প্রশ্ন করার সংস্কৃতি সাংবাদিকতা থেকে যে ভাবে হারাল...

Journalism in India: 'বাংলা যা ভাবছে' অনুষ্ঠানে 'গোদি মিডিয়ার কীর্তিফাঁস' সূচক আলোচনায় বক্তব্য রেখেছিলেন সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, সাংবাদিক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য, বাংলা পক্ষের প্রধান গর্গ চট্টোপাধ্যায় এবং সাংবাদিক প...

সাংবাদিকতা কি শুধুই একটা পেশা! চারদিকের পরিস্থিতি দেখে অবশ্য তেমনটাই মালুম হয়। শাসক বা সরকার চোখ বুজে একের পর এক সরকারি সংস্থাকে তুলে দিচ্ছে বেসরকারি হাতে। আর সংবাদমাধ্যম কী করছে? চোখ-নাক-মুখ বন্ধ করে নিজেকেই তারা সঁপে দিচ্ছে ক্ষমতাবানের হাতে। আদর্শ, বিশ্বাসের উপরে গিয়ে কথা বলছে মুনাফার অঙ্ক। সম্প্রতি বিজেপি বিরোধী জোট 'ইন্ডিয়া'-র তরফে ঘোষণা করা হয়েছে, মোদি সরকারের ধামাধারী চোদ্দ জন সঞ্চালক-সংবাদকর্মীকে বয়কটে। কোনও ভাবেই তাঁদের অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করবে না ইন্ডিয়া জোটের প্রতিনিধিরা। কারা সেই ১৪ জন সাংবাদিক-সঞ্চালক? আপাতত তাঁদের একটিই পরিচয়- 'গোদি মিডিয়া'। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর বিজেপি এবং আরএসএস সংগঠনের কার্যত কোলের ছেলে তাঁরা। ফলে শাসকের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করা তো দূরের কথা, আপাতত ক্ষমতার পদলেহন করতেই বেশি ব্যস্ত তাঁরা। এমনকী বিজেপি বা আরএসএসের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার সরাসরি প্রচারেও একফোঁটাও পিছপা নন তাঁরা।

কিন্তু সংবাদমাধ্যমের কি আদৌ এমনটা হওয়া উচিত ছিল? আগেও কি পরিস্থিতি এমনটাই ছিল? না, পিছনে ফিরে তাকালে কিন্তু এই পটপরিবর্তনের ইতিহাস অনেকটাই স্পষ্ট হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপির চাণক্য অমিত শাহ কথায় কথায় বলেন, 'ক্রনোলজিকো সমঝো!' কিন্তু আদতে 'ক্রনোলজি'-টা কী? ইদানীং কংগ্রেসকে কোণঠাসা করতে বিজেপিকে নানা প্রসঙ্গে বারবার ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থার কথা তুলতে দেখা যায়। কার্যত ইতিহাসের এর ভয়ঙ্করতম সময় যে এই ইমারর্জেন্সি, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। ইমার্জেন্সির সময় ধরে ধরে সাংবাদিকদের জেলে পোরা হয়েছিল। সেই সময়কে সামনে তুলে এনে মোদি সরকার এটা প্রমাণ করতে ব্যস্ত, যে আগের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় রয়েছেন দেশবাসী। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন এই দেশে। কিন্তু সত্যি কি তাই! গোদি মিডিয়ার সাংবাদিক বা সঞ্চালক যাঁরা, যাঁরা দিনরাত মোদি-বন্দনায় ব্যস্ত, স্বাধীন সাংবাদিকতার উদাহরণ কি আজকের ভারতে তাঁরাই?

আরও পড়ুন: গোদি মিডিয়ার কীর্তিফাঁস আজ! 

উচ্চাকাঙ্ক্ষী, ক্ষমতার পদলেহনকারী সাংবাদিক আগেও ছিল এই পেশায়। সংবাদমাধ্য়মের মালিকেরাও যে খুব আদর্শবাদী ছিলেন, তা-ও নয়। এখন কথায় কথায় 'নিরপেক্ষ' শব্দটি ব্যবহার করা হয় সংবাদমাধ্য়মের সঙ্গে। কিন্তু সত্যিই কি নিরপেক্ষ বলে কিছু হয়। সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ হওয়া যে উচিত খুব, তেমনটাও মনে হয়না। কারণ সাংবাদিকেরা যদি সবসময়ে নিরপেক্ষ থাকতে চান, বহু ক্ষেত্রে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে তাঁদের জন্য। এমন উদাহরণ কম নেই এ দেশে। আগেও কোনও একটি মিডিয়ায় কিছু পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিক থাকতেন, যাঁরা ক্ষমতার পক্ষে কথা বলতেন। আবার এমন সাংবাদিকও ছিলেন, যাঁরা সেই ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে প্রশ্নটাও করতেও জানতেন। ফলে নিউজরুমে একটা বিপরীত স্বর বজায় থাকত সব সময়ে। যা কাগজ হোক বা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া, সেখানে ভারসাম্যটুকু বজায় রাখত। সাংবাদিকতার ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখলে দেখবেন, রাজনীতি বা পরিবর্তনের বহু সক্রিয় কর্মীই সরাসরি সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফলে তাঁদের নিজস্ব একটা পক্ষ নির্বাচনের জায়গা সর্বদাই ছিল। সেই তালিকায় রয়েছেন রামমোহন রায়, মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে ভগৎ সিং থেকে বি আর অম্বেদকরও। তাঁরা সকলেই কখনও না কখনও সাংবাদিকতা করেছেন। এমনকী দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়িও একসময় সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে সাংবাদিকতা মানেই যে 'অ্যাক্টিভিজম', সেটা এ দেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল বহু আগে থেকেই।

এই সংবাদ জগতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব যাঁরা, এখন তাঁদের অনেককেই প্রায়শই বলতে শোনা যায় যে সাংবাদিকতাও আর পাঁচটা পেশার মতো একটা পেশা মাত্র। কিন্তু তাই যদি হবে, ইমার্জেন্সির সময় বেছে বেছে সাংবাদিকদেরই গ্রেফতার করা হয়েছিল কেন? গৌরকিশোর ঘোষ থেকে শুরু করে কুলদীপ নায়ারের মতো কিংবদন্তি সাংবাদিককে কেন জেলে পোরা হয়েছিল সেসময়? কই কোনও স্কুলমাস্টার বা চিকিৎসককের ক্ষেত্রে তো এই পদক্ষেপ করা হয়নি। অর্থাৎ সরকার বা শাসক যাঁদের রাজনৈতিক ভাবে বিপজ্জনক মনে করেছিল, তাঁদেরই ঠাঁই হয়েছিল গারদের অন্ধকারে। অর্থাৎ তখন থেকেই শাসক বিশ্বাস করে, সাংবাদিকতা মানে এক ধরনের 'অ্যাক্টিভিজম'। জরুরি অবস্থার সময়ে সাংবাদিকতার জগতে যে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা থিতিয়ে গিয়েছিল তার পরবর্তী দশকগুলিতে। সত্যি কথা বলতে ইমার্জেন্সির পর থেকে মোদি জমানার আগে পর্যন্ত সময়টা ছিল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে 'নিরাপদ' সময় এবং খানিকটা নিস্তরঙ্গও বটে। এই সময়টাতেই সাংবাদিকতার উপর আক্রমণ নেমেছে সবচেয়ে কম।

আর সেই সুযোগটাই নিয়েছে সংবাদমাধ্যমের মালিকেরা। সেই সুযোগে তাঁরা সংবাদমাধ্য়মকে বানিয়ে ফেলেছে বিশুদ্ধ কর্পোরেট। ভারতে খোলা বাজার অর্থনীতি চালু হওয়ার পর আরও বাড়ল সেই প্রবণতা। মালিকপক্ষের কাছে পাখির চোখ হয়ে দাঁড়াল শুধুমাত্র মুনাফা। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে বহু সংবাদ মাধ্যমের ক্ষেত্রে মালিকই হয়ে দাঁড়ালেন সম্পাদক। আর যাঁরা তা হলেন না, তাঁদের ছড়িও ঘুরতে লাগল সম্পাদকদের মাথায় সরাসরি। ফলে 'সম্পাদকের স্বাধীনতা' বলে যে অর্থবহ শব্দটি প্রচলিত ছিল এতদিন ধরে, তা ক্রমশ মূল্যহীন হয়ে দাঁড়াল।

মোদি সরকার আসার পর থেকে পরিস্থিতি আরও বদলেছে। বিজেপি ক্ষমতায় এসে সরকারি বিজ্ঞাপনকে সক্রিয় ভাবে ব্যবহার করা শুরু করল। ২০১৭ সাল, অর্থাৎ তখনও অতিমারি বিপর্যয় হানা দেয়নি ভারতীয় অর্থনীতির উপরে। সে সময়ে তথ্যের অধিকার আইনে এক ব্যক্তি কেন্দ্রীয় তথ্য় ও সম্প্রচার মন্ত্রকের কাছে একটি প্রশ্ন করেন। জানতে চাওয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে থেকে বিজেপি সরকার সংবাদমাধ্যমে মোট কত টাকার বিজ্ঞাপন দিয়েছে? সেই প্রশ্নের উত্তরে, ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়কার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিল কেন্দ্রীয় তথ্য় ও সম্প্রচার মন্ত্রক। যেখানে দেখা গিয়েছে, এই সাড়ে তিন বছরে কেন্দ্রীয় সরকার ইলেকট্রনিক্স সংবাদমাধ্যমকে দিয়েছে ১,৬৫৬ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন। কাগজ বা পত্রিকাগুলিতে দেওয়া হয়েছে মোট ১,৬৯৮ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন। অর্থাৎ প্রায় ৩,৩৫৪ কোটি টাকা সরকার ব্যয় করেছে বিজ্ঞাপনে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, শুধুমাত্র সরকারি বিজ্ঞাপনের বহর যদি এই হয়, শাসকদলকে চটাতে চাইবেনই বা কোন মালিকপক্ষ! বিশেষত সেখানে, যেখানে সংবাদমাধ্যম-কর্পোরেটগুলির পাখির চোখই মুনাফা। ফলে গোদি মিডিয়া গড়ে ওঠার নেপথ্য-কারণটা বুঝতে বোধহয় অসুবিধা হয় না খুব একটা। সাংবাদিক রবীশ কুমার 'গোদি মিডিয়া' বলতে মূলত দিল্লির সংবাদমাধ্যমগুলিকেই বুঝিয়েছিলেন। তবে শুধু দিল্লিতে নয়, গোটা দেশ জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে এমন অজস্র 'গোদি মিডিয়া'।

এই যে শাসক তোষামোদের ভয়ানক ইতিহাস,তা কি শুধু গোদিমিডিয়াকে ঘিরেই? বিজেপি বিরোধী জোট ইন্ডিয়ায় মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরাও কি বিরোধী-সওয়াল সহ্য করার মানসিকতা রাখেন? প্রশ্ন জাগে বইকি। আসলে ভালো করে দেখতে গেলে, সামগ্রিক ভাবে সাংবাদিকতায় প্রশ্ন করার সংস্কৃতিটাই যেন নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আগে যে সাংবাদিক ক্ষমতাসীন বা সরকারের যে যত অপ্রিয়, সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সম্মান ছিল ততই উপরে। এখন সেই মান নির্ণয়ের মাপকাঠি একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে। আজকের দিনে তত বড় সাংবাদিক তিনিই, যে শাসক বা ক্ষমতাসীনের বেশি ঘনিষ্ঠ। ফলে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা নয়, ক্ষমতার সঙ্গে খাতিরটাই এখন বেশি বিচার্য। শুধু কি তাই, দেশ জুড়ে বেড়েছে সেলফি সাংবাদিকতা, সম্মতির সাংবাদিকতার চর্চা। তাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিরোধী-প্রশ্নের মুখোমুখি না হলেও ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে নিজস্বী তুলতে কিন্তু ভোলেন না। আর এ যে সাংবাদিকতার জগতে বিরাট বদল, তা অস্বীকার করার জায়গা নেই।

এই তো দিন কয়েক আগে, খড়্গপুরের  সাংবাদিক দেবমাল্য বাগচীকে মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়ে হেনস্থা করা হল। সেই ঘটনার বিরুদ্ধে জেলাগুলি থেকে প্রতিরোধ এলেও কার্যত চুপ করে রইল শহর কলকাতা। চুপ করে রইল কলকাতার প্রেস ক্লাব। যে দিল্লিতে গোদি মিডিয়া নিয়ে এত চর্চা, সেখানে কিন্তু এর উল্টো স্রোতও দেখতে পাবেন। এই যে কিছুদিন আগেই এডিটরস গিল্ডের একদল সাংবাদিক মণিপুর গেলেন, তাঁদের নামে সেখানে এফআইআরও দায়ের হল। সেই ঘটনা নিয়ে কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি এডিটরস গিল্ড। বরং তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, গিয়েছে সুপ্রিম কোর্টেও। সেই ছবিটা বহু জায়গাতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আসলে অন্যায় যাঁরা করে, তাঁরা ভণ্ড হবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে যে দেশে প্রতিবাদীরাও ভণ্ড হয়ে যান, সে দেশের দুর্গতির কোনও শেষ নেই।

আরও পড়ুন: সুধীর থেকে অর্ণব- একবারে বাদ ১৪ জন! কেন গোদি মিডিয়াকে বয়কটের সিদ্ধান্ত জোট ইন্ডিয়া-র?

তবে এই যে সাংবাদিকতার অবক্ষয়, তা কিন্তু শুরু হয়েছে আগেই। মনে পড়ছে, ২০২১ সালে বাংলার একটি আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রতিবেদন। বিষয়টি নিয়ে মাত্র ১৭৮ শব্দ জায়গা করে নিতে পেরেছিল কাগজের পাতায়। কিন্তু ঘটনাটি ছিল ভয়াবহ। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদল সাংবাদিককে পরামর্শ দিয়েছিলেন, 'পজিটিভ' খবর করার। এই পজিটিভ খবরের মানে যে শাসকতোষণ, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। শুধু তাই নয়, মুখ্য়মন্ত্রী সাংবাদিকদের খবর করে তা প্রথমে প্রশাসনিক কর্তাদের পাঠানোর নিদান দেন। তাঁরাই নাকি সেই খবরটি খতিয়ে দেখে বলবেন, তা আদৌ সরকারের পক্ষে কিনা, অর্থাৎ 'পজিটিভ' কিনা। তবেই সে খবর ঠাঁই পাবে ছাপার অক্ষরে। এ যে সংবাদমাধ্য়মের স্বাধীনতার উপরে কত বড় আঘাত, তা বলে বোঝানো কঠিন। জরুরি অবস্থার সময় দেশ দেখেছে, সাংবাদিকদের খবর করার জন্য সরকার পক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। তবে সেই অন্ধকারের বিষপোকা যে এখনও সমাজের শিকড়ে বসে আছে, তা সময়ে সময়ে ভালোই বোঝা যায়। অথচ সেই খবরটি নিয়ে কোনও হইচই হয়নি। একটিও লেখালিখিও হয়নি, একটিও বিতর্ক সভা বসেনি। আর এটাই বোধহয় পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেয়, কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বর্তমান সাংবাদিকতা। শাসক যে-ই হোক না কেন, একটি পক্ষের পদলেহনের সংস্কৃতির পাশাপাশি যে সামগ্রিক তোষামদের সংস্কৃতির ভিত তৈরি হয়ে গিয়েছে ভারতবর্ষের শিকড়ে, তার থেকে রেহাই পাওয়া সহজ নয় মোটেই।

 

(বক্তব্য লেখকের নিজস্ব)

More Articles