কোথাও ঘট, কোথাও সরা, গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে কীভাবে পূজিত হয় লক্ষ্মী

Lakshmipuja: শুধু প্রতিমা নয়, গ্রামবাংলার বুকে লক্ষ্মী বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হন।

Sanchari Bhowmik
৩ মিনিট
কোথাও ঘট, কোথাও সরা, গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে কীভাবে পূজিত হয় লক্ষ্মী

এসো মা লক্ষ্মী বসো ঘরে

আর এই ঘরে থাকো আলো করে...

গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে কাল পূজিত হবেন মা লক্ষ্মী। ধনে-সম্পদে, প্রাচুর্যে যাতে সারাবছর ঘর আলো হয়ে থাকে- এই আশাতে মায়ের আরাধনা করা হয় এই পূর্ণিমায়। ঈশ্বরী পাটনির মতো আজকের সাধারণ মানুষও চান তাঁদের উত্তরপুরুষ যেন থাকে দুধে-ভাতে। তাই প্রতি বৃহস্পতিবার করে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো হলেও আশ্বিনের এই পূর্ণিমাতে মাকে যেন আহ্বান করে ঘরে ডেকে আনা হয়। তিনি কোথাও কন্যা, কোথাও বউ আবার কোথাও মা রূপে পূজিতা হন। তবে শুধু প্রতিমা নয়, গ্রামবাংলার বুকে তিনি বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হন। আর এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাঙালির আবেগ। জড়িয়ে থাকে চালের গুঁড়ো দিয়ে বানানো পিটুলির আলপনার ইতিহাস।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সঠিক সময় হলো সন্ধেবেলা। শাস্ত্রমতে কথিত আছে, পূর্ণিমার রাতে আলো-আঁধারিতে এই হাতে দেওয়া আলপনা দেখেই মা লক্ষ্মী বুঝতে পারেন, কোন বাড়িতে তাঁর আরাধনা হচ্ছে। আর সেইমতো সেই বাড়িতে এসে তিনি অধিষ্ঠান করেন। অর্থাৎ, এককথায় আলপনা হলো মা লক্ষ্মীকে আগমনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো। তাই এই বিশ্বাস থেকেই যুগ যুগ ধরে সম্পদের দেবীর আরাধনায় আলপনা দিয়ে আসছেন বাড়ির গৃহিণীরা। এই আলপনার মধ্য দিয়েই উঠে আসে গ্রামবাংলার নানা চালচিত্র। তাঁদের দৈনিক জীবনযাপন, এবং মা হিসেবে সন্তানকে আগলে রাখার কাহিনি। কোথাও আবার কন্যারূপে মা লক্ষ্মীকে বাড়ির গৃহিণী আগলে রাখছেন, সেই চিত্রও। সাধারণত মা লক্ষ্মীর প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে পুজো করার নিয়ম চালু থাকলেও গ্রামবাংলার অনেক জায়গাতেই মূর্তি ছাড়াও বিভিন্ন নিয়মে মা লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়।

আড়ি লক্ষ্মী

গ্রামবাংলার বহু গৃহস্থবাড়িতে সাবেক প্রথা মেনে আড়ি লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। একটি ছোট বেতের ঝুড়ি বা কুনকেতে নতুন ওঠা ধান ভরে, ধানের ওপরে লাল চেলিতে মুড়ে বউ সাজানো হয়, সঙ্গে রাখা হয় দু'টি সিঁদুরকৌটো। এই ঝুড়িটিকেই মা লক্ষ্মীর শস্যদাত্রী ও সৌভাগ্যদাত্রী রূপ এবং বাড়ির গৃহিণী হিসেবে কল্পনা করা হয়। আসলে প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামবাংলায় শস্য রাখার ঘর বা গোলাঘরকে মা লক্ষ্মীর বাসস্থান হিসেবে ভাবা হতো। এই ধানভর্তি কুনকেটিই এক্ষেত্রে সেই গোলাঘর বা মা লক্ষ্মীর প্রতীক। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন সন্ধ্যালগ্নে গৃহবধূরা উপবাস করে, জলচৌকিতে প্রতিষ্ঠা করা আড়ি লক্ষ্মীকে যথোপচারে পুজো করা হয় এবং পুজোশেষে মা লক্ষ্মীর ব্রতকথা ও পাঁচালি পাঠ করা হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিধবার কামনায় ব্রাত্য ধন দৌলত, ঐশ্বর্য! লক্ষ্মীপুজোয় আজও একঘরে 'স্বামীহীনা'রা

ধন-দৌলত, ঐশ্বর্যের দেবীভক্তিতে বিধবার প্রবেশ নিষেধ! সমকালে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও তা নেহাতই এক্ষেত্রে যেন সংখ্যালঘুর মতো!

লক্ষ্মীর ঘট

এগুলি আসলে পোড়ামাটির ঘট। শস্য-সম্পদের দেবী মা লক্ষ্মীর মুখ-সম্বলিত পোড়ামাটির ঘটে চাল বা নদীর জল ভরে ঘটটিকে মা লক্ষ্মীর প্রতীক হিসেবে জলচৌকিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর ঘটটিকে মা লক্ষ্মী কল্পনা করে ভক্তিভরে যথোপচারে পূজা করেন গৃহবধূরা।

বেরি লক্ষ্মী

এই পুজোতে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো নবপত্রিকা।নবীন কলাগাছের ছাল লম্বা ও সমান করে কাটার পর, ছালগুলিকে পাকিয়ে নারকেল গাছের নতুন কাঠি দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। এভাবে ন’টি বেড় তৈরি করা হয়। কলাগাছের বেড়গুলির গায়ে তেল-সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকা হয়। এরপর জলচৌকিতে আলপনা দিয়ে তার উপর ন’টি চোঙাকৃতি বের রাখা হয়। বেড়গুলিতে পাঁচ প্রকার শস্য ভরা হয়। একত্রিত বেড়গুলির ওপর একটি শিষ-ডাব রেখে বেরগুলিকে লাল চেলি দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়। এভাবেই অবয়ব ধারণ করেন ‘বেড়’ লক্ষ্মী। এরপর বাড়ির গৃহিণীরা সংসারের মঙ্গল-কামনায় নিষ্ঠাভরে মা লক্ষ্মীর আরাধনায় ব্রতী হন।

লক্ষ্মী সরা

বাংলার শিল্প-নির্দশন, ঐতিহ্য ধরা পড়ে এখানে। গ্রামবাংলার পটচিত্রে মা লক্ষ্মী বিরাজ করছেন কয়েক শতাব্দী ধরে। পটশিল্পীদের তুলির টানে এই দিন মা আসেন ঘরে। ওপার বাংলায় মাটির সরায় মা লক্ষ্মীর ছবি এঁকে সেই ছবিকে পূজা করা হয়। মা লক্ষ্মীর চিত্র-সম্বলিত মাটির সরাগুলিকে বলা হয় ‘লক্ষ্মী সরা’। তবে কেবলমাত্র পূর্ববঙ্গেই নয়, পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জায়গাতেও কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন, লক্ষ্মীসরা প্রতিষ্ঠা করে লক্ষ্মীপুজোর চল আছে। প্রায় প্রতিটি সরাতেই মা লক্ষ্মীর সঙ্গে বিরাজ করেন জয়া-বিজয়া ও বাহন লক্ষ্মীপ্যাঁচা। কখনও কখনও লক্ষ্মীসরায় উঠে আসেন সপরিবার মা দুর্গা, এমনকী, রাধা-কৃষ্ণও। আর অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এই পটচিত্রর শিল্পীরা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়েও সাজিয়ে তুলেছেন দেবী লক্ষ্মীকে। এখানেই মিলেমিশে গেছে সমস্ত ধর্মীয় বেড়াজাল।

সপ্ততরী

গ্রামবাংলার অনেক জায়গায় লক্ষ্মীর আসনে সপ্ততরী বসিয়ে মা লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়। সপ্ততরী আসলে সাতটি কলার পেটো দিয়ে তৈরি সাতটি নৌকা। সেই নৌকাগুলিতে রাখা হয় হলুদ, চাল, ডাল, হরিতকি, খুচরো পয়সা ও টাকা। প্রাচীনকালে জলপথে নৌকোর মাধ্যমে ব্যবসাবাণিজ্য চলত, আর কে না জানে ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’! বড় বড় বণিকেরা সপ্তডিঙা ভাসিয়ে বাণিজ্যে যেতেন। সম্ভবত সেই প্রেক্ষাপট থেকেই 'সপ্ততরী’-কে মা লক্ষ্মী হিসেবে পুজো করার প্রথা শুরু হয়েছিল।

লিখেছেন
Sanchari Bhowmik
Sanchari Bhowmik
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।