রাজস্থানের এই অলৌকিক গ্রাম থেকে বেঁচে ফেরা কঠিন...

Debabrata Mondal
৩ মিনিট
রাজস্থানের এই অলৌকিক গ্রাম থেকে বেঁচে ফেরা কঠিন...

ফেলুদার গল্পে জটায়ু লিখেছিলেন ' সাহারায় শিহরণ।' তবে এ গল্পের নাম হওয়া উচিত ' থর - এ থরহরিকম্প ' - এর গল্প। বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম মরুভূমির থর। যার অধিকাংশ স্থান এখনও রহস্যে মোড়া। হ্যাঁ, রহস্য যেন অর্ধাঙ্গিনী থর মরুভূমির । তার বুকে যেমন সাজানো অপার সৌন্দর্যের ডালি, ঠিক তেমনি তাঁকে ঘিরে থাকা রহস্যের পর্দাফাঁস করতে সে যেন অহরহ হাতছানি দিয়ে চলেছে আমাদের। না, পর্যটকরা কখনও থরের সাদর আমন্ত্রণ কে উপেক্ষা করতে পারে না, নিশির ডাকের মতোই থরের হাতছানিকে অবজ্ঞা করার উপায় নেই যে। কিন্তু বারবার পর্যটক, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ বা রহস্যসন্ধানী দল ঘরের মাটিতে পদচিহ্ন আঁকলেও এখনো এখানে অমীমাংসিত থেকে গেছে বেশ কিছু রহস্য। তেমনই এক রহস্যের খোঁজে আজ আমরা কড়া নাড়ব থর মরুভূমির দরজায়।

ধু ধু মরুভূমির বুক চিরে ছুটে চলেছে একটা গাড়ি। আমাদের গন্তব্যস্থল জয়সলমের থেকে প্রায় আঠারো কিলোমিটার দূরে। গুগলে যার পরিচিতি ' হন্টেড ভিলেজ ' নামে। না তেনারা আছেন কি নেই সেই বিতর্ক দূরে সরিয়ে রেখে আগে শুনে নেওয়া যাক এই 'হন্টেড ভিলেজ' - এর আসল ইতিহাস। কেন আজও অভিশপ্ত এই গ্রাম? লুকিয়ে রয়েছে কোন রহস্য?

রবীন্দ্রনাথের ' হালদার গোষ্ঠী ' গল্পে আমরা দেখেছিলাম জমিদারতন্ত্রের কদর্য রূপ। যেখানে জমিদারের শোষণ যন্ত্রে প্রতিমুহূর্তে নিষ্পেষিত হয় মধুর মত মেহনতি মানুষরা। এই প্রতিবেদনেও দেখা মিলবে এমনই এক জমিদারের। তবে জমিদার, সামন্ত শাসক, নাকি দেওয়ান সে নিয়ে মতভেদ আছে। নাম তার সালিম সিংহ - আতঙ্কের আর এক নাম সালিম সিংহ, নারীলোলুপ, প্রজাবিদ্বেষী সালিম সিংহ।

গ্রামের নাম কুলধার। গ্রামের প্রতিটি মানুষজন তখন সালিম সিংহের অত্যাচারে ত্রাহি ত্রাহি রব ছাড়ছে। মহিলারা ভুগতে শুরু করেছেন নিরাপত্তাহীনতায়। দিনের বেলায় পথে-ঘাটে বেরোনো দায় হয়ে পড়েছে তাদের। সালিম সিংহের লেঠেল বাহিনী সর্বক্ষণ প্রচন্ড উন্মত্ততায় ছুটে চলেছে গ্রামের প্রতিটি কোনায়। প্রতিদিন নতুন নতুন যুবতী মেয়েদের ভোগ্যবস্তুতে পরিণত করা একপ্রকার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই অত্যাচারী জমিদার সালিম সিংহের। এ যেন তারাশঙ্করের ' রাধা ' উপন্যাসের অক্রুর সরকার - " অক্রুর নেহি হাম ক্রুর সরকার হ্যায় ।" নারীদেহের প্রতি সালিম সিংয়ের প্রলোভনের গ্রাফ প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বগামী। এক সময় কুলধার গ্রামের মোড়লের মেয়ের দিকে চোখ পড়লো সালিম সিংহের। কিন্তু বিধি বাম। রুখে দাঁড়াল কুলধার গ্রামের অধিবাসীরা। রবীন্দ্রনাথের 'হালদার গোষ্ঠী' গল্পে জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মশাল জ্বেলেছিল বনোয়ারিলাল, অনেকটা একইরকম ভাবে এবার প্রতিবাদ দানা বাধল সালিম সিংহের বিরুদ্ধে। এই বিরুদ্ধাচারণ বেশিদিন সহ্য করেননি তিনি। সালিম সিংহের বিরুদ্ধে গলা তোলে অশিক্ষিত প্রজাগুলো? এ যেন মরুভূমিতে মরীচিকার মত। সালিম সিংহ এবার তার লেঠেল বাহিনীকে নির্দেশ দিল বলপূর্বক মেয়েটিকে তুলে আনার জন্য। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুলে বাঁকাতেই হবে।

কিন্তু রাখে হরি তো মারে কে? গ্রামবাসীরা শেষপর্যন্ত একরাত সময় চেয়ে নিল সালিম সিংহের লেঠেল বাহিনীর থেকে। আর ওই এক রাতের মধ্যেই জনশূন্য হয়ে গেল কুলধার গ্রাম। হ্যাঁ, গ্রামের মেয়েটিকে অত্যাচারী নারীলোলুপ জমিদার সালিম সিংহের হাত থেকে বাঁচাতে সেই রাতেই লেঠেল বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে একবস্ত্রে গ্রাম ত্যাগ করেছিলেন কুলধার গ্রামের প্রায় পনের'শ অধিবাসী। জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে এ যেন এক নীরব সংগ্রাম। যার সাক্ষী দিগন্তবিস্তৃত এক মরুভূমি।

গল্প এখানেই শেষ নয়। বরং আসল গল্পের শুরু এখান থেকেই। সেদিন রাত্রিতে মহাকাল যেন গিলে খেয়েছিল সমগ্র কুলধার গ্রামকে। হিসাব মেলেনি - একরাতের মধ্যে এমনভাবে শ্মশান হয়ে গেল কুলধারের মত একটা বর্ধিষ্ণু গ্রাম? তবে এরপরেই কুলধার গ্রামকে নিয়ে শোনা যায় বেশকিছু জনশ্রুতি। জনশ্রুতি হলেও সব রটনা নয়, কিছুক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রমাণও মেলে। এখানে যেন সময় সর্বক্ষণ থমকে আছে, বহু পর্যটক এই ঘটনার পর থেকেই অশরীরীদের দেখা পাওয়ার আশায় ছুটে গেছেন কুলধারার আনাচে-কানাচে। দিনের আলো যত কমেছে, ততই বেড়েছে আতঙ্কের পরিমাণ - কেউ শুনেছেন নুপুরের নিক্কন, কারও কানে গেছে কান্নার আওয়াজ, আবার কেউ গ্রামের গোলকধাঁধায় হারিয়ে ফেলেছেন নিজেকে। কখনও বা রাত্রির নিস্তব্ধতাকে খন্ড খন্ড করে শোনা গেছে অমানুষিক আর্তনাদ। দিল্লির এক প্যারানরমাল সোসাইটি সদস্যরা এই গ্রামে কাটিয়ে এসেছেন একরাত। অশরীরী আতঙ্ক পিছু ছাড়েনি তাদেরও। সমাধান হয়নি মরু রহস্যের।

এককালের জীবন্ত, প্রাণ-প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ নগরী আজ পরিণত হয়েছে মৃতদের আস্তানায়। ইতিমধ্যে মহাকালের রথের চাকা ঘুরছে বহুবার, যত দিন গেছে রহস্যের কালো পর্দা বিশ্বজগৎ থেকে আলাদা করে ফেলেছে থর মরুভূমির বুকের এই গ্রামকে। আতঙ্ক একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রশাসন বাধ্য হয়েই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন এখানে রাত্রিবাসের উপর। আমাদের বিজ্ঞানমনস্ক মনকে যেন একরাশ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় কুলধার। আর সেই গ্রামের চার দেওয়ালের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলে গুমরে গুমরে মরে অশরীরীদের অব্যক্ত কান্না।

তথ্যসূত্র:-

১. https://www.etvbharat.com/bengali/west-bengal/bharat/bharat-news/kuldhara-an-abandoned-village-of-five-hundred-and-fifty-years/wb20200805070024160

২. https://trell.co/read/the-haunted-city-kuldhara-in-rajasthan-b252ddbbda53/?utm_source=Trell

৩. সুখী গৃহকোণ - গায়ে কাঁটা দেওয়া ভোটের সংখ্যা(১লা নভেম্বর, ২০২০)

৪. আনন্দবাজার পত্রিকা - ১৩ই আগস্ট ২০১৯

৫. ' রাজস্থানের এই গ্রামে গেলে কেউ বেঁচে ফেরে না ' - সংবাদ প্রতিদিন।

লিখেছেন
Debabrata Mondal
Debabrata Mondal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।