নবারুণ-লুব্ধক-ফ্যাতাড়ু: বন্ধুত্বের ঝিনচ্যাক কার্নিভাল

Nabarun Bhattacharya and Lubdhak: অধিকাংশ বামমনস্ক সাহিত্যিকই প্রান্তবাসীদের দেখেছেন এক রঙিন চশমার মধ্যে দিয়ে।

rudranjan
৪ মিনিট
নবারুণ-লুব্ধক-ফ্যাতাড়ু: বন্ধুত্বের ঝিনচ্যাক কার্নিভাল

"অসভ্য ডোগোনদের সঙ্গে সভ্য কলকাতার কোনো যোগাযোগ নেই।" তাই তারা দলবেঁধে চলে যাচ্ছে, এ শহর ছেড়ে, চিরকালের মতো। কলকাতা শহর আজ কুকুরদের দখলে। গুটিকয় বিড়ালও এসে পা মিলিয়েছে তাদের মিছিলে। সুদীর্ঘ পথ পড়ে আছে সামনে। তাদের খিদে, তেষ্টা, রাস্তার শক্ত পিচে ঘষা খেয়ে নরম থাবার যন্ত্রণা, সমস্ত বোধ যেন উবে গেছে। হাজার হাজার ট্র্যাফিক স্তম্ভ, পুলিশ সার্জেন্ট, টিভি টাওয়ার, কসাইখানাকে ছেড়ে তারা এগিয়ে চলেছে। সঙ্গে আছে হুঁশিয়ারি,

"পা ফাঁকা করে স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সার্জেন্ট, তুমি খিলান বা দরজার মতোই দাঁড়িয়ে থাকো। নড়লেই আমাদের গায়ে পা লাগবে। এবং ঘটনাটা যদি একবার ঘটে তাহলে আজ কেন, আর তোমার কখনই বাড়ি ফেরা হবে না।"

২০০০ সালে 'দিশা সাহিত্য' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় 'লুব্ধক' উপন্যাস। তার ছ' বছর পর উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। সে গ্রন্থের মুখবন্ধে নবারুণ লিখছেন,

"কুকুর, বেড়াল, পাখি, মাছ - এদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই। তারা যেমন আনন্দ দিয়েছে আমাকে, তেমনই দুঃখ দিয়েছে চলে গিয়ে। শিখিয়েছে অনেক কিছুই যা ঠিক বই পড়ে জানা যায় না।"

নবারুণের বক্তব্যকে খানিক মনযোগ দিয়ে দেখা প্রয়োজন। লুব্ধক নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা কম হয়নি। হওয়াটাই স্বাভাবিক। একদল পোস্ট হিউম্যানিজম বা উত্তর মানবতাবাদের তত্ত্বের নিরিখে তাকে দেখতে চেয়েছেন। একদল তাতে সন্ধান পেয়েছেন প্রান্তবাসীদের বিদ্রোহের বীজের। কিন্তু সবার আগে, 'লুব্ধক' বন্ধুত্বের গল্প। এমন বন্ধুত্ব যা সামাজিক ছকের খানিক বাইরে। যা কিছু প্রচলিত, তার বিধিবদ্ধ নিয়মে তাকে ধরা যায় না। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। এ পৃথিবী পাখিদের, গাছেদের, মানুষের আর কোটি কোটি কীট পতঙ্গের। ভূমণ্ডলের সমস্ত কিছু নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকা। অথচ তারাই মানবসভ্যতার অপরজন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অ্যালকোহল, জ্যোতিষ, তন্ত্র: মার্কসবাদী নবারুণ ঘুরেছেন নানা মার্গে

বাংলা গল্প-উপন্যাসে যে খোকা গদ্যভাষার কলকাকলি চলে, নবারুণের অঙ্গুঠাছাপ দেওয়া ভাষাটি তার ওপর আরডিএক্স-এর মতো ফেটে পড়ে।

এ জগৎ সংলাপময়। Dialogue শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ dialogos থেকে। Dialogos অর্থাৎ কথপোকথন। এ কথপোকথনে শব্দের লেনদেন নেই। আছে শুধু বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নীরব সহাবস্থান। অথচ তাকে কোনওদিন বন্ধুত্ব হিসেবে চিহ্নিত করিনি আমরা। বন্ধুত্বের হাজারও রকমফেরের খবর আর ক'জন রাখে?

উত্তাল চল্লিশ ছিল ভারতের রাজনৈতিক রদবদলের দশক। কালের নিয়মেই একদল শিল্পী-সাহিত্যিকের মনে মার্ক্সবাদী তত্ত্ব জায়গা করে নিয়েছিল। মূলধারার বামপন্থী সাহিত্যিকরা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার প্রচলিত অঙ্কে সাহিত্য রচনা আরম্ভ করলেন। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার কিছু যান্ত্রিক দিক রয়েছে। তার ফলে, অধিকাংশ বামমনস্ক সাহিত্যিকই প্রান্তবাসীদের দেখেছেন এক রঙিন চশমার মধ্যে দিয়ে। তাঁদের লেখাপত্রের মধ্যে শুধু শ্রমিক শ্রেণির মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রসঙ্গই উঠে এসেছে। যেন খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, লাল পতাকার জয়গান গাওয়া।

ফ্রানৎস‌ ফানো তাঁর Black Skin White Masks গ্রন্থে দেখাচ্ছেন, কীভাবে কালো মানুষের সামাজিক অস্তিত্ব নিয়ন্ত্রণ করে সাদা চামড়ার মানুষেরা। তিনি লিখছেন,

"...not only must the black man be black; he must be black in relation to the white man."

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কলকাতার রাস্তার মতো পানশালা আর কোথাও নেই...

Bars of Kolkata: যারা এখন সাহিত্যের, কবিতার অগ্রপথিক, আমার ধারণা তাঁরা মালটাল খান না (হাসি)। খেলে বাংলা কবিতার চেহারা হয়তো অন্যরকম হতো।

বাংলা সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ক্ষেত্রেও যেন কতকটা তেমনই ঘটল। প্রান্তিকের অস্তিত্ব বাঁধা পড়ল মধ্যবিত্তের চেতনার গতে।

তবে এই গতের বাইরের বিশ্বকে তুলে ধরেছিলেন নবারুণ, তাঁর ফ্যাতাড়ু সিরিজের গল্প, উপন্যাসে। প্রান্তবাসীরা সেখানে কোনও রঙিন চশমার অধীনস্থ নয়। তাঁদের জীবনের যাবতীয় ক্যাওড়ামো থেকে আরম্ভ করে খিল্লিযাপনের চিত্র এঁকেছিলেন নবারুণ। একদিকে ডিএস, পুরন্দর আর মদনের ঘুঘুচক্কর। অন্যদিকে চোক্তার আর চাকতির খেল। যেন বন্ধুত্বের ঝিনচ্যাক কার্নিভাল।

বাংলার পুরনো মার্ক্সীয় দলিল-দস্তাবেজ ঘাঁটলে দেখা মিলবে আরেক বিরল বন্ধুত্বের। সে বন্ধুত্বে ছিল মতাদর্শের কলমখোঁচা, বাদি-বিবাদির তুমুল লড়াই। কিন্তু সবশেষে সবশেষে ছিল রাজনৈতিক সৌজন্য এবং নিকটজনকে হারানোর দীর্ঘশ্বাস।

১৯৩৮ সালে 'In Defense of the Decadents' নামে সমর সেন একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি যান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, যে শ্রেণিকে চেনো, যাকে ভালভাবে বুঝেছ, তাকে নিয়েই লেখ। তিনি লিখেছিলেন,

"It is best to...write about the class you know well than to exult in the future glories of a classless society."

সরোজ দত্ত অচিরেই সে প্রবন্ধকে এক হাত নিয়েছিলেন। সমর সেনের কথায়, "শূন্যে ছোবল" চালিয়েছিলেন। প্রায় চার যুগ ধরে চলে তর্ক-বিতর্ক। অবশেষে সমরবাবুই 'উড়ো খই' নামে এক জবানবন্দির মধ্যে দিয়ে তার সমাপ্তি ঘটান, সাতের দশকের শেষে। ততদিনে সরোজ দত্ত খুন হয়েছেন রাষ্ট্রীয় গুন্ডাদের হাতে। সমরবাবু সে লেখায় সরোজ দত্তকে নিয়ে খানিক স্মৃতিরোমন্থন করেন। ত্রিশের দশকের শেষে একটি বৌভাতের নিমন্ত্রণে তাঁর সঙ্গে শেষবার দেখা হওয়ার কথা বলেন। তারপর খানিক দ্বিধান্বিত হয়েই সরোজ দত্তর পাল্টা প্রবন্ধকে স্বীকৃতি দিয়ে লেখেন,

"বহুদিন পরে লেখাটি পড়ে মনে হলো, সরোজ দত্ত ঠিক লিখেছিলেন। তিরিশের দশকে অনেক লেখক বোধহয় বিপ্লবীর অভিনয় করে বাহবার চেষ্টায় থাকতেন, তাঁদের আসল চেহারা সরোজ দত্ত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন।"

তবে মাথায় রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রেও সমরবাবু সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই যাচ্ছিলেন। বন্ধুত্বের সৌজন্য দেখাতে গিয়ে নিজের মতপ্রকাশে পিছপা হননি।

লেখক সত্ত্বা বিবর্তনশীল। কিরানা ঘরানার বিস্তারের রাস্তা যেমন স্থির, অথচ নদীর মতো এঁকেবেঁকে চলে, তেমনই কলম ব্যাপারীদের অনুভূতিও বাঁক বদল করে। চল্লিশের দশকের অরুণ মিত্র বা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁদের নব্বইয়ের দশকের কবিসত্ত্বার ফারাক বিস্তার। কিন্তু এ সমস্ত কেতাবি আলোচনার কোনও মানে এখানে সত্যিই দাঁড়ায় না। সমর-সরোজ বিতর্কের সমাপ্তি প্রবন্ধটি পড়ার পর বাকি থাকে শুধুই নীরবতা। বন্ধুত্বের এই শেষ চিঠি ছিল "থাকার জগৎ থেকে না থাকার প্রতি"। আমরা অস্তিত্বের বন্ধুত্ব দেখে এসেছি। কিন্তু অনস্তিত্বেরও বন্ধুত্ব হয়। তাকে আমরা বুঝতে পারিনি।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।