আত্মগোপন করেই ধরেছিলেন সংগঠনের হাল! বাংলার দলিত আন্দোলনের এই নেতা রয়ে গেলেন আড়ালেই

Dalit Movement of West Bengal: তিনি সর্বদাই বামপন্থী আন্দোলন এবং দলিত আন্দোলনের ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা করতেন। তাঁর নেতৃত্বে DSP-এর অনুদানে দুর্গাপুরে গড়ে ওঠে 'আম্বেদকর ভবন'।

চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের দলিত আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব শক্তিপদ বাদ্যকর। শেষজীবনে ক্যানসার আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি । গত ৯ ডিসেম্বর ২০২২, দুপুরবেলা মহানন্দ ক্যানসার হাসপাতালে জীবনাবসান হয় তাঁর। পর দিন বিরভানপুর শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। ৭ শ্রাবণ, শুক্রবার ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে (ইং-২৫ জুলাই,১৯৪৭) শক্তিপদ বাদ্যকরের জন্ম হয়েছিল বীরভূম জেলার খয়রাসোল থানার বাবুইজোড় সংলগ্ন শ্রীরামপুর নামে এক ছোট্ট গ্রামে। ঝাড়খণ্ড সীমান্তের দলিত অধ্যুষিত এই গ্রামেই বেড়ে ওঠা তাঁর। বাবা ত্রিভঙ্গ কোটাল ও মাতা আদরা কোটালের প্রথম সন্তান ছিলেন তিনি। তিন ভাই ও দুই বোন নিয়েই ছিল পরিবার। জাতিতে ডোম বলেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতামহদের কিছু জমি ছিল এবং তাঁরা হেতমপুর রাজার প্রতিনিধি হিসেবে নিজ সম্প্রদায়ের কর আদায় করতেন। পরে অবশ্য সেই জমি বেহাত হয়ে যায়। 

তাঁদের পরিবারের প্রধান জীবিকা ছিল অন্যের জমিতে কাজ করা এবং বাঁশ, তালপাতা ও  খেজুরপাতার সামগ্রী তৈরি করা। শ্রীরামপুরে ডোম সম্প্রদায়ের সকলেরই ছিল চরম দারিদ্রের জীবন। বছরে একবারই হতো চাষের কাজ। সেই চাল ফুরোলে অভাব অনটন ছিল নিত্যকার ঘটনা। শক্তি বাদ্যকরের কথায়, "কোনওদিন খেতে পাইনি এমন হয়নি, মাড়-ভাত জুটে যেত। তবে কখনও সখনও ভাতের চাল যে জোতদারদের বাড়ি থেকে চেয়ে আনতে হয়নি এমন নয়। জমিতে কাজ করে এই ঋণ শোধ করতে হতো বাবা-মাকে।"   

৬ বছর বয়সে শক্তিপদর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাবুইজোড় গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুল  থেকেই তিনি 'বাদ্যকর' পদবিতে পরিচিত হন। প্রথমদিকে খুব একটা পড়াশোনায় মন ছিল না। হিংলা নদীর পাড়ে খেলে বেড়াতে, পাখি ও মাছ ধরতেই বেশি ভালো লাগতো তাঁর। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণিতে বঢ়ড়া বিদ্যালয়ে ভর্তি হলে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করেন এবং শিক্ষকদের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন। এরপর আত্মীয় স্বজনদের কাছে সাড়ে ১২ টাকা চেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন ধরণীধর জুনিয়র উচ্চবিদ্যালয়ে। এইসময় তাঁর মা এক সহৃদয় শিক্ষককে অনুরোধ করে বাঁশের সামগ্রী দেওয়ার বিনিময়ে প্রাইভেট টিউশনে পড়তে পাঠান। স্কুলে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করতেন, স্বাভাবিকভাবেই এলাকায় মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত হন। সেখান থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশের পর হেতমপুর কৃষ্ণচন্দ্র কলেজে যান উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য। সেখান থেকে সাফল্যের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।  

আরও পড়ুন- ভরসার নাম জিগনেশ! বিজেপির দূর্গে যেভাবে একা জিতে দেখিয়ে দিলেন দলিত-কংগ্রেস নেতা

তখন সত্তরের দশক, মেহনতি মানুষের রাজনৈতিক আন্দোলনে উত্তাল সারা বাংলা। কলেজ জীবনেই তিনি জড়িয়ে পড়লেন কমিউনিস্ট (নকশাল) রাজনীতির সঙ্গে। 'কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার' এবং 'রেডবুক' পড়ে ভীষণভাবে প্রভাবিত হন তিনি। সালটা ১৯৭০-৭১, বীরভূমের দুবরাজপুর-খয়রাশোল অঞ্চলে তখন 'জোতদার খতম'-এর বিপ্লবী কৃষক আন্দোলন ব্যাপক  আকার ধারণ করেছে। কৃষকের হাতে জমির দাবিতে ভূমিহীন কৃষকরা জমিদার, জোতদারদের শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শামিল হয়েছেন। সেই বিপ্লবী আন্দোলনের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন শক্তিপদ বাদ্যকর। হেতমপুর ছাড়াও বীরভূমের সিউড়ি কলেজেও ছাত্রদের মাঝে বিপ্লবী রাজনীতি নিয়ে যাওয়ার কাজে অগ্রণী দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দলের 'সর্বক্ষণের কর্মী' নির্বাচিত হন। স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নজর পড়ল নিপীড়িত সমাজ থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতা শক্তিপদর উপর। ইতিমধ্যে সরকার সিপিআই (এমএল)-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সাহসী নেতা শক্তিপদ আত্মগোপন করে চালিয়ে যেতে লাগলেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। পুলিশ তাঁকে খুঁজে বেড়াতে লাগল বীরভূমের বিভিন্ন অঞ্চলে। কোথাও এক রাত্রি কোথাও দু' রাত্রি থেকে পালিয়ে পালিয়ে বাঁচতে লাগলেন তিনি। ১৯৭২-এ ধাক্কা খেল নকশালবাড়ি আন্দোলন। 

এভাবে অনিশ্চয়তাময় যাপনের মাঝেই ১৯৭১ সালে স্নাতক-ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয় তাঁর। কিন্তু নিজের গ্রামে থাকা অসাধ্য হয়ে ওঠে। পুলিশি ধরপাকড় চলতে থাকায় সপরিবারে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন তাঁর বাবা। আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে তাঁরা চলে আসেন বর্ধমানের শিল্পনগরী দুর্গাপুরে। কিন্তু দুর্গাপুরে এসেও রেহাই মিলল না নকশাল নেতৃত্ব শক্তিপদর। পুলিশ তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতে লাগল। তিনি থাকতেন DSP সংলগ্ন বনগ্রাম অঞ্চলে এক দিদিমার কাছে। সেখানেও বারবার হানা দেয় পুলিশ। তাঁর পিতা ত্রিভঙ্গবাবু কোনওরকমে একটি কাজ জোগাড় করে সংসার সামলান। এমতাবস্থায় ১৯৭৩-এর জানুয়ারিতে  দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানায় (DSP) চাকরি পান শক্তিপদ বাদ্যকর। প্রথমে ছিলেন সিনিয়র অপারেটিভ ট্রেনি। তারপর IIM-দুর্গাপুর থেকে ম্যানেজমেন্ট ডিপ্লোমা করে ভারপ্রাপ্ত-সহম্যানেজার পদে উন্নীত হন। এরপরই মেদিনীপুরের কণিকা মণ্ডলের সঙ্গে অসবর্ণ-বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। পরবর্তীকালে সহকারী সাধারণ ম্যানেজার(AGM) হিসেবে দায়িত্বভার সামলানোর পর অবশেষে ২০০৮ সালে চাকরি জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। 

আরও পড়ুন- উগ্র হিন্দুত্বর বিরুদ্ধে জেহাদ! দলিত জাগরণের নেপথ্যের নায়ক পেরিয়ার

১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় মণ্ডল কমিশনেরর রিপোর্ট। এইসময়েই শক্তিপদ বাদ্যকর আকৃষ্ট হন  দলিত রাজনীতির প্রতি। ড. আম্বেদকরের রচনাসমগ্র দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। চিন্তিত হয়ে ওঠেন হিন্দু সমাজের অস্পৃশ্য, শূদ্রাতিশূদ্র বলে চিহ্নিত মানুষদের উপর হাজার হাজার বছর ধরে হয়ে আসা অন্যায় অবিচার নিয়ে। এই সময়ই উত্তরপ্রদেশে কাঁশিরামের (১৯৩৪-২০০৬) নেতৃত্বে গড়ে ওঠা  'দলিত শোষিত সমাজ সংঘর্ষ সমিতির (DS-4) সদস্য হন তিনি। দলিত-বহুজন নেতৃত্ব কাশীরামের সঙ্গে শক্তিপদর ছিল প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। বেশ কয়েকবার কাশীরাম তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন। ১৯৮৪ সালে 'বহুজন  সমাজ পার্টি' গড়ে উঠলে শক্তিবাবু সক্রিয়ভাবে তাতে অংশগ্রহণ করেন। আশির দশকে 'মণ্ডল কমিশন অ্যাকশন কমিটি' গড়ে উঠলে তিনি ছিলেন বর্ধমান জেলার আহ্বায়ক। অধিকারিক পদে থাকায় প্রকাশ্যে শ্রমিক আন্দোলন করতে না পারলেও শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি সর্বদাই সমর্থন ছিল তাঁর। দুর্গাপুর স্টিল-প্ল্যান্টে তফশিলি জাতি, উপজাতি ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণিদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। এই সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তিনি সর্বদাই বামপন্থী আন্দোলন এবং দলিত আন্দোলনের ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা করতেন। তাঁর নেতৃত্বে DSP-এর অনুদানে দুর্গাপুরে গড়ে ওঠে 'আম্বেদকর ভবন'।

আজীবন ছিলেন মার্কসবাদী-আম্বেদকরবাদী। শেষজীবনে 'সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইন্ডিয়া'য় (SDPI) অংশগ্রহণ করেন। যদিও শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়ে তাঁর। গুরুতর অসুস্থ অবস্থাতেও গত ৩০ জুন ২০২২, 'সাঁওতাল-হুল' (১৮৫৫) সম্পর্কে আলোচনা সভা আয়োজন ছিল তাঁর শেষ রাজনৈতিক কর্মসূচি। পরিবারে রয়েছেন তাঁর পত্নী, এক পুত্র ও কন্যা। ধীর স্বভাবের শক্তিপদ বাদ্যকরের কথাবার্তায় ছিল আসাধারণ যুক্তিময়তা। যেকোনও জটিল বিষয়কে খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিতে পারতেন তিনি । তাঁর বক্তব্য ছিল, "দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু শূদ্রাতিশূদ্র-দলিত-সর্বহারা মানুষ এখনও মুক্ত হয়নি।" আজীবন সমাজ-রাজনীতিই ছিল চিন্তাভাবনার কেন্দ্রীয় বিষয়। ভারতবর্ষে বর্ণবৈষম্যমুক্ত শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের সংগ্রামী আদর্শে আজীবন তিনি ছিলেন অবিচল।         

 

More Articles