কাঁচা খাবার রান্না করা শুরু হয়েছিল ঠিক কবে থেকে? যে রহস্য লুকিয়ে ভারতের রান্নার ইতিহাসে

Ancient India's food culture : সবজি, মশলা অথবা রান্নার আধার সব কিছুই নির্ভর করে কোনও রান্নার স্বাদের নেপথ্যে, জানেন ভারতে আজ যে রান্নার চল রয়েছে তার আসল ইতিহাস?

Kankana Mukherjee
৪ মিনিট
কাঁচা খাবার রান্না করা শুরু হয়েছিল ঠিক কবে থেকে? যে রহস্য লুকিয়ে ভারতের রান্নার ইতিহাসে

“আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না।

ইস্তাম্বুল গিয়ে জাপান কাবুল গিয়ে

শিখেছি সহজ এই রান্না..”, মান্না দে’র কণ্ঠে এই গান আজও কানে বাজে। সেই সুর, সেই ছন্দ যেন রান্নার গুরুত্ব নিমেষে বাড়িয়ে তোলে। রান্নাও হল এক ধরনের শিল্প, নাচ, গান, কবিতা, আঁকার মতোই এতেও যত্নের প্রয়োজন, প্রয়োজন জানা বেশ কিছু পদ্ধতির, তবেই স্বদযশে বশ মানানো সম্ভব। কিন্তু ভজহরি মান্না যেমন এদেশ বিদেশ ঘুরে ঘুরে রান্না শিখেছেন, তেমন রান্নার কথা নয়, এই প্রতিবেদনে বলা হবে ভারতীয় রন্ধন শৈলীর কথা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মজেছিলেন আকবর থেকে রানি ভিক্টোরিয়া! খিচুড়ির অবাক করা ইতিহাস আজও অজানাই

Origin of Khichdi: ফজল প্রতিদিন ৩০ মণ খিচুড়ি রান্না করতেন। তাঁর বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া যে কেউ নাকি চাইলেই সেই খিচুড়ি খেতে পারতেন।

রান্নার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরও অনেক অনুষঙ্গ। সবজি, মশলা অথবা রান্নার আধার সব কিছুই নির্ভর করে কোনও রান্নার স্বাদের নেপথ্যে। বিবিধের মাঝে যে মহা মিলনের কথা বারবার বলা হয় ভারতের প্রসঙ্গে তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এ দেশের সংস্কৃতি, স্থাপত্য, ঐতিহ্য এবং শিল্পশৈলীর যোগাযোগ। ভারতীয় রান্নার স্বাদ বলতে মূলত কয়েকটি আলাদা আলাদা ধরনের উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা - মিষ্টি, নোনতা, টক, ঝাল, তিক্ত বা তেঁতো। প্রতিটি স্বাদের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে কোনও না কোনও খাবারের বিশেষত্ব। যেমন ধরা যাক, প্রথম পাতে তেঁতো এবং শেষ পাতে মিষ্টি এটাই মেনে ছোলা হয়। এছাড়া ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের খাবারের মধ্যে রয়েছে কোনও না কোনও স্বাদের বিশেষত্ব।

প্রাচীন ভারত থেকে রান্না নিয়ে একটা সাধারণ রূপরেখা আঁকা রয়েছে। ভারতের উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ এবং পশ্চিমী রান্না, এই চারটি প্রধান আঞ্চলিক শৈলী লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর ভারত মানেই সেখানে মোঘল আধিপত্য ছিল প্রাচীন কালে, ফলে রান্নাতেও সেই ঐতিহ্য বহাল থেকেছে। তারই রান্নায় প্রথম জাফরানের ব্যবহার করেন। ঝোল জাতীয় রান্নাকে আরও থকথকে করতে খাঁটি ক্রিম, বাদাম, চারমগজ অথবা পোস্ট জাতীয় জিনিসের যে ব্যয়ভার আজকাল রান্নায় হামেশাই দেখা যায় তার শুরুটাও ইয় উত্তর ভারতের রান্নার হাত ধরেই। ঠিক যেমন নান বা রুটি জাতীয় খাবার এসেছে আফগান সংলগ্ন এলাকা থেকে। যদিও আজকাল ভারতের খাবারের তালিকা দেখলে বোঝা যায় না আলাদা করে, সর্বত্রই মিলেমিশে গিয়েছে বিভিন্ন খাবার।

দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের মধ্যে মূলত চাল এবং নারকেল থাকে। দক্ষিণ ভারতে যারা থাকেন তারা চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি খাবার খেতে বেশি পছন্দ করেন। এখানে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে চাল থেকে প্রস্তুত বিভিন্ন কিছু। এখানে নিরামিষ এবং আমিষ দুই ধরনের খাবারের প্রচলনই লক্ষ্য করা যায়। অপরদিকে পশ্চিম ভারতের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক খাবারের একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ অঞ্চলের খাবারের তালিকায় সামুদ্রিক খাবার গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তার কারণ অবশ্য সমুদ্রের অবস্থান। এখনকার আদিবাসীদের কাছে সহজলভ্য ছিল সমুদ্রের মাছ এবং বন থেকে আহরণ করা ফুল ফল মধু মূল ইত্যাদি ফলে তাদের খাবারের মধ্যে যে এগুলির প্রাধান্য বেশি লক্ষ্য করা যাবে সেটাই স্বাভাবিক।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
খাঁ খাঁ করছে রেস্তোরাঁ, সন্ত্রাসবাদের আঁচ জাপানের জনপ্রিয় সুশি খাবার নিয়ে! কী আসল রহস্য?

Sushi terrorism in Japan : ঠান্ডা ভাতের সঙ্গে ভিনিগার মিশিয়ে ছোট ছোট বলের আকারে গড়ে পরিবেশন করা হয় জাপানের এই বিখ্যাত পদ। এর সঙ্গে সঙ্গত করে সবজি, ডিম কিংবা কাঁচা সামুদ্রিক মাছের পুর। আর এই ঐতিহ্যবাহী খবর ঘিরেই কিনা ‘সুশি সন্ত্রাসবাদ’-এর আঁচ!

প্রাচীন পুঁথি ঘেঁটে ধারণা করা যায়, মূলত হরপ্পা যুগে ভারতীয় খাবারের ইতিহাস শুরু হয়েছিল। এর আগে রান্না করা খাবার খেত না আদিম গুহাবাসী মানুষ। এই সময়ে, প্রতিদিনের থালাগুলিতে প্রধান কিছু উপাদান রাখা হতো। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ছোলা, চাল, গম, মুসুর এবং বাজরার মতো কিছু শষ্য। এছাড়াও সেসময় খাবারের সঙ্গে ফলের রস এবং দারুচিনি ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথমদিকে এই সব সবজি মূলত সিদ্ধ আকারে খাওয়া হতো। পরবর্তীতে অভীষ্ট আফগানি সংস্কৃতির আগমনে গম থেকে রুটি বা নান জাতীয় পদ তৈরির অরিচন শুরু হয় ভারতেও। ফলে ভারতে ব্যবহৃত এই খাবার, রান্নার পদ্ধতি এবং উপাদানগুলি ধারাবাহিক ভাবে একটা বিবর্তনকে চিত্রিত করে।

আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে ভারতীয় রান্নাঘরে মিশেছে বিভিন্ন দেশের প্রভাব। যখন যেসব দেশ থেকে এদেশের বিভিন্ন জায়গায় উপনিবেশ স্থাপন করেছেন অন্যান্য দেশের মানুষেরা তখন তাদের সঙ্গে করে এদেশে এসেছে সে দেশের ঐতিহ্য সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাসও। ফলে ভারতের রান্নাঘরে মিলেমিশে গিয়েছে ব্রিটিশ, পর্তুগিজ, পার্সিয়ান সহ আরও অনেক দেশের খাবারের স্বাদ।

এছাড়া ভারতকে বলা হয় মশলার সাম্রাজ্য। “মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় বক্তৃতায় ভারতকে মশলার দেশ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, স্বর্গ দ্বারা সুগন্ধি,” পণ্ডিত জেমস ম্যাকহাগ লিখেছেন স্যান্ডালউড এবং ক্যারিয়ন: ভারতীয় খাদ্য ও সংস্কৃতিতে গন্ধ (২০১২)।ফলে একদিকে ফল শাক-সবজির প্রাচুর্য অন্যদিকে মসলার প্রাচুর্য তার সঙ্গে রয়েছে সামুদ্রিক মাছ মাংস এবং দুগ্ধজাত পদার্থ ফলত ভারতবর্ষের রান্নার ধারায় প্রাচীনকাল থেকেই ছিল নিজস্ব ঐতিহ্য। যা সময়ের সঙ্গে আরও আরও আধুনিক হয়েছে। তার সঙ্গে মিশেছে নতুনত্ব। দুই আলাদা স্বাদের মিশ্রণে আজকাল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কুইজন।

তবে এই এতো আলোচনার শেষ পাতে একটু মিষ্টির কথা না বললে আদতে অসম্পূর্ণ থেকে ভারতীয় খাবারের ইতিহাস। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মিষ্টির যোগ বেশি থাকলেও ভারতের ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে মিষ্টি খাওয়ার প্রসঙ্গ। ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন মিষ্টি মতিচূর লাড্ডু। বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। আধুনিক সন্দেশ-রসগোল্লার বয়স মাত্র দুই-আড়াই'শ বছর। এমনকী এই যে ছানার মিষ্টির চল এখন, সেটিও বাঙালিরা তৈরি করতে শিখেছে পর্তুগিজদের থেকে। তাদের কাছ থেকে বাঙালি ময়রারা ছানা ও পনির তৈরির কৌশল শেখে। ফলে তেঁতো থেকে শুরু করে মিষ্টি মুখ ভারতীয় খাবারের সব পদে রয়েছে একটা মিলনের প্রতিচ্ছবি। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেলে যা মুখে মুখে ঘুরছে আজও।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।

মল্লভূমে দুর্গাপুজোর সময় জানাত কামান, জলঘড়ি মাপত ক্ষণ

Bishnupur Durga Puja: বিষ্ণুপুররাজের কাছে একসময় প্রায় ১,২০০টি কামান ছিল বলে স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করেন। রাজা গোপাল সিংহদেবের (১৭১২–১৭৪৮) সময় সংখ্যাটা প্রায় দ্বিগুন হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

ব্যারিকেড ঘেরা দিল্লি, নজরদারির চোখে নাগরিক: নিরাপত্তা নাকি নিয়ন্ত্রণ?

Delhi Under Siege: জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লি কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছে। ৩৫ হাজার পুলিশ, কাঁটাতারের ব্যারিকেড, ড্রোন নজরদারি, ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ২৪ ঘণ্টার ইন্টারনেট শাটডাউন, ৭ হাজারের বেশি আটক। ওমর আব্দুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতির অভিযোগ তুলেছেন, দিল্লিতে 'কাশ্মীর মডেল'-এর প্রয়োগ চলছে।

দশমীতে দেবীর মূর্তি খণ্ড খণ্ড করে বিসর্জন! কোচবিহার রাজবাড়ির পুজোর বিচিত্র রীতি

Cooch Behar Rajbari Durga Puja: সালটা ১৮৮৭, বাকিংহাম প্যালেসের আদলে নির্মিত হয়েছিল কোচবিহার রাজবাড়ি। রাজবাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজ পরিবারের সদস্যদের নানা ঘটনা। রাজ পরিবারের এই পুজোয় মাকে নর-রক্ত দিয়ে অষ্টমীর গভীর রাতে পুজো করা হতো।

বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ভোগ: কোথাও কাঁচা ইলিশ, কোথাও শালু শাপলা

Bonedi Bari Durga Puja Bhog: এইবার পুজোর লেখা লিখতে গিয়ে ভাবলাম তাঁদের কথা বলি—আমাদের বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়ির পুজোর কথা। যাদবপুরের দত্ত বাড়ির পুজো— তাঁদের বাড়ি মা আসেন রাজবেশে। তাঁদের ভোগে প্রতিদিন তিনটি অন্ন থাকবে—ভাত, খিচুড়ি, পোলাও ও পরমান্ন। এ ছাড়া রোজ থাকবে কচুর শাক, এমনকী সন্ধিপুজোর ভোগেও কচুর শাক তাঁরা নিবেদন করেন।