ক্ষমতার লাথি খাওয়া নাস্তিক দর্শনকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছিলেন আকবর

Akbar and Chárváka Philosophy: যে দর্শন পছন্দ হয় না, ভগবানের নাম যেখানে নেই- তাকেই 'ইহসুখবাদী' ছাপ মেরে দাও।

Atri Bhattacharya
৪ মিনিট
ক্ষমতার লাথি খাওয়া নাস্তিক দর্শনকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছিলেন আকবর

ভারতীয় দর্শনের বস্তুবাদী লোকায়ত ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী ছিলেন চার্বাকরা, যাদের আর্বিভাব ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মমতের সমসময়েও এই নাস্তিক-বস্তুবাদী দর্শনের অবশেষের খোঁজ পাওয়া যায় খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকে। কিন্তু ষোড়শ শতকের শেষে, এই চার্বাকরা পুনরায় দেখা দিয়েছিলেন মুঘল সম্রাট জালালউদ্দিন মহম্মদ আকবরের ফতেপুর সিক্রির রাজদরবারে এবং তারা অংশগ্রহণ করেছিলেন বিবিধ ধর্মদর্শনের মধ্যে আয়োজিত একটি বিতর্কসভায়। ভারতীয় বস্তুবাদী দর্শনের এই সমান্তরাল ইতিহাস- ইউরোপিয় আধুনিকতার তাত্ত্বিকদের কাছে বহুদিন অবধি অপরিচিত ছিল।

স্টিফেন গ্রিনব্লাট রচিত- The Swerve: How the World Became Modern (২০১১) বইটি ইউরোপিয় বস্তুবাদের আদিযুগ প্রসঙ্গে জনমানসে পুনরায় চর্চার সূত্রপাত ঘটায়। রেঁনেসা থেকে উদ্ভূত আলোকায়ন-প্রক্রিয়ার উপর প্রাচীন বস্তুবাদী দার্শনিক ডেমোক্রিটাস, লুক্রেটিয়াস, এপিকুরাসদের প্রভাব পুনরালোচিত হতে শুরু করে। কিন্তু সেই আলোচনাগুলি কেবলমাত্র ইউরোপিয় পরিপ্রেক্ষিতেই থেমে যায়। আকবরের দরবারি বিতর্কসভায় চার্বাকদের আগমনের আখ্যান প্রশ্ন তোলে গ্রিনব্লাটের প্রতিপাদ্যের প্রতি- ইউরোপের মতো মুঘল আমলেও কি বস্তুবাদের 'নবজাগরণ' ঘটেছিল? রেঁনেসাকে বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে বোঝার জন্য, বহু ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে একইসময়ে বস্তুবাদের সমান্তরাল চর্চাকে লিপিবদ্ধ করার জন্য, পাশ্চাত্যের চশমায় এশিয়দের জ্ঞানচর্চাকে দেখার ভঙ্গিকে প্রশ্ন করার জন্য এই ঘটনাটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। এই কাজটিই করেছেন হানা চ্যাপেল ওয়েজেহস্কি, তাঁর 'East-­ West­ Swerves:­Cārvāka­ Materialism­ and­ Akbar’s­ Religious­ Debates­ at­ Fatehpur­ Sikri' প্রবন্ধে।

১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর নিজের রাজদরবারে বিভিন্ন ধর্মীয় মত ও দার্শনিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিতর্কের পথ খুলে দিয়েছিলেন। এই বহুত্ববাদী কথোপকথনে সুফি, সুন্নি, শিয়া প্রভৃতি ইসলাম-পন্থার সঙ্গে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন হিন্দু, জৈন, পারসিক, জরাথ্রুস্টিয়, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের। আবুল ফজল আকবরনামায় জানিয়েছেন, এই বিতর্কসভায় উপস্থিত ছিলেন চার্বাক-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি। হেনরি ব্যাভেরিজের সম্পাদনায় আকবরনামার অনুবাদ (১৯৭৭) থেকে জানা যাচ্ছে, আবুল ফজল উপস্থিতির তালিকায় লিখছেন- 'Sufi philosopher, orator, jurist, Sunni, Shia, Brahmin, Jati, Siura, Carbak, Nazarene, Jew, Sabi, Zoroastrian, and others'..

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মজেছিলেন আকবর থেকে রানি ভিক্টোরিয়া! খিচুড়ির অবাক করা ইতিহাস আজও অজানাই

Origin of Khichdi: ফজল প্রতিদিন ৩০ মণ খিচুড়ি রান্না করতেন। তাঁর বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া যে কেউ নাকি চাইলেই সেই খিচুড়ি খেতে পারতেন।

এপিকুরাসের দর্শন যেমন খ্রিস্টিয় পশ্চিমাবিশ্বে দেহাত্মবাদী/সুখবাদী দর্শন হিসাবে পরিচিত, এই বেদান্তবাদী দেশে চার্বাকের পরিচিতিও তেমনই। আবুল ফজলের সাক্ষ্য এই দার্শনিক-সম্প্রদায়ের একদা লুপ্তধারার সম্পর্কে ও পুনরুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে একটি নতুন দৃষ্টান্ত হাজির করে। অর্থাৎ, ব্রাহ্মণ্যবাদের করাল গ্রাসের মুখেও চার্বাকরা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাননি। দুভার্গ্যবশত, সেই বিতর্কসভায় চার্বাকরা কী বলেছিলেন তা নথিভুক্ত হয়নি। যদিও, আকবরনামার তৃতীয় খণ্ডে আবুল ফজল নাস্তিক ধারা হিসেবে চার্বাকদের খানিক বর্ণনা দিয়েছেন। যদিও, হিন্দুদের অন্যান্য গোষ্ঠী নিয়ে তিনি বেশ কয়েক পৃষ্ঠা লিখলেও চার্বাকদের নিয়ে লিখেছেন মাত্র কয়েকটি বাক্য। আবুল ফজল লিখছেন-

'Chárváka, after whom this school is named, was an unenlightened Brahman. Its followers are called by the Bráhmans, Nástikas or Nihilists. They recognize no existence apart from the four elements, nor any source of perception save through the five organs of sense. They do not believe in a God nor in immaterial substances, and aff i rm faculty of thought to result from the equilibrium of the aggregate elements. Paradise, they regard as a state in which man lives as he chooses, free from the control of another, and hell the state in which he lives subject to another’s rule. The whole end of man, they say, is comprised in four things: the amassing of wealth, women, fame and good deeds. They admit only of such sciences as tend to the promotion of external order, that is, a knowledge of just administration and benevolent government. They are some what analogous to the sophists in their views and have written many works in reproach of others, which rather serve as lasting memorials of their own ignorance.'

এই অনুবাদটি এইচ. এস.জ্যারেটের (১৯৮৩)। জ্যারেট বলছেন চার্বাকদের সম্পর্কে ফজলের ব্যাখা সম্পূর্ণ জায়েজ কারণ ভগবদ্গীতায় এই সম্প্রদায়কে ধিক্কার জানানো হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'অন্ধকার বলে কিছু নেই, আছে আলোর অভাব', বলতেন আজীবন মার্কসবাদী রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

Ramkrishna Bhattacharya: সাম্রাজ্যবাদের প্রতি, বৈষম্যর প্রতি, মানুষে মানুষে বিভাজনের প্রতি অধ্যাপক রামকৃষ্ণর ছিল অনির্বাণ ঘৃণা।

এটা এখনও ধোঁয়াশার যে, তিনি সত্যিই নিজে বিতর্কসভাটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন কিনা, নাকি সমাজের প্রচলিত মতামতগুলি থেকেই চার্বাকদের সম্পর্কে মতামত তৈরি করছিলেন। কিন্তু, সাধারণত মুক্তমনা হিসাবে পরিচিত আবুল ফজল তাই করেছিলেন যা চার্বাকদের সঙ্গে সকল প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান করা হয়েছিল। সে প্রসঙ্গে রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য তাঁর চার্বাকচর্চা বইটিতে লিখেছিলেন-

"চার্বাকসূত্র এখনও অবধি পাওয়া যায়নি। তবে বিরোধী পক্ষের কাব্য-নাটক ইত্যাদিতে ব্যঙ্গরূপ (প্যারোডি) পাওয়া যায়। ... চার্বাকমত ধর্মবিরোধী, ইহলোকসর্বস্ব, সুতরাং ইন্দ্রিয়সুখ ছাড়া এরা কিছু বোঝে না- এই বিকৃতি শুরু করেন বৈদান্তিক কৃষ্ণমিশ্র আর শ্রীহর্ষ। জৈন ঐতিহ্যে 'কলিকালসর্বজ্ঞ' হেমচন্দ্র থেকে চার্বাকদের হেয় করার জন্য তাদের ভোগসর্বস্ব বলে দেখানো শুরু হয়। ...যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা- ব্যপারটা এইখানেও এইরকম। যে দর্শন পছন্দ হয় না, ভগবানের নাম যেখানে নেই- তাকেই 'ইহসুখবাদী' ছাপ মেরে দাও।" (পৃ: ৮৫-৮৬)

একইসঙ্গে একথাও স্বীকার্য যে, সম্রাট আকবরের বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল ও সহনশীলতাই এমন প্রান্তজনের নাস্তি-দর্শনকে রাজসভার বিতর্কে ঠাঁই দিয়েছিল। এবং, হতেও পারে তাঁর দরবারের উলেমাদের রাজনৈতিক দখলদারি কমাতে, নিজের বহুত্ববাদী ধর্মচর্চাকে অব্যাহত রাখতে তিনি চার্বাকদের তর্কবিদ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য তাঁর Studies­ on­ the­Cārvāka/Lokāyata.­(২০০৯)- বইটিতে চার্বাক প্রসঙ্গে লিখেছিলেন-

"in as much as it shows that this system had definitely become a ‘lost philosophy’ by the sixteenth century and even the best pundits of north India had little idea of its tenets."

প্রকৃতই টীকাকার সদানন্দের 'বেদান্তসার' ও রামতীর্থের 'বিদ্বানমনোরঞ্জনী' এই বইদু'টি, যেখানে চার্বাকমতকে ভ্রান্ত বলা হয়েছিল সেগুলিই উত্তর ভারতে বেশি জনপ্রিয় ছিল। জনার্দন গানেরি তাঁর 'Emergentisms, Ancient and Modern.' (২০১১) প্রবন্ধে দেখিয়েছেন রামতীর্থের টীকাটিপ্পনীর প্রভাব উনিশ শতকের প্রাচ্যবাদীদের বিপুল প্রভাবিত করেছিল। রামতীর্থের বইটি প্রকাশিত হয় ১৮২৮-এ, ১৮৩২-এ ইংরেজি অনুবাদ হচ্ছে, ১৮৩৫-এর মধ্যেই হয়ে যাচ্ছে জার্মান অনুবাদ। ১৮২৭-এ হেনরি কোলব্রুক সাহেব, এই বইয়ের সূত্র ধরেই লন্ডনের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটিতে বক্তৃতা করছেন, ভারতীয় বস্তুবাদী, লোকায়ত দার্শনিক বৃহস্পতি প্রসঙ্গে। এটাও ভেবে দেখার, নাস্তিক-বিরোধী বৈদান্তিকের টীকা থেকে পশ্চিমাদের ভারতীয় বস্তুবাদ প্রসঙ্গে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। এহেন, সদাপ্রত্যাখাত, ক্ষমতার লাথি খাওয়া দর্শনকে বাদশাহ আকবর ক্ষমতায় কেন্দ্রস্থলে নিজের কথা বলবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

লিখেছেন
Atri Bhattacharya
Atri Bhattacharya
11 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।