কতটা বিপজ্জনক 'অশনির চোখ'? ইয়াস-আমফানের মতোই ধ্বংসাত্মক হবে এই ঘূর্ণিঝড়?

দিনকয়েক আগেই ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’ নিয়ে সতর্কতা জারি করেছিল আবহাওয়া দপ্তর, এবার তার মোকাবিলার জন্য জরুরি সমস্তরকম ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগী হল প্রশাসন। সূত্র মারফৎ জানা যাচ্ছে, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে ‘অশনি’ বর্তমানে পুরী থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরে এবং বিশাখাপত্তনম থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে, আপাতত ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার বেগে উপকূলের দিকে এগোচ্ছে ‘অশনি’। তবে স্থলভাগে প্রবেশ করলে ‘অশনি’ কতটা ক্ষয়-ক্ষতি করতে সক্ষম হবে, তা নির্ভর করবে তার চোখের অবস্থানের ওপর, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কাকে বলে ঘূর্ণিঝড়ের 'চোখ'? তা এতটা ক্ষতিকারকই বা কেন? দেখে নেওয়া যাক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যে কোনও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে অবস্থা করে এক গতিহীন অংশ। একেই বলা হয় ঘূর্ণিঝড়ের চোখ। এই চোখকে ঘিরে থাকে চক্ষুপ্রাচীর বা ‘আই ওয়াল’। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যে কোনও ঘূর্ণিঝড়ের চোখ আয়তনে প্রায় ৩০ থেকে ৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বড় হতে পারে। তার চক্ষুপ্রাচীরের প্রধান উপাদান নিথোস্ত্র্যাটাস মেঘ। সাধারণত এই চোখের পার্শ্ববর্তী অংশেই ঝড়ের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি হয়।

যে কোনও সমুদ্রের তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রির বেশি হলে তৈরি হয় নিম্নচাপ। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সমুদ্রের জল বাষ্পীভূত হয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এর ফলে সমুদ্রের ওপর সৃষ্টি হয় এক বায়ুশূন্য স্থানের। তারপর এই বায়ুশূন্য স্থানকে পূরণ করার চেষ্টা করে আশপাশের শীতল বাতাস। এই শীতল বাতাসের গতি বৃদ্ধির ফলেই তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড়। ঝড়ের ঘূর্ণনগতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে কেন্দ্র করে একটা চোখ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আপাতভাবে শান্ত হলেও ঘূর্ণিঝড়ের চোখই তার সবচেয়ে ক্ষতিকারক অংশ। আশপাশের অংশে ঝড়ের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি হওয়ার দরুন স্থলভাগে প্রবেশ করার পর ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে এই চোখ। এই জন্যই তাকে ক্ষতিকারক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

 

আরও পড়ুন: ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের নাম কেন ‘অশনি’? নামের মধ্যেই কি লুকিয়ে বিপদের পূর্বাভাস?


২০২০ সালে দীঘা এবং সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’। সেবার ঘূর্ণিঝড়ের চোখ ছিল বঙ্গোপসাগরের খুব কাছাকাছি। সেই কারণেই বিস্তর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। সূত্র মারফৎ জানা যায়, কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী অঞ্চলেই ‘আমফান’ থেমে থাকেনি। উড়িষ্যার বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার বেগে তা আছড়ে পড়েছিল। ইন্ডিয়া মেটিরিওলজিকাল ডিপার্টমেন্টে’র (আইএমডি) তথ্য অনুসারে, উড়িষ্যার জগতসিংপুর বা ভদ্রক অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় ঝড়ের গতিবেগ ছিল ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা।

ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’-র চোখ ছিল উড়িষ্যার পুরী এবং ভুবনেশ্বরের কাছাকাছি। ২০১৯ সালে ১৭৫ থেকে ১৮৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগে পুরীতে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় হয়ে আছড়ে পড়েছিল ‘ফণী’। আইএমডি-র মতে, উড়িষ্যার ওপর অবস্থান করার সময় ফণীর চোখের আয়তন ছিল আনুমানিক ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার। আবহাওয়া দপ্তরের আধিকারিকরা জানিয়েছিলেন, ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী'-র তীব্রতার ফলে উড়িষ্যার ঢেঙ্কানল জেলায় আনুমানিক ১৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ‘নিসর্গ’-র ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অবশ্য আমফান বা ফণীর তুলনায় কম ছিল। ২০২০ মহারাষ্ট্রের উপকূলবর্তী অঞ্চলে আছড়ে পড়া এই ঘূর্ণিঝড়ের চোখের অবস্থান ছিল আলিবাগের কাছাকাছি। মহারাষ্ট্রের পর গুজরাত হয়ে দমন ও দিউ দ্বীপের দিকে এগিয়েছিল নিসর্গ।

আবহাওয়াবিদরা জানাচ্ছেন, বর্তমানে গতি বাড়িয়ে বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে দ্রুত ধেয়ে আসছে অশনি। তবে তাঁদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে ‘অশনি’-র সরাসরি কোনও প্রভাব পড়বে না। ঝড়ের ফলে উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা করছেন তাঁরা। পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে ইতিমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। ‘অশনি’ আদৌ কোনও অশনি সংকেত বয়ে নিয়ে আসছে কি না, তা সময় বলে দেবে।

More Articles

;