জ্বলেই রইল 'অমল আলো', যা আসলে নেভার নয়...

Cartoonist Amal Chakraborty: প্রায় সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষকে নির্মল আনন্দ জুগিয়ে এসেছে যে তুলির আঁচর, শরতের এক অমল আলোকিত দিনে থামল তা চিরকালে।

Sohini Das
৩ মিনিট
জ্বলেই রইল 'অমল আলো', যা আসলে নেভার নয়...

সূক্ষ্ম কৌতূক, রসিকতার মেজাজ যেন ক্রমেই কমে আসছে পৃথিবী থেকে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতিকে কৌতূকের মলাটে মুড়ে প্লেটে পরিবেশিত করতে ভুলে যাচ্ছে কি আজকের দুনিয়া? হয় সেই কৌতূক বা হাস্যরসের মধ্যিখানে এসে দাঁড়াচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখরাঙানি, নয়তো সূক্ষ্ম রসিকতা বোঝার মন হারাচ্ছে মানুষ। তাই কি হারাল অমল আলোও? প্রায় সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষকে নির্মল আনন্দ জুগিয়ে এসেছে যে তুলির আঁচর, শরতের এক অমল আলোকিত দিনে থামল তা চিরকালে। ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন অমল আলোর সৃষ্টিকর্তা অমল চক্রবর্তী।

বুধবার সকাল দশটা নাগাদ কলকাতার আর জি কর হাসপাতালে প্রয়াত হন শিল্পী। কাগজের পাতায় তাঁর সৃষ্টি 'অমল আলোয়' বছরের পর বছর ধরে মানুষকে মুগ্ধ করেছে। ভাবতে শিখিয়েছে অন্য় রকম ভাবে। এই যে কার্টুন বা ব্যাঙ্গচিত্রের রমরমা, সেই কার্টুনের এ দেশে হাতেখড়ি ব্রিটিশ আমল থেকে। আর বাংলা খবরের কাগজের পাকায় যে কার্টুন আঁকার যে রেওয়াজ, তা কিন্তু শুরু হয়েছিল এই মানুষটির হাত ধরেই । ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে 'বসন্তক'-এর মতো পত্রিকা দিয়ে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, সেই তুলি হেঁটেছে বহু পথ। দেখেছে নানা ঘটনা, ঘুরেছে সময়ের অলিগলি।

গত কয়েকদিন ধরেই শরীর ভালো ছিল না বর্ষীয়ান এই শিল্পীর। বয়সজনীত নানা অসুস্থতা নিয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয় আরজিকর হাসপাতালে। অনেক দিন আগে থেকেই শরীর জবাব দিতে শুরু করেছে, চোখের দৃষ্টি হয়েছে ক্ষীণ। একটি চোখে তো প্রায় দেখতেই পারতেন না শেষের দিকে। তবু কার্টুন তাঁকে কখনও ছেড়ে যায়নি। চোখে চশমা এঁটেই চালিয়ে গিয়েছেন কাজ। 'সংবাদ প্রতিদিন'-এর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। কার্যত প্রতিদিনের পাতার মাধ্যমেই হাজার হাজার পাঠকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল অমল চক্রবর্তীর 'অমল আলোয়'। তবে কর্মজীবনের শুরুতে তাঁর সঙ্গে জড়িয়েছে আরও বিখ্যাত সব সংবাদপত্র ও পত্রপত্রিকার নাম।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আমুলগার্লের হাত ধরেই অমরত্বের নৌকায় পা রাখলেন সিলভেস্টর ডাকুনহা

Amul Girl: আমুল গার্লের সঙ্গে সঙ্গেই অমরত্বের নৌকায় উঠে পড়লেন ডাকুনহাও। ভারতীয় বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় আমুল গার্লের মতোই তিনিও থেকে যাবেন আজীবন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যুগের সমাপ্তি: প্রয়াত তরুণ মজুমদার, প্রচারবিমুখ পরিচালক ছিলেন বাংলা সিনেমার অভিভাবক

অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে এমন সম্পর্কই প্রমাণ করে বাংলা সিনেমার অন্যতম অভিভাবক ছিলেন তরুণ মজুমদার। একের পর এক সাহিত্যের পাতা থেকে চরিত্রদের নিয়েছেন সিনেমার পর্দায়।

অমল চক্রবর্তীর কার্টুন, সন্দেশে প্রকাশিত।

কার্টুন কী? শুধুমাত্র মজা, নাকি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে মজার মোড়কে ফুটিয়ে তোলাটাই কাজ ব্যাঙ্গচিত্রের। আসলে মানুষকে ভাবানোর কাজটাই তো করে এই ব্যাঙ্গচিত্র। ফলে ওই একটা তুলির আঁচড়ের মধ্যে যতটা শিল্পবোধ জড়িয়ে থাকে, ঠিক ততটাই জড়িয়ে থাকে তীব্র এক সমাজসচেতন মন। সেই কাজটাই প্রায় এক শতাব্দীর কাছাকাছি সময় ধরে যত্ন সহকারে করে গিয়েছেন এই মানুষটি। অমল চক্রবর্তী নামে দুনিয়া তাঁকে চিনলেও খাতায়-কলমে কিন্তু তিনি পরিতিত ছিলেন অমলেন্দু চক্রবর্তী নামে। একটা সময় আনন্দবাজার, যুগান্তর-সহ অসংখ্য পত্রপত্রিকা খুললেই দেখা মিলত তাঁর অসংখ্য ব্যাঙ্গচিত্রের। ১৯৯২ সালে যোগ দেন 'সংবাদ প্রতিদিনে'। সেখানেই নিয়মিত ভাবে প্রকাশ পেত তাঁর আঁকা কার্টুন 'অমল আলোয়'। যা দুর্দান্ত ভাবে জনপ্রিয় হয়।

দেশের বিখ্যাত কার্টুনিস্ট শঙ্কর পিল্লাইয়ের ছাত্র ছিলেন অমল চক্রবর্তী। তাঁর কাছেই ব্যাঙ্গচিত্রের শিক্ষা তাঁর। সেই গুরুর অনুপ্রেরণাতেই এই পকেট কার্টুনের শুরুয়াত হয় অমলবাবুর হাত ধরে। বিশেষত রাজনৈতিক ভাবনা, প্রতিদিন চোখের সামনে যা চলছে, তাকেই একটু অন্য ভাবে তুলে ধরেছেন। পকেট কার্টুনকে গ্রাম বাংলার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন এই মানুষটিই। প্রায়শই বলতে শোনা যেত তাঁকে, "এসেছি পৃথিবীতে, যদি মরতেই হয় কার্টুনিস্ট হয়েই মরব।" আর সেই কার্টুনিস্ট পরিচয় নিয়েই পৃথিবী ছাড়লেন তিনি। আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য থেকে গেল তাঁর অজস্র কাজ, অজস্র ব্যাঙ্গচিত্র। নিজের সময় থেকেও এগিয়ে ভাবতে পেরেছে অমল চক্রবর্তীর যে সৃষ্টিরা, সেগুলোই থেকে গেল আগামীর জন্য তোলা। অমল আলো থেকে গেল এক অনির্বাপিত জ্যোতির মতো, যা আসলে কখনও নেভার নয়।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।