এই কুণ্ডের জল পান করলেই সেরে যাবে রোগ, ঘরের কাছের এই সতীপীঠ নিয়ে রয়েছে নানা কিংবদন্তি

দক্ষরাজার যজ্ঞে, তাঁরই কন্যা অপমানিতা 'সতী', পতি শিবের নিন্দা সহ্য করতে না পেরে সর্বসমক্ষে দেহত্যাগ করেন। কৈলাসে ধ্যানমগ্ন শিবের কানে সেই বার্তা পৌঁছনোমাত্র তিনি ভূত-প্রেত-পিশাচ দ্বারা দক্ষরাজার যজ্ঞ পণ্ড করে দেন এবং নিজে সতীর দেহ কাঁধে তুলে নিয়ে উন্মাদ 'নটরাজ' রূপ ধারণ করে 'তাণ্ডব'-নৃত্য আরম্ভ করেন। এর ফলে স্বর্গ-মর্ত‍্য-পাতাল উথালপাথাল হয়ে ওঠে এবং অনিবার্য প্রলয় ধেয়ে আসে, সৃষ্টি বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়। সেই সময় সমগ্র দেবকুল পরামর্শ করে ব্রহ্মাকে অনুরোধ করেন এই প্রলয় থামানোর উপায় বের করতে। ব্রহ্মার আদেশে বিষ্ণু সুদর্শন চক্র প্রেরণ করেন সতীর দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে দেওয়ার জন্য। পুরাণে আছে, সতীর দেহ ৫১-টি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে, সারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে; এবং প্রত্যেকটি প্রদান এক একটি মহাতীর্থস্থান-রূপে পরিগণিত হয়।

সর্বশেষ খণ্ডটি পড়ে বীরভূম জেলার বোলপুরে কোপাই নদীর তীরে। এখানে দেবীর কাঁখাল পাওয়া গিয়েছিল।

পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী জানা যায়, দেবাদিদেব মহাদেবের বুক থেকে সতীর দেহাংশ সম্পূর্ণভাবে পড়ে যেতেই, তাঁর চৈতন্য ফিরে আসে। সেই কারণে এই সতীপীঠের আর এক নাম 'চৈতন‍্যপীঠ'। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হল 'কুণ্ড'। জনশ্রুতি, এই কুণ্ডের ঈশান কোণে নিমজ্জিত রয়েছে মায়ের 'কাঁখাল'। দেবী মাতা ছাড়াও এই কুণ্ডে 'পঞ্চশিব' অবস্থান করছেন।সতীমায়ের কোমর বা কাঁখাল থেকে এই স্থানের নাম হয়েছে কঙ্কালী। পৌরাণিকভাবে এখানে দেবী 'দেবগর্ভা' নামে পরিচিতা। প্রচলিত নামানুসারে এই স্থানের নাম হয়েছে কঙ্কালীতলা।

আরও পড়ুন: ১০৮টি মন্দিরে অবস্থান করতেন শিব, এই জমিদারিতে রয়েছে অজস্র কিংবদন্তি

ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'বাংলার ইতিহাস' নামক বইটিতে উল্লেখ আছে, প্রথম মহীপালের রাজত্বের সময়কালে কাঞ্চির রাজা ছিলেন 'রাজেন্দ্র চোল'। তিনি মহা-পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন, বহু রাজাকে পরাজিত করেন, এখানে এসে তিনি রাজা 'রণশূর'-কে পরাজিত করেন। তখন বীরভূমের এই স্থানটি ছিল তাঁরই অধীন। এই কাঞ্চিরাজ ছিলেন শিব-উপাসক। তিনি কোপাই নদীর তীরে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। কাঞ্চিরাজের নামানুসারে মন্দিরের লিঙ্গটি কাঞ্চিশ্বর শিবলিঙ্গ নামেও পরিচিত। এই শিবমন্দিরের পাশেই রয়েছে মহাশ্মশান ও পঞ্চবটিবন।

Kankalitala

বীরভূম জেলা অত্যন্ত রুক্ষ। প্রখর গরমে এখানকার সব জলাশয় শুকিয়ে যায়, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সতীকুণ্ডের জল কখনও শুকোয় না। আরও একটি রটনা আছে, যারা এই কুণ্ডে নেমেছে, তাদের ক্ষতি হয়েছে, তাই সাহস করে এই কুণ্ডে কেউ নামে না। এই জলে কখনও পোকা হয় না, এই জল খেলে দুরারোগ্য ব্যাধি সেরে যায় বলে জনশ্রুতি আছে। অনেকেই মনে করেন, কাশীর মণিকর্নিকা ঘাটের সঙ্গে এই কুণ্ডের সরাসরি যোগ আছে। এই কুণ্ডের জলে আছে 'পঞ্চশিব'। প্রতি কুড়ি বছর অন্তর একবার করে এই 'পঞ্চশিব' কুণ্ডের জল থেকে উঠিয়ে পুজো করা হয় এবং পুজো-শেষে পুনরায় জলে নিমজ্জিত করা হয়।

Kankalitala

 

১৩৬৯ বঙ্গাব্দের ২৪ জৈষ্ঠ্য এই মন্দির তৈরি হয়। পূর্বে কুণ্ডের সামনেই খোলা বেদিতে মায়ের পুজো হতো, কথিত আছে, এই বেদির নিচে ১০৮টি নরমুণ্ড পোঁতা আছে। দেবী মাতা এখানে নিরাকার। নৈহাটিতে বসবাসকারী একজন ভক্ত মাতৃমূর্তির রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনি কোমর পর্যন্ত তৈরি করার পর অজানা কোনও কারণে মারা যান। তারপর থেকে আর কেউ কখনও এই চেষ্টা করেননি, কারন 'মা' এখানে নিরাকার রূপেই থাকতে চান। প্রত্যেক সতীপীঠ বা শক্তিপীঠে একজন করে ভৈরব থাকেন। এখানেও 'রুরু' ভৈরবের মন্দির রয়েছে। রুরু কথাটির অর্থ 'আলো'। এখানে অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন 'রত্নাগর্ভি' এবং ভৈরব হলেন 'রুরু'। শ্রীশ্রীরামঠাকুরের বংশধররা ৪০০ বছর ধরে মন্দিরের সেবাইত। তাঁদের মতানুযায়ী,এই রাম ঠাকুর স্বপ্নাদেশ পান। তিনি দেখেন, 'মা' তাঁকে বলছেন, আমি এখানে কাঁখাল রূপে পড়ে আছি। আমার পুজো কর। শুধুমাত্র 'কঙ্ক', এই একটি শব্দ শোনেন তিনি। এই 'কঙ্ক' কথাটি মহাকালীর বীজমন্ত্র। কঙ্কালীতলার আরও একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এই মন্দিরে সকলের প্রবেশাধিকার রয়েছে, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, পার্সি, জৈন প্রত্যেকে মাতৃদর্শনে আসেন। এখানে নিরাকার ব্রহ্মসাধনা হয়। কৌশিকী অমাবস্যা বা আলো-অমাবস্যায় এখানে ভক্তের ঢল নামে। সারারাত ধরে চলে যজ্ঞ।

চৈত্র সংক্রান্তির দিন মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। সেই সময় তিনদিন ধরে উৎসব চলে। প্রচুর ভক্তসমাগম হয়। কুণ্ডের চারপাশে পুজো চলে সারারাত। ছাগবলির ব্যবস্থাও থাকে।

 

More Articles

;