পেট ঢালাই হোক সিমেন্টবালিতে, ভাতের চিন্তা থাকে না! গ্রামবাংলার খিদের না-বলা গল্প

Rural Bengal: অল্পে খুশি হওয়া, আকাশের দিকে তাকিয়ে রেগে ওঠা, পরস্তাব বলা মানুষের দল কোথায় গেল?

Jagannathdeb Mondal
৩ মিনিট
পেট ঢালাই হোক সিমেন্টবালিতে, ভাতের চিন্তা থাকে না! গ্রামবাংলার খিদের না-বলা গল্প

বাজারের তরিতরকারি, মাছ, ফল ও নিত্যদিনের জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। একজোড়া লেবু- ১৬। সরষের তেল- ২০ টাকা কেজি। চালানি রুই- ২৫ টাকা কেজি। পাটশাক আঁটি- ১৫ টাকা।

বেলা করে মাছবাজারে গেলে অথবা কুপি-জ্বলা সন্ধের বাজার, পাটশাকের বদলে জলায় নেমে হিংচে, অনেক দরদামে না হলে সত্যি-ইলিশের বদলে খোকা ইলিশ/ ভোলা/ কোকিলা। বরফচাপা মাছ পছন্দ না হলে সস্তা তেলাপিয়া বা সিলভার কাপ। বাড়ির গাছে ফাল্গুনের কচি নিমপাতা- এইসব কম পয়সায় খেয়ে বেঁচে থাকার মন্ত্র। ইটভাটার শ্রমিক ও রোদজলের মানুষরা এইসব আবিষ্কার করেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। কিন্তু, এই সমস্ত তুক বিফল হয়ে যাচ্ছে।

এইসব দেখে আমার চোখের সামনে শীতলা মন্দিরের কাছে দু'জন ভ্যানে বসে থাকা মানুষ আকাশের দিকে মুখ না তুলে বলল, এই খানকির ছেলে পেটের গর্তটারে ইচ্ছা করে সিমেন্টবালিতে ভরতি করে ঢালাই করে দি। না করতে হবে বাজার, না হবে তিনবেলা ভাতের চিন্তা...

অভাবের বেড়া দিয়ে ঘেরা বাসা, তাতে সাদা অনটনফুল এদের। পেটে ভাত নেই, পরনের কাপড়ের অভাব, ভেজা জামা গায়ে শুকনো করতে হয়, খিস্তি করে, তবু সাক্ষাৎ আনন্দের বসবাস এদের বাড়ির লেপাউঠোনে।

কাজের জন্য একজনের বাসা নবদ্বীপ, গোরার লীলাভূমিতে, ইনি কাঠ কুঁদে নকশা বানান। এর বোনেরা একে আপনি সম্বোধন করে, ধুতি পরেন, ছোটখাটো আনন্দময় মানুষ, স্ত্রী মারা গেছেন, কুকুর-বেড়াল-পাখি নিয়ে থাকেন। আর কবিতা লিখে চলেন। ছোট ছোট স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ভগবানের প্রতি নিবেদনপদ। এই কবিতা লেখা তাকে নাকি জাগতিক দুঃখ থেকে মুক্তির দিকে টেনে নিয়ে যায়।

অন্যজন থাকেন অগ্রদ্বীপের কাছে, গোপীনাথ যেখানে ভক্তের শ্রাদ্ধকাজ সমাপন করেন। গোপীনাথ মন্দির থেকে খানিক পশ্চিমে বেত, বাঁশ আর তমালছায়ায় ছোট্ট কুটির। তাঁত বোনেন, আর গান রচনা করেন।বাঁশের ময়ূর, কাঠের ধনুক, লাউখোলের একতারা, দোতারা গড়তে পারেন। বেতের কচিডগা নুনলঙ্কায় জারিয়ে ভাতের পাশে মেখে খান। ভবানন্দ নামে গান লেখেন। প্রিয় গান টুকে রাখেন। খাতায় লিখে রাখা-

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'ইন্ডিয়ায় সহজে মাছ মেলে না', তাই ওপার থেকে এল হাঁড়িভর্তি সরষে-ইলিশ

Partition Stories: দুঃখমুহ্যমান এরা সবাই শুধু মাছের ঝুল খাচ্ছে না ভাত দিয়ে মেখে, একটু একটু করে মাছের সঙ্গে খাচ্ছে তীব্র শোক আর তীব্রতর ব্যথা, স্মৃতি।

সাধনভজন জানি না মুই, ওরে আমার মন।

একটা হাতির কয়টা হাত আর কয়টা আছে পা।

বড়ো বড়ো কান দুটি তার,ছোট এক মাথা -

একবার যদি কাদায় পড়ে তখন তাহার উপায় হবে কী?

ব্রহ্মা বিষ্ণুর বাড়ি কোথায় না আছে জানা,

ওরে আমার মন...

কোথাও খেদ জমলে দু'জনে মিলে তেড়ে খিস্তি করে গলা ধরে ফিরতেন। মৃতদেহ সৎকারের কাজ বা কোনও বিপদ-আপদ, এরা দু'জন আছেই।

এঁদের মা গোবর কুড়োতেন, ত্যাওরা শাক তুলতেন ভুঁইয়ে, রাত্রিবেলা পান খেতেন ছেঁচে ঠুকঠুক করে মোতিহারি তামুকপাতা দিয়ে। পাথরের গেলাসে দুধ-নারকেল, আতপচালে শ্যামের জন্য পিঠে গড়তেন। নামসংকীর্তন শুনলে চোখ দিয়ে অবিরল জল গড়াত, মাথার ওপরে দু'হাত তুলে নাচতেন। সাদা থানে জড়ানো, গলায় তুলসীমালা, রোগা রুদ্রাক্ষ ফলের মতো তোবড়ানো গালের বুড়িপুতুলের নাচ দেখলে দেহ শিহরিত হতো। দিনেরবেলা কখনও তিনি পরস্তাব বলবেন না, তাতে নাকি মামাবাড়ির ভাতের হাঁড়ি ফেটে যায়। সন্ধ্যার নবজলধরে তিনি নাকি যুগলমিলন দেখতেন।

মন আনমনা সেই এদের বাড়িতে কাচের বদনার মতো পাত্রে অনন্ত এসে যেন তামাকগুড় নিয়ে গুড়ুক গুড়ুক খেতেন। ভক্তির ধূম উঠত। অই বৃদ্ধা আমার দেখা প্রথম নৃত্য-জানা ভক্তিমতি নারী, ওঁর স্বামী মরণের আগে গায়ে-মাথায় উঠোনের মাটি লেপে দিয়েছিলেন, তখন আমি বসতে শিখেছি সবে।

ওঁর স্বামীর নাম ধুলো রায় ,আষাঢ়ের বিকেলে দেহে মাটি ছুঁইয়ে কোন বিজনগহনের ইশারা দিয়েছিলেন?

এইসব অল্পে খুশি হওয়া, আকাশের দিকে তাকিয়ে রেগে ওঠা, পরস্তাব বলা মানুষের দল কোথায় গেল?

২

আমি আর সন্তোষদা বাংলার পুরাতন গ্রামঘাট, জল-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম। অল্প টাকায় দু'-এক সন্ধের বেড়ানো। খাঁ খাঁ জ্যোৎস্নার ভেতর গঙ্গাটিকুড়ি গ্রামের আমবন দেখি, ভোরবেলা আবার বাস থেকে নেমে উদ্ধারণপুরের চা-দোকানে বাঁশের বেঞ্চিতে বসে চা খাই বিস্কুট চুবিয়ে। মনে ভাবি, এখানেই, এই মহাশ্মশানেই অবধূত থাকতেন।

গত বিকেলে শাঁখাইঘাট পার হয়েছি খেয়ায়। গোধূলির ছোপ লেগেছে আকাশে। পুরনো জায়গা। হাঁটছি আমরা দু'জন।

হাঁটতে হাঁটতে গাছপালা পেরিয়ে এমন এক কাশবনে ছাওয়া জায়গায় এলাম, এখানে মানুষজন নেই।অনেকদিনের একটি ঘাট। কিছু প্রাচীন নৌকো মাটিতে পোঁতা। তাতে লতিয়েছে উচ্ছেলতা। একজন মানুষ স্নান করছে। সূর্য ডুবছে।

হঠাৎ দেখি, কিছু দূরে বনবেলি গাছের ছোট ছোট ডাল পুঁতছে। কথা বলে জানা গেল, একা থাকেন। সবাই বলে মাথায় ছিট। রাতের বেলা নিয়ম করে কুকুরদের বিস্কুট খাওয়ান। গাছের কলম তৈরি করে বেড়ান।

এত কিছু হারানোর ভেতরে এইসব প্রাপ্তি মিলে গেলে বেঁচে থাকার সাহস বাড়ে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল ঢাকা কালীবাড়ি, দক্ষিণ কলকাতার মন্দিরের ইতিহাস

Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।