি।

Yashodhara Roychowdhury
৪ মিনিট
কোনও কথাই নতুন নয়, এই কথাটাই বুঝেছি

বাহাত্তর চ্যানেলের আগে, মানে প্যালিওলিথিক যুগে, মানে আশির দশকে আমার ছাত্রজীবনে একটি টিভি-চ্যানেল নতুন উঠেছিল। নাম তার ডিডি থ্রি। সেখানে মাঝে মাঝেই নাসিরউদ্দিন-স্মিতা পাটিল জাতীয় আর্ট ছবি দেখান হত। আর ন্যাশনাল চ্যানেলে এক নব্য টিভি-অনুষ্ঠান আমাদের প্রাণ ছিল। আমাদের তখন ডিডি ওয়ান, ডিডি টু আর নতুন ওই থ্রি, এই তিনটিই মাত্র চ্যানেল। তা সেই শুক্রবার সন্ধের নতুন শো-এর নাম 'দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক'। প্রণয় রায় নামে এক উঠতি যুবা আমাদর মেধা ও হৃদয় শাসন করছেন তখন। টেলিভিশন বিষয়টি তখনও নতুন। ওই আর কি ধরণী যখন তরুণী ছিল স্টাইলে।

যে কথা বলতে এত বেশি গৌরচন্দ্রিকা, তা হল, বৎসরান্তে ওই ন্যাশনাল চ্যানেলে প্রণয় রায়ই শুরু করেন এক অনুষ্ঠান। ৩১ ডিসেম্বর রাতে সেইটি দেখবার জন্য আমাদের প্রাণ আকুলি-বিকুলি করতে শুরু করল প্রায় প্রতি বছরই। অসাধারণ সেই 'দ্য ওয়ার্ল্ড দিস ইয়ার'। এক বছরে কী কী ঘটে গেছে তার খতিয়ান। দেখতে দেখতে আমরা বলতে থাকতাম, ওই দেখ, জানুয়ারিতে যে সেই দাঙ্গাটা ঘটেছিল, ভুলেই তো গিয়েছিলাম! আর এবছর কি শিল্প জগতের সমস্ত রথী-মহারথীকেই যেতে হল? অহো! ওই সিনেমাটা অসাধারণ হয়েছিল! আরিব্বাস জুহি চাওলার এই লুকটাই ট্রেন্ডিং ফ্যাশন ছিল নাকি? এইসব আর কি! গোটা একটা বছরের সারা পৃথিবীর যুব-আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক ক্যু থেকে সামাজিক ক্যু, সবই দেখা হত এক লপ্তে।

আজ অসংখ্য চ্যানেলের অসংখ্য বার্তা, প্রতিটি খবরের কাগজের পাতাজোড়া ওই ধরনের ক্লিপিং, সেই একটি চ্যানেলের একটি অনুষ্ঠানের মজাটাকেই নষ্ট করে দিয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তিরচিহ্ন: যশোধরা রায়চৌধুরী

Bengali Short Story: এক বছর আয়না দেখার সাহস পায়নি রুমা। ব্যান্ডেজের তলায় ঢাকা মুখটাকে অন্যের মুখ মনে হতো।

সত্যি করে ভেবে দেখলে যত বয়স বাড়ছে তত বুঝতে পারছি─আসলেই কি কিছু এসে যায়? পয়লা জানয়ুারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর─ব্র্যাকেটের মধ্যে বেঁধে রাখা এক একটা বছর শুধু একটা তারিখ বা সংখ্যার চেয়ে বেশি কোনও অর্থ কি রাখে আদৌ? প্রতি বছরই মনে হয় মাথার উপর একটা তাক খালি হয়ে যাচ্ছে। বয়স্ক মানুষেরা চলে যাচ্ছেন। ক্রমশ আমরা একা হয়ে যাচ্ছি, ফাঁকা হয়ে যাচ্ছি । কিন্তু এও তো নিয়তি-নির্দিষ্ট এবং অমোঘ। নতুন কিছু নয়, শুধুই পুনরাবৃত্তি। দেখতে দেখতে বছরগুলো হু হু করে বেরিয়ে যায়, খুব জোরে টান দেওয়া ফিল্মের ছবির মতো দ্রুত। ছবিগুলো অস্পষ্ট। ছোটবেলায় যেমন ছিল, জন্মদিন পালন। বড়বেলায় এসে বছরের জন্মদিন পালন। আমাদের ছোটবেলার নিশানা দেওয়া দেওয়া খোপগুলো তৈরি করেছে কে? জন্মদিনগুলোই তো?

একের পর এক জন্মদিন, কিম্বা নিউইয়ার, এক এক ধরনের ঔপনিবেশিক খেয়াল অথবা 'চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি' বলে কোনও জাতীয়তাবাদী তেড়ে-ফুঁড়ে উঠতে পারেন এখন! রাস্তায় মাইলফলকের মতো, মানুষের সভ্যতার তৈরি কৃত্রিম ক্যালেন্ডারের মতো, মাইল-কিলোমিটার-মিটার-লিটার-গ্যালনের মতো, বছর-মাস-সপ্তাহের হিসেবের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্মৃতিকেও মাপে মাপে কেটে বসানোর চেষ্টা আসলে কত যে ভুল! কোনও স্মৃতি জ্বলজ্বল করতে থাকে, যেন এই সেদিন, কোনও স্মৃতি থাকেই না, অথবা ভাবলে মনে হয়, যেন বড্ড বেশি দূর। এই তো সেদিন আমার বাড়িতে এসেছিল দু-তিনটি কিশোর। সন্দেশ পত্রিকার 'পত্রবন্ধু চাই' বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে চিঠি লেখা পত্রবন্ধু থেকে প্রথম 'ছেলেবন্ধু’-তে, যাকে বলে দেঁড়েকশে, ‘উত্তীর্ণ’ হয়েছিল। একজন এখন টিভি পার্সোনালিটি, একজন ফিল্ম-বিশেষজ্ঞ। তো, সেই বন্ধুদের পাঠানো চিঠি, রঙিন লেফাফা, আমার ছাপছোপ মারা চিঠি লেখার কাগজগুলো, একেবারে তামাদি এখন। একদা আমাদের কত না সৃষ্টিশীলতা চুঁইয়ে দিয়েছি নিজেরা গ্রিটিং কার্ড তৈরিতে, কাগজ কেটে আঠা দিয়ে লাগিয়ে। সব তো মনে হচ্ছে এই সেদিন ঘটেছে। অথচ মাধ্যমটা, এই কাগুজে চিঠি, হাতে পাঠানো চিরকুট, গোলাপি কাগজে লাল অক্ষরে লেখা পেরেমপত্তর, নববর্ষের 'প্রণাম লইও' সহ হলুদ পঁচিশ পয়সার পোস্টকার্ড, আর জন্মদিনে বন্ধুকে পাঠানো হাতে তৈরি নববর্ষের গ্রিটিং কার্ড, সব শুদ্ধু এই মাধ্যমটাই শেষ, অবলুপ্ত, এক্সটিংক্ট। ডোডোপাখির মতো।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দূরে থাকা মানে বিচ্ছিন্ন থাকা নয়, শঙ্খ ঘোষের চিঠিতে স্মৃতির ঘর

Sankha Ghosh: 'অনেক সময়ে এমন সব কথাবার্তা উঠে আসে, যার মধ্যে জোর থাকে অনেক কিন্তু বিশ্বাস থাকে কম': শঙ্খ ঘোষ

যেভাবে সেই রথের মেলায় হাতের ওপর লাগানোর জলছবিগুলো অথবা বইটইতে লাগানোর প্লাস্টিকের স্টিকার এখনও পুরনো বইয়ের আলমারিতে দু-একটা লাগানো আছে। বইয়ের ভাঁজে রাখা সুতো দিয়ে বানানো রাখী, টুথব্রাশ নিয়ে বসে বসে প্রায়শই পালিশ করতাম যেগুলো। রথের দিন, রাখীর দিন ফেসবুকে গোছা গোছা ছবি আর দিবসের শুভেচ্ছা পোস্ট করার চাইতে এই দিবস-পালনগুলো অনেক বেশি ঘেঁষাঘেঁষির, ওমের, উষ্ণতার বলে, ওগুলোও এক একটা নতুন করে জন্মদিন-বড়দিন-নিউইয়ার ডে ছিল যেন, ছোটবেলা থেকে বড়বেলায় এগোনোর।

এখনো কত কাছের হয়ে আছে সেই সব মুহূর্ত, যেগুলোতে লেগে থাকে শিশিরের মতো উজ্জ্বল সব ভালবাসা, হাসি আর আনন্দের ফোঁটা। আর কত দূরে চলে গেছে ভুলভাল সম্পর্ক, হেরে যাওয়া, ঠকে যাওয়া, বিশ্রি লাগার অনুভূতিরা। সময় ও স্মৃতির এই বিশ্বাসঘাতকতা, ভালগুলো মনে রাখা আর খারাপগুলো ভুলে যাওয়ার অবধারিত বিশ্বাসঘাতকতা, আমাকে তীব্রভাবে মনে করায়, সময় কত ইলাস্টিক। স্মৃতি আসলে চ্যুইংগাম। টেনে লম্বা হয়ে গায়ে লেপ্টে থাকে, কিছুতেই ফুরোয় না। চ্যুইংগাম বলতেই মনে হল কী যেন একটা নতুন কথা বল্লুম। কলার উঁচু করার আগেই আবার মনে হল, ওটাও তো রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন কোনও না কোনও গানে, অথবা কোনও না কোনও কবি কোনও কবিতায়, অথবা সালভাদর দালির গলে যাওয়া ঘড়ির ছবিটাও মাথায় এসে যেতে পারে কারও, আর অমনি আমার বলাটা হয়ে যাবে টুকলি।

আমার কথাটা যে আদৌ নতুন নয়, কোনও কথাই যে আদৌ নতুন নয়, সব কথাই আসলে আগের কারও না কারও কোনও না কোনও ভাবা-কথা-ছবির কপি─এটাই সত্যি। হুশ করে কেটে যাওয়া কুড়ি-পঁচিশ-তিরিশ-পঞ্চাশ বছর ঠেঙিয়ে এসে এটুকুই জেনেছি।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।