কাশ্মীর থেকে মণিপুর, ক্ষমতার হাতিয়ার যখন 'ধর্ষণ'

Manipur Violence: কাশ্মীর থেকে দিল্লি, মণিপুর থেকে উত্তরপ্রদেশে, ছবিটা কিন্তু একই। প্রতিটা দাঙ্গা, প্রতিটা সাম্প্রদায়িক অশান্তি শেষে তাই এমন ধর্ষিত, ক্ষতবিক্ষত দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে রাস্তাঘাটময়।

Sohini Das
৪ মিনিট
কাশ্মীর থেকে মণিপুর, ক্ষমতার হাতিয়ার যখন 'ধর্ষণ'

'মানুষ বড় সস্তা কেটে ছড়িয়ে দিলে পারতো।'- আর সে যদি মেয়েমানুষ হয়, তাহলে তো কথাই নেই। তার উপর যদি সে 'নীচু জাত' হয়ে থাকে, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। সেই শরীর, সেই মেয়েমানুষের শরীরকে যেমন খুশি ছিঁড়েকুটে ভোগ করে ফেলে দেওয়া যায় আস্তাকুঁড়ে। আরও একটু দয়া হলে বেঁধে ফেলা যায় প্লাস্টিকের ব্যাগে। আর এই গল্পে আরও মশলা যোগ হতে পারে, তাতে যদি একটা সাম্প্রদায়িক হানাহানির কোণ গুঁজে দেওয়া যায়, কিংবা ঢুকিয়ে দেওয়া যায় প্রতিহিংসার অঙ্ক। তখন অপরাধের হিসেব-নিকেশ পাল্টে যায়। সংবিধানের সমস্ত আইনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায়। যেখানেই সাম্প্রদায়িক হিংসা, যেখানেই বদলার অঙ্ক, সেখানে এমন দু-একটা লাশ পড়ে। বড় বড় দেশে এমন অজস্র ছোট ছোট ঘটনা ঘটে হোরাশিও।

আসলে ধর্ষণ মানে শুধুই বিকৃতকাম কিংবা শারীরিক লালসা বা কামনা চরিতার্থ করা নয়। ধর্ষণের মধ্যে সার্বিক ভাবেই লুকিয়ে থাকে আসলে ক্ষমতাবানের শক্তিপ্রদর্শন। ধর্ষণ আসলে দুর্বলকে সীমানা বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, প্রতিহিংসার আগুনে সেঁকে নেওয়া ক্ষমতাবানের পুরুষত্বকে। কাশ্মীর থেকে দিল্লি, মণিপুর থেকে উত্তরপ্রদেশে, ছবিটা কিন্তু একই। প্রতিটা দাঙ্গা, প্রতিটা সাম্প্রদায়িক অশান্তি শেষে তাই এমন ধর্ষিত, ক্ষতবিক্ষত দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে রাস্তাঘাটময়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নির্বিচারে খুন-ধর্ষণ, বন্ধ‍্যা করে দেওয়া! চিনে কতটা অত‍্যাচারের মুখে উইঘুর মুসলিমরা

দেখা যাক, উইঘুর মুসলিমদের সামগ্রিক অবস্থা। তাদের বন্দিদশা, তাদের ইতিহাস, বর্তমান পরিস্থিতি!

ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন, প্রতিটি বড় যুদ্ধ, লড়াই সংগ্রামের অতীতের সঙ্গে মিশে রয়েছে নারীদের অত্যাচারের গল্প। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে খান-সেনাদের ব্যাপক অত্যাচার হোক বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় মহিলাদের উপর চূড়ান্ত নিপীড়ন, দেশ-কাল-ধর্ম ভেদে নারীদের উপর অত্যাচার আসলে ক্ষমতার আস্ফালন দেখানোর এক অস্ত্র। সীতাকে তুলে নিয়ে যাওয়া বা ভরাসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ দিয়ে যে নারীনির্যাতনের ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, সেই পরম্পরা সমান তালে বজায় রয়েছে আজও। তবে সেই সব কিছুর নেপথ্যে যত না কাম বা লালসা ছিল, তার চেয়েও ছিল প্রতিহিংসা। আজও ভারতের অলিগলি শহরতলি থেকে নারী নির্যাতনের খবর কানে আসে মুহুর্মুহু। কখনও সম্মান রক্ষার নামে পরিবারের হাতে খুন তো কখনও শরীরটাকে কেটে কুচি কুচি করে ফেলেছে দীর্ঘসময়ের প্রেমিক। কখনও বা বছর দশেকের শিশুকন্যার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে একদল রাক্ষস, এ সব কোনও নতুন ঘটনা নয়। কখনও সম্মান, কখনও লালসা তো কখনও প্রতিহিংসা। তবে এবার মণিপুর দেখল এক নয়া সমরকৌশল।

আজ থেকে নয়। বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই অশান্তিতে জেরবার মণিপুর। জাতি হিংসায় কার্যত জ্বলছে উত্তরপূর্বের এই ছোট্ট রাজ্যটি। গত দু-মাসে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৪২ জনের। হাজার খানেক এফআইআর, আরও কয়েক হাজার পুলিশি আটক, তার পরেও শান্তি ফেরেনি। বরং প্রতিদিন উত্তরোত্তর বাড়ছে অশান্তি। আর সেই হিংসাকে আরও কয়েক গুণ বাড়াতে এবার দেখা গেল এক অভিনব অস্ত্রের ব্যবহার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাথরাস থেকে লখিমপুর- আইনের জটে কেন আজও আটকে দলিত ধর্ষণের মামলা?

Uttar Pradesh Rape: ভারতে ২০২০ সালে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন দলিত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে সরকারি তথ্যেই দেখা গেছে।

কিছুদিন আগেই ভাইরাল হয়ে যায় প্লাস্টিক পেঁচানো একটি মৃতদেহের ছবি। রটে যায়, মেইতেই সম্প্রদায়ের ওই মেয়েটিকে নৃশংস অত্যাচার করে খুন করা হয়েছে। অভিযোগের তির ওঠে কুকি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। খুব শিগগিরই মণিপুরের চুড়াচাঁদপুরে ভাইরাল হয়ে যায় ছবিটি। হিংসায় ঘি ঢালে ওই ঘটনা। ফের নতুন করে বেঁধে যায় অশান্তি। মে মাসের তিন তারিখ নাগাদ ফের উত্তাল হয়ে ওঠে মণিপুর।

সম্প্রতি জানা গিয়েছে, ওই ছবিটি আসলে ভুয়ো। না, মৃতদেহে মিথ্যা নেই। মিথ্যা রয়েছে পরিচয়ে। প্লাস্টিকবন্দি ওই দেহটি আদতে আয়ুশী চৌধুরী নামে এক দিল্লির মেয়ের। অত্যাচার তাঁর উপরেও হয়েছে। সম্মান রক্ষার নামে তাঁকে খুনের অভিযোগ স্বয়ং তাঁর বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে। সেটা ২০২২ সালের নভেম্বরের ঘটনা। সেই দেহের ছবিটিই চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল মণিপুরের এক নার্সিং পড়ুয়ার বলে। পরে সামনে আসে আসল ঘটনা। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। ছড়িয়ে গিয়েছে প্রতিহিংসার আগুন। মেইতেই সম্প্রাদায়ের লোকেরা চড়াও হয় কুকি-মেয়েদের উপরে। কারণ 'খুনের বদলা যে খুন, লাশের বদলা লাশ' এ কথা তো ততদিনে জানাই। তাই মেইতেই মেয়ের সম্মানহানির বদলা হিসেবে টান মারো অন্য মেয়ের শাড়ির আঁচল ধরে। জনসমক্ষে বিবস্ত্র করো, লুটে নাও ইজ্জত, নৃশংস ভাবে ধর্ষণের পর ধানক্ষেতে ফেলে রাখো ক্ষতবিক্ষত শরীর। কারণ ভিতরে জ্বলছে প্রতিহিংসার আগুন, শরীরে খেলছে জাতি হিংসার বীজ। তাই মানুষে মানুষে হানাহানি লাগিয়ে দাও। পরখ করে নাও, কে বেশি শক্তিবান। কারণ ডারউইন বলে গিয়েছেন, যোগ্যতমরাই বেঁচে যান, বেঁচে থাকেন, শাসন করেন। এ দুনিয়া আসলে ক্ষমতাবানের। ইতিহাস থেকে রাজনীতি, বারবার তা প্রমাণ করেছে।

সেদিন কুকি-ঘরে ঢুকে এসেছিল একদল মেইতেই, কেউ পনেরো তো কেউ পঞ্চাশ। নেশার ঘোরে টলতে টলতে টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে গিয়েছিল বাড়ির মেয়েদের। চল্লিশ বছর থেকে তেরো, বাদ যাননি কেউই। টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বিষ্ণুপুর জেলার তৌবুল গ্রামের একটি ধানক্ষেতে। খেলা চলেছিল বদলার। চিৎকার করে আস্ফালন করেছিল তাঁরা, "আমরাও তোমাদের সঙ্গে তাই করব, যা তোমাদের লোকেরা আমাদের মেয়ের সঙ্গে করেছে।"

অর্থাৎ ধর্ষণ তত বড় অন্যায় নয়, যতটা 'ওরা-আমরা'-র এই লড়াই। তাই একটি অন্যায়ের সুবিচার খুঁজতে সেরে ফেলা যায় একই রকম আরও একাধিক অন্যায়। আইন, আদালত প্রহসন হয়ে লুটিয়ে থাকে রাস্তায়। সেদিন যে চৃড়ান্ত প্রতিহিংসার বর্বর ছবি মণিপুর দেখল, তা বোধহয় ভাবনার বাইরে। তবে সত্যিই কি এই ছবি নতুন? কাশ্মীরের সেই বাখরওয়াল সম্প্রদায়ের বছর আটেকের ছোট্ট মেয়েটিকে মনে আছে? যাকে গ্রামের মন্দিরে গণধর্ষণ করে উপড়ে নেওয়া হয়েছিল চোখ। সেই ঘটনাতেও কিন্তু কাম নয়, কাজ করেছিল উচ্চবর্ণে প্রতিহিংসা, ক্ষমতার আস্ফালনই। নিম্নবর্গ, তথাকথিত 'ইতর' শ্রেণিকে নিজেদের জায়গাটা দেখিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। ভালো করে খেয়াল করলে দেখবেন, উন্নাও থেকে হাথরাস- প্রায় সমস্ত ধর্ষণের ঘটনাতেই কোনও না কোনও ভাবে দুর্বলকে 'সবক' শেখানোর এক অন্ধ ইচ্ছা লুকিয়ে থেকেছে আজীবন। যেমনটা হয়েছিল মহাভারতে। যেমন করে পঞ্চপাণ্ডবের সামনে দ্রৌপদীর বস্ত্র খুলে নিয়ে তাঁদের সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল কৌরব। যেমন করে সীতাকে অপহরণ করে রামকে তাঁর জায়গা বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল প্রবল পরাক্রমী রাবণ, সেই পরম্পরা থেকে টলেনি আজকের ভারতবর্ষও।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।