কমছে ওলা-উবেরের দাপট, শহরের পথে এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নস্টালজিয়ায় ভরা হলুদ ট্যাক্সি

ট্রাম দেখব
আর জীবনানন্দের জন্য আমার মায়া হবে খুব।
কখনও খিদে-পেটে বসন্ত কেবিনের কাটলেট,
কখনও গিরিশমঞ্চে নাটক, নন্দনে সত্যজিতের ছবি,
সারা দুপুর পড়ে থাকব বইয়ের ওপর উবু হয়ে
বইপাড়ায়।...

 

এটাই তো কলকাতা! কোনও অখ্যাত শিল্পীর তুলির আঁচড়ে এই শহরের ছবি আঁকা হলে, কিংবা শহর নিয়ে কফি কাপে তুফান উঠলে, আসবে শহরের বুক চিরে হলুদ ট্যাক্সির গর্বিত সফরের কথা। আসবে তার রোম্যান্টিকতার কথা। কারণ অ্যাপ ক্যাব কিছুদিন হলুদ ট্যাক্সিকে লাল চোখ দেখালেও, একথা জোর গলায় বলা যায়, কলকাতার আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হলুদ ট্যাক্সি। কলকাতার কথা বললেই যেমন প্রথমে মনে আসে ফুটবল, রসগোল্লা কিংবা রবীন্দ্রনাথ, ঠিক তেমনই হলুদ ট্যাক্সিও তাদেরই মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে দশকের পর দশক ধরে। হুগলি নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই জনজীবনের সঙ্গে হলুদ ট্যাক্সির সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

 

করোনার প্রকোপের আগে থেকেই অ্যাপ ক্যাবের দাপট বাড়ছিল, অতিমারী তা ত্বরান্বিত করল। এখন তাদেরও মন্দা। যাত্রী খুইয়ে সংকটে ভুগছে অ্যাপ-ক্যাব। অতিমারী-পূর্ব পরিস্থিতির তুলনায় শহরে তাদের যাত্রী সংখ্যা কমেছে ৩০-৪০ শতাংশ। বহু ক্যাবমালিক ও চালক ঋণ-প্রদানকারী সংস্থার কিস্তির টাকা মেটাতে না পেরে গাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে অন্য পেশায় চলে গিয়েছেন বলেও খবর। তা সত্ত্বেও টিকে থাকা চালকদের আয় আশানুরূপ হচ্ছে না, মানছেন প্রায় সব অ্যাপ ক্যাব-চালক সংগঠনের নেতৃত্ব।

 

আরও পড়ুন: কলকাতার গর্ব ট্রাম এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে? মুছে যাচ্ছে যে স্মৃতিগুলো

 

গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন, শপিং মল এলাকায় যাত্রীদের একাংশ তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে হলুদ ট্যাক্সির দিকে ঝুঁকছেন বলেও জানা যাচ্ছে। হলুদ ট্যাক্সির চালকদের অনেকেই অ্যাপ ক্যাবের তুলনায় ভাড়া কম নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে যাত্রীদের দাবি, বাড়ি থেকে যাত্রী তোলা এবং বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্নে হলুদ ট্যাক্সি এখনও পিছিয়ে। যদিও ব্যস্ত এলাকার মধ্যে সফরে তাদের সঙ্গে দর কষাকষির সুবিধা পাচ্ছেন যাত্রীরা। অ্যাপে যে দূরত্ব যেতে ১৭০ টাকা দেখাচ্ছে, সেই দূরত্বই ক্ষেত্রবিশেষে হলুদ ট্যাক্সিতে ১০০-১২০ টাকায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে বলে যাত্রীদের দাবি।

 

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে আয়ে টান পড়েছে অ্যাপ ক্যাব চালকদের। সারা দিন গাড়ি চালিয়ে আগে যেখানে দেড় থেকে দু’হাজার টাকা আয় হতো, এখন সেখানে সব খরচ বাদ দিয়ে আয় ঠেকেছে সাড়ে সাতশো থেকে হাজার টাকায়। তা বজায় রাখতে গিয়ে এসি না চালানোয় যাত্রীদের অনেকের কাছেই অ্যাপ-ক্যাবের আকর্ষণ ফিকে হয়েছে। ফলে এখন যে হলুদ ট্যাক্সিচালকরা পরিস্থিতির সুযোগ নেবেন, তা বলাই বাহুল্য‌।

 

কলকাতার বুকে প্রথম ট্যাক্সি চলে ১৯০৯ সালে। এখন যেখানে ফ্রাঙ্ক রস কোম্পানির ওষুধের দোকান, চৌরঙ্গী রোডের সেখানেই ছিল ফরাসি শেভিজাঁ কোম্পানির অফিস। তারাই কলকাতার পথে প্রথম ট্যাক্সি নামায়। তখন চৌরঙ্গী থেকে মিটারগেজ এই গাড়িগুলো যেত দমদম, বারাকপুর হয়ে বজবজ পর্যন্ত। দুই সিলিন্ডারের ছোট্ট ‘ক্যারন’, গাড়িগুলোয় মাত্র দুইজন যাত্রী বসার সুযোগ থাকত।

 

ব্রিটিশ আমলের অনেক ব্যবসার মতোই স্বাধীনতার পর প্রায় হারিয়েই যাচ্ছিল কলকাতার ট্যাক্সি। আর সেই সময়, অর্থাৎ ১৯৫৭ সালে হিন্দুস্তান মোটর কোম্পানি তৈরি করে অ্যাম্বাসাডর মডেল গাড়ি। এটিই হলো ভারতের প্রথম মেড-ইন-ইন্ডিয়া গাড়ি। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দমোটরে এই গাড়ি অ্যাসেম্বল করা হত। আর সেই সূত্র ধরে হিন্দমোটর পারিপার্শ্বিক এলাকাটা জমজমাট শহরে পরিণত হয়।

  
বছরকয়েকের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই অ্যাম্বাসাডর মডেলটি। গাড়িটি হয়ে ওঠে আভিজাত্যের প্রতীক। ১৯৬২ সালে কলকাতার ট্যাক্সি অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে এই অ্যাম্বাসাডর মডেল গাড়িকে ট্যাক্সিতে পরিণত করার প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে সেই বছরেই কলকাতায় নামে এই আইকনিক মডেলের গাড়িটি। ফলে খাবি খেতে খেতে বেঁচে যায় কলকাতার ট্যাক্সি। ট্যাক্সির হলুদ রং নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল রয়েছে, বলা হয় হলুদ রং খুব সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাই এর রং হলুদ রাখা হয়েছিল। যদিও প্রথম দিকে এই ট্যাক্সি ছিল কালো এবং হলুদ রঙের। কালো-হলুদ ট্যাক্সি শুধু শহরের মধ্যে চলাফেরা করত আর হলুদ ট্যাক্সি চলে যেত শহর থেকে দূর-দূরান্তে। তারপর কখন যে আস্তে আস্তে কালো রঙের ট্যাক্সি পাল্টে হয়ে গেল হলুদ। আমদানি হল নতুন হলুদ ট্যাক্সিরও। হলুদ ট্যাক্সি হয়ে ওঠে শহর কলকাতার প্রাণ, তার সাক্ষী কলকাতাবাসী।

 

ছয়ের দশক থেকেই শহরে ক্রমশ বাড়তে থাকে ট্যাক্সির সংখ্যা। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর ট্যাক্সির জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত। বলা হয়, সাত-আটের দশকে এই এলাকার বাসিন্দাদের বেশিরভাগই ছিল শিখ। এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট বলা হয়, ছয়ের দশকের শুরুতে কলকাতায় শিখ সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ ছিলেন ট্যাক্সিজীবী। সেই কারণেই ভবানীপুর হয়ে ওঠে শিখদের প্রধান অঞ্চল। কলকাতাবাসী ভালোবেসে তাঁদের 'সর্দারজি' বলে ডাকত। ফেলুদার কলকাতার গল্পেও এমন সর্দারজির দেখা মেলে।

 

১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় হিন্দি ছবি 'হাওড়া ব্রিজ' প্রধান চরিত্রে অশোককুমার আর মধুবালা। এই ছবিতে দেখানো হয় হলুদ ট্যাক্সিকে। গোটা দেশের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে এই হলুদ যানটি। ১৯৯২-এ ইংরেজি ছবি 'সিটি অফ জয়'-এ কলকাতার ট্যাক্সিজীবন দেখানো হয়। মুগ্ধ হয়েছিল গোটা বিশ্ব। সেই ছবি অলটাইম ক্লাসিক। দুনিয়ার ছবিঘরে চলতে লাগল শহর কলকাতার হলুদ ট্যাক্সির অভিযান। এছাড়া অপর্ণা সেনের '৩৬ চৌরঙ্গী লেন'-এ ট্যাক্সির ভেতর প্রেমিক-প্রেমিকার রোম্যান্টিক সিন এখনও সিনেমাপ্রেমীদের স্মৃতিতে গাঁথা, 'ক্যালকাটা মেল', 'পরিণীতা' ছাড়াও বহু সিনেমায় দেখা যায় এই ঐতিহ্যবাহী হলুদ ট্যাক্সিকে।

 

ট্রাফিক কন্ট্রোল বোর্ডের আপত্তি সত্ত্বেও হাতে টানা রিকশা, ট্রামের মতো কলকাতার বুকের থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়নি হলুদ ট্যাক্সিকেও। অ্যাপ ক্যাব, বাইক-ট্যাক্সির সঙ্গে পাল্লা দিয়েও বাজারে টিকে আছে হিন্দুস্থান মোটরসের এই মডেলটি। প্রতিযোগিতার বাজারে ঘটে গেছে বেশ কিছু বিবর্তন। আজকাল মিটার ট্যাক্সির থেকে অনেকেই প্রিপেইড ট্যাক্সি-ই বেশি পছন্দ করেন। রাস্তা খুঁজতে ব্যবহার করা হয় স্মার্ট ফোন। মহানগরী কলকাতার ট্যাক্সি বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে হলুদ ট্যাক্সির ছবি। হাত তুললেই দাঁড়িয়ে যায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ট্যাক্সিচালকদের খারাপ ব্যবহার, দৌরাত্ম্য ইত্যাদি মাথায় রেখেও কলকাতাবাসী ট্যাক্সিকে নিজের মনে করে। বিদেশি পর্যটকরা শহরে এসে হলুদ ট্যাক্সিতে শহর পরিক্রমা করবেন না, তা হয় না কি! তাই তো কলকাতার বুক চিরে হলুদ ট্যাক্সির এত লম্বা সফরের ইতিহাস।

 

 

 

More Articles

;